সময় কীভাবে বদলে যায়! অবসরে যাওয়ার আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে পারবেন কি-না, এই কিছুদিন আগেও ছিল সে আলোচনা। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপ আসতে আসতে উবে গেল সব। যে রোনালদো মানেই ছিল মাঠে বিস্ময়কর কিছু, সেই রোনালদো ব্রাত্য হয়ে পড়লেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। পর্তুগাল অধিনায়ককে নিয়ে অনেক জল ঘোলা হলো এরপর। সবশেষ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের ঠিক দুদিন আগে রোনালদো হয়ে পড়লেন ইউনাইটেডের সাবেক। আফ্রিকার দেশ ঘানার বিপক্ষে আজ যখন মাঠে নামবে পর্তুগাল, তখন সবার চোখ তো রোনালদোতেই থাকবে। দোহার স্টেডিয়াম ৯৭৪-এ ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায়।
গেল দুই রাত কেমন কাটল পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী রোনালদোর? ভীষণ যন্ত্রণার না মুক্তির আনন্দের? প্রশ্নটা মনে আসতেই পারে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিজের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মোটেও সুখী ছিলেন না রোনালদো। সেই হিসেবে ইংলিশ ক্লাবটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন বিশ্বকাপে নির্ভার হয়ে খেলার সুযোগও বলা যেতে পারে। রোনালদোর মনোভাব আসলে কী সেটা আসলে বলার উপায় নেই। তবে ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন রোনালদো। সেখানে ক্লাব ও সমর্থকদের প্রতি তার অনুরাগ একই রকম থাকবে বলে জানিয়েছেন। গতকাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ব্রুনো ফার্নান্দেস এসেছিলেন পর্তুগালের পক্ষে। রোনালদোকে নিয়ে কথা বলতেই হতো তাকে। বলেছেনও। জাতীয় দলের পাশাপাশি ইউনাইটেডেও যে তারা সতীর্থ ছিলেন। ব্রুনোর কথায়, ‘ইউনাইটেডে রোনালদোর সঙ্গে খেলা ছিল স্বপ্নপূরণের মতো। কিন্তু কোনো কিছুই তো আর চিরকালীন নয়। এটা তার ক্যারিয়ার এবং আমরা সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। কেউ সম্মত হোক বা না হোক, সব সিদ্ধান্তকেই সম্মান করতে হবে।’ কিছু সিদ্ধান্ত যে মানুষের নিজের ও পরিবারের ভালো থাকার জন্য হয়ে থাকে সেই কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন ব্রুনো। তাই রোনালদোকে নির্ভার হিসেবে মাঠে দেখা যেতেই পারে।
গত সপ্তাহে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে রোনালদোর অনুপস্থিতি খবরের শিরোনাম হয়েছিল। অসুস্থতার জন্য গত সপ্তাহের ম্যাচটি খেলেননি রোনালদো। তবে আগেই রোনালদো নিজেকে পুরেপুরি ফিট ঘোষণা করেছেন। কোচ ফার্নান্দো সান্তোস তাই ঘানার বিপক্ষে পূর্ণ শক্তির দলই পাচ্ছেন।
তবে প্রতিপক্ষ ঘানাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই পর্তুগালের। ২০১০ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে দলটি দেখিয়েছিল তাদের সামর্থ্য। সেমিফাইনালে খেলারও ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছিল। শেষ চারে ওঠার লড়াইয়ে উরুগুয়েকে ফেলেছিল কঠিন পরীক্ষায়। শেষ পর্যন্ত হারতে হয়েছিল টাইব্রেকারে। রাশিয়া বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা ঘানার এটি চতুর্থ বিশ্বকাপ। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ টানা তিন আসরে ছিল তাদের প্রতিনিধিত্ব। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তাদের জয় ৪ ম্যাচে। দুটিতে ড্র আর ৬ হার সঙ্গী।
পর্তুগাল দলটায় রোনালদোই সবচেয়ে বড় তারকা। তবে ব্রুনো ফার্নান্দেস, জোয়াও ফেলিক্স, রুবেন দিয়াস, নুনো মেন্দেসের মতো খেলোয়াড় আছে তাদের দলে। অভিজ্ঞ আর তারুণ্যের মিশেলে গড়া দারুণ একটা দল তারা। এ নিয়ে টানা ষষ্ঠবার বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে পর্তুগাল। ২০০২ সাল থেকে বিশ্বমঞ্চে নিয়মিত তারা। আগের পাঁচবারের মধ্যে তারা তিনবার খেলেছে নকআউট পর্বে। ২০০৬ বিশ্বকাপে তারা চতুর্থ হয়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই তৃতীয় হওয়াটা এখন পর্যন্ত তাদের সেরা সাফল্য।
ফিফা র্যাংকিংয়ে ঘানার অবস্থান ৬১। পর্তুগাল সেখানে আছে নবম স্থানে। তাই পর্তুগালকে লড়াইয়ে এগিয়ে রাখাই যায়। তবে বিশ্বকাপে ঘানার অতীত যে রেকর্ড, তাতে আসলে পর্তুগাল সতর্কই থাকবে। তাছাড়া ‘এইচ’ গ্রুপে পর্তুগাল নিজেদের বাকি দুই ম্যাচ খেলবে উরুগুয়ে ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। উরুগুয়ে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। দক্ষিণ কোরিয়া কী করতে পারে তা তো ২০০২ আসরেই প্রমাণ করেছে। গত আসরেও জার্মানিকে থামিয়ে দিয়েছিল গ্রুপ পর্বেই। ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে সেরা দুইয়ের লড়াইটা তাই জমতে পারে বেশ। গ্রুপে প্রথম ম্যাচটা তাই সবার জন্যই জরুরি হবে। ঘানা এবং পর্তুগাল এর আগে একবারই মুখোমুখি হয়েছে। সেটা বিশ্বকাপের মঞ্চে। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আসরে গ্রুপ পর্বের ওই ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জেতে পর্তুগাল। গোল করেছিলেন রোনালদো।
সেই রোনালদোর ইউনাইটেড ছাড়া নিয়ে কাল সংবাদ সম্মেলনে ঘানা কোচ অটো আডোকেও কথা বলতে হয়েছে। তার মনে পর্তুগাল দলে এর কোনো প্রভাবই পড়বে না, ‘আমি এটা নিয়ে ভাবছি না। এটা আমাদের সমস্যা নয়। আর আমি মনে করি না এটা ওদের জন্যও বড় কোনো সমস্যা।’ কোচের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ঘানার অধিনায়ক ও সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আন্দ্রে আইয়ুও। সেই সঙ্গে এ ম্যাচে পর্তুগালকেই এগিয়ে রাখছেন তিনি। তবে তার কণ্ঠে ছিল লড়াইয়ের বার্তাও, ‘পর্তুগাল কাগজে-কলমে ফেভারিট। আমাদের মাঠে নিজেদের মেলে ধরতে হবে। কাগজে-কলমের হিসাব কী বলছে সেটা মাঠে ঘটবে না।’