নড়বড়ে নিরাপত্তায় বাড়ছে শঙ্কা

সাড়ে ৬ মাসে পালিয়েছে ফাঁসির তিন আসামি

ঢাকার আদালত থেকে রবিবার জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর প্রশ্ন উঠেছে আদালত পাড়ার নিরাপত্তা নিয়ে। রাজধানীর পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার নিম্ন আদালতে প্রতিদিন হাজার হাজার আসামি ও বিচারপ্রার্থীর সমাগম ঘটে। এদের মধ্যে জঙ্গি-দুর্ধর্ষ খুনের মামলার আসামিও থাকেন। ফলে কে আসামি কে বাদী তা আলাদা করার সুযোগ থাকে না। থাকেন ১৭ হাজার আইনজীবী। মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রায়ই বাদী-বিবাদী পক্ষের মধ্যে বাগ্বিত-া, হাতাহাতিসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এই ভিড়বাট্টার মধ্যে গত ১৯ মাসে মৃত্যুদ ন্ড প্রাপ্ত তিনজনসহ পাঁচজন আসামি পালিয়েছেন পুলিশের হেফাজত থেকে। গত রবিবার সিজেএম আদালতের সামনে থেকে দুই জঙ্গি ছিনতাই অরক্ষিত ও অপ্রতুল নিরাপত্তারই প্রতিফলন। যদিও জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণের সার্বিক পরিস্থিতি আছে আগের মতোই।

২০১৯ সালের ১৬ জুলাই কুমিল্লার তৃতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে একটি হত্যা মামলায় হাজিরার দিন আদালতে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের সামনেই এক আসামি হাসান অতর্কিতে ছুরি চালিয়ে হত্যা করেন একই মামলার আরেক আসামি ফারুককে। ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে বেশ আলোচনায় আসে। উচ্চ আদালত, ঢাকার আদালত এলাকাসহ দেশের সব অধস্তন আদালতে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। কিন্তু সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা শিথিল হতে সময় লাগেনি। আদালতের মতো স্পর্শকাতর স্থানে খুন, ফাঁসির আসামির পলায়ন, বিচারকের ওপর হামলার চেষ্টা, বাদীপক্ষের ওপর আসামিপক্ষের হামলার মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও থামেনি।

এই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানা থেকে কৌশলে পালিয়ে যান হারুনুর রশিদ নামে ডাকাতি মামলার এক আসামি। চলতি বছরের ২৩ মার্চ সিএমএম আদালত এলাকার হাজতখানা থেকে পালিয়েছেন সাইফুল ইসলাম নামে মাদক মামলার এক আসামি। আর গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের হাজতখানা থেকে পালিয়ে যান হত্যা মামলায় ফাঁসির আসামি বাদশা মিয়া। অন্য একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দেওয়ার জন্য তাকে আনা হয়েছিল আদালতে। নিরাপত্তার শিথিলতায় একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও আদালত সংশ্লিষ্টরা হতবাক। আইনজীবীরা বলেন, নিরাপত্তাসহ নানা কারণে এখানে আদালতের পরিবেশ বলতে যা বোঝায় সেটি অনেক সময়ই থাকে না।

গত রবিবার দুপুরে ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম (সিজেএম) আদালত এলাকায় পুলিশের ওপর পিপার স্প্রে করে ছিনিয়ে নেওয়া হয় অভিজিত রায় ও প্রকাশক ফয়সল আরেফীন দীপন হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে। ওই দিন সিজেএম আদালতে ভবনে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে তাদের অন্য একটি মামলায় হাজিরার জন্য আনা হয়েছিল। এই ছিনতাইয়ের ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার করা হয় আদালত প্রাঙ্গণের।


কিন্তু গতকাল ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত, সিজেএম আদালত, সিএমএম (মুখ্য মহানগর হাকিম) আদালত ঘুরে দেখা বাড়তি নিরাপত্তার কিছু চোখে পড়েনি। এখানে সেখানে দেদার চলছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। আদালতের বিভিন্ন করিডরে হকার ও ফকিরের অবাধ আনাগোনা। আসামিকে হাজির করা কিংবা হাজিরা দেওয়া হয় এমন আদালতগুলোর সামনের অবস্থা আরও বেশি বিশৃঙ্খল। আদালতগুলোতে প্রবেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ঘাটতিসহ সিসি ক্যামেরার অপ্রতুলতা তো আছেই।

গতকাল সিএমএম ভবনের পঞ্চম তলায় আদালতের করিডরের সামনে পেয়ারা, চা, সিগারেটের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে ভিড় চোখে পড়ে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশও এ বিষয়ে কিছুই বলছে না। আদালত এলাকার সরু গলিগুলোর ফুটপাতে মাছ, মাংস থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য সবই বিক্রি হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এজলাস থেকে বেরুলে মনে হয় বাজারের মধ্যে আছি। আদালতের এই পরিবেশকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যাবে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও পুলিশের তেমন তৎপরতা চোখে পড়ে না। ফলে দিনের পর দিন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছেই।’

অকুস্থলে যা দেখা গেল : রবিবার ঢাকার আদালত এলাকার যেখান থেকে (সিজেএম ভবন এলাকা) দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায় অনেক মানুষের জটলা। আদালতে আসা মানুষদের ওপর নেই কোনো কঠোর নজরদারি কিংবা তল্লাশি। পুলিশ ও গোয়েন্দারা সতর্ক অবস্থানে থাকলেও অন্যদিনের মতোই পরিস্থিতি স্বাভাবিক। প্রতিদিনের মতোই বসেছে চা, সিগারেট, পেয়ারা, পেঁপে, বই এমনকি ব্লাড সুগার ও রক্তচাপ পরীক্ষা করার অন্তত ১৫টি ভ্রাম্যমাণ দোকান। এখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে পার্কিং করা গাড়ি যার সবই ব্যক্তিগত। ভবনের নিচতলা ও পাশের ভবনে দুটি সিসি ক্যামেরা চোখে পড়ে। 

নাম না প্রকাশের শর্তে একজন আইনজীবী বলেন, ‘এখানে একটি সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। প্রতিটি কর্মদিবসে এই আদালতে দুর্ধর্ষ সব আসামিকে হাজির করা হয়। প্রতিদিনই এখানে আইনজীবীসহ শত শত মানুষের আনাগোনা থাকে। পরিস্থিতি দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে দুদিন আগে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো বড় একটি ঘটনা ঘটেছে।’

ঘুপচি গলির ছোট এলাকায় আদালত নিয়ে অস্বস্তি আইনজীবীদের : ডিএমপির (ঢাকা মহানগর পুলিশ) প্রসিকিউশন বিভাগ বলছে, ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত, ঢাকা জেলা আদালত, সিজেএম আদালত, সিএমএম আদালতের ভবনগুলোতে বিচারকাজের এজলাস রয়েছে ১২৭টি। অন্যদিকে ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা বলেন, প্রায় ২৭ হাজার আইনজীবী আছেন সমিতিতে। এদের মধ্যে অন্তত ১৫ হাজার আইনজীবী নিয়মিত আদালতে মামলা পরিচালনা করেন। এর বাইরে বিচারপ্রার্থী, আসামি মিলিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিটি কর্মদিবসে হাজার হাজার মানুষের সমাগম থাকে আদালত এলাকায়। সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার আদালত এলাকার যে পরিবেশ তাতে আইনজীবীদের অনেকের রয়েছে অস্বস্তি।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে যে ঘটনাটি (জঙ্গি ছিনতাই) ঘটেছে সেটি একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত ও আকস্মিক। আমরা সবাই হতবাক হয়েছি। এ ঘটনা আসলেই আতঙ্কের।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এখানে আদালত অঙ্গনটির উপযুক্ত জায়গা নয়। আশপাশে বাড়িঘর ও অসংখ্য গলি রয়েছে। দুর্বৃত্তরা ঘটনা ঘটিয়েই খুব সহজে মানুষের সঙ্গে মিশে যায়। যদি এটি কোনো সংরক্ষিত জায়গায় হতো তাহলে পালিয়ে যেত পারত না।’ ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই এটি জনবহুল এলাকা। হাজার হাজার মানুষের সমাগম। বিভিন্ন সমিতির নামে এখানে কিছু ক্যান্টিন রয়েছে। ফুটপাতগুলোতে অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ দোকান বসে। আদালতের নিরাপত্তার স্বার্থেই এগুলো সরিয়ে ফেলা উচিত। ইতিমধ্যে বিচারকদের সঙ্গে আমাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে দেশের সব ক্ষেত্রে এখন দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে। আদালতও এর বাইরে নেই। অথচ আদালতের পরিবেশ থাকবে আদালতের মতো। কিন্তু শুধু ঢাকা নয়, দেশের অধস্তন আদালতের কোথাও এখন সেটি নেই। যে কারণে আদালতের পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এটি আইন ও বিচার অঙ্গনের জন্য শোভন হবে না।  

ডিএমপির উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন বিভাগ) মো. জসিম উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ৪০০ পুলিশ সদস্য রয়েছেন। আসামিদের হাজিরা নিশ্চিত করা, হাজিরা শেষে ফেরত পাঠানোসহ শুনানি কাজে আদালতকে সহযোগিতা করাই আমাদের কাজ। আদালত অঙ্গনের নিরাপত্তা, দোকান, হকার এসব বিষয় দেখে স্থানীয় থানা, আদালত ও আইনজীবী সমিতি।’