সেই ১৯৭০ সাল থেকে ব্রাজিল দলকে অনুসরণ করে দেশ-বিদেশে নোঙর গাড়ছেন ৭৭ বছরের বাতিস্তা নাদাল ওরিসেস। কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে মোট ১০টি বিশ্বকাপ কভার করা প্রৌঢ় সাংবাদিক কাজ করেন ব্রাজিলের রেডিও লাগোয়া দৌড়াদায়। লাতিন দেশটির প্রায় দু'শ ক্রীড়া সাংবাদিক এসেছেন এবারের হ্যাক্সা মিশনের তরতাজা সব খবর ব্রাজিলবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে। নাদাল সেই দলের কান্ডারি।
অভিজ্ঞতার এক বিশাল ভান্ডার নিয়ে হাজির নাদালের দেখভালের দায়িত্বও বাকিদের। নাদাল দিচ্ছেন বনস্পতির ছায়া। প্রিয় ভোঁর (দাদুর) মুখে শোনা একটা কথা নিশ্চয়ই হতাশ করবে অন্যদের। নাদালের মতে এবার নাকি ব্রাজিলের হ্যাক্সা জয়ের সম্ভাবনা অনেকের চেয়েই কম! তিনি ফেভারিটের তালিকায় সবার ওপরে রেখেছেন চীর বৈরী আর্জেন্টিনাকে!
আল আরাবি স্পোর্টস ক্লাবের মিডিয়া সেন্টারে তাকে ঘিরে জটলা লেগেই থাকে। তিনি বক্তা, বাকি সবাই গুণমুগ্ধ স্রোতা। একটা করে গল্প বলেন, আর বাকিরা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খান। অনেকেই সুযোগ পেয়ে সেলফি তুলে নিচ্ছেন নাদালের সঙ্গে।
এই আড্ডায় শুধু কি ব্রাজিল, বিশ্বের অনেক বড় বড় ফুটবল সাংবাদিকও ভিড় করেন। এমনকি শত ব্যস্ততার মাঝেও। নাদালের কাছ থেকেই যে মিলে যায় নিউজের হাজারো রকম রশদ।
এমনই একটা ভিড়ে মাথা গলিয়ে দিলাম। পরিচয় দিতেই হাত ধরে কাছে টেনে নিলেন। নাহ। তিনি বাংলাদেশকে চেনেন না। দেশটিতে ব্রাজিল নিয়ে যে এত উন্মাদনা, এটাও জানা নেই। তবে নাদাল মানুষটাই নাকি এ রকম। তাই তো ভিড় থেকেই একজন তাকে পরিচয় করিয়ে দেন "পেলে অফ মিডিয়া"- বলে।
সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে নাদালের উত্তর, 'এ সব কিছু বাজে কথা। ওরা আমাকে অনেক ভালোবাসে, ওদের হৃদয়টা অনেক বড় বলেই এ সব কথা রটায়।' এরপর ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জানিয়ে দিলেন, 'আমার এই ফুটবল প্রেম শুধুই একজনের জন্য। এদসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। সবাই তাকে ডাকে পেলে।'
শরীরে বইছে ব্রাজিলের রক্ত। পেলের অসংখ্য খেলা, গোল ও পায়ের কারুকাজের চাক্ষুষ তিনি। তার কাছে তাই পেলে আছেন ঈশ্বরের আসনে। তাই বলে ম্যারাডোনাকে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন, ভাবিনি। পেলে ও ম্যারাডোনার মধ্যে কে সেরা? জানতে চাইতেই জোড় গলায় উচ্চারণ করলেন পেলের নাম।
আর ম্যারাডোনার নামটা মুখে একবার উচ্চারণ করেই হাত দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে বললেন, 'ম্যারাডোনা কোন রকম।' নাদালের কাছে বরং ম্যারাডোনার চেয়ে মেসি অনেক ভাল ফুটবলার। তবে সবার ওপরে অবশ্যই পেলে, 'মেসি অসাধারণ একটা খেলোয়াড়। তবে পেলের বিকল্প শুধুই পেলে। উনি এই শতকের সেরা ক্রীড়াবিদ। ১০০০-এর বেশি গোল করেছে। এ ছাড়া জাতীয় দলের হয়ে ৮৪ গোল আছে তার। তবে তার বড় গুণ হলো, সে খুবই বিনয়ী। সবার সঙ্গে মিশতে পারেন। সবাইকে সম্মান করেন। কাউকেই এড়িয়ে যান না। সেই ১৯৭০ সাল থেকে পেলেকে দেখে আসছি। ওর মতো আর কাউকে দেখিনি।'
এবারের বিশ্বকাপে পেলের এই অন্ধ ভক্তই কেন যেন নিজ দলের সম্ভাবনা দেখছেন না খুব বেশি, 'ব্রাজিলের সুযোগ আছে। তবে কাজটা বড্ড কঠিন। আমার চোখে তারা ফেভারিট নয়। ফেভারিটের তালিকায় সবার ওপরে আর্জেন্টিনা। এ ছাড়া বেলজিয়াম, জার্মানি ও উরুগুয়েরও সম্ভাবনা আছে। ব্রাজিলকে আমি পাঁচে রাখছি।'
ব্রাজিলিয়ান হয়েও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বলা ভবিষ্যদ্বাণীটা নাদাল করেছিলেন সৌদি ঝড়ের আগে। এখন বেশ বুঝতে পারছি, ফেভারিটদের শীর্ষে রেখে চীর শত্রুদের পর্বতসমান চাপটাই দিতে চেয়েছেন পোড় খাওয়া ভাষা শিল্পী। আর নেইমারদের চেয়েছেন নির্ভার রাখতে। বৃহস্পতিবার সার্বিয়ার বিপক্ষেই দেখা যাবে নাদালের ব্রাজিল আসলে কতটা নির্ভার!