তালাক থেকে সাবধান

নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা বিয়েকে বংশ পরম্পরা ও স্থায়িত্বের মাধ্যম বানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন করো যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন; আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবি করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারেও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।’ সুরা আন নিসা : ১

আল্লাহতায়ালা বিয়ের বন্ধনকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি হিসেবে নির্ধারণ করে এর সঙ্গে কতগুলো অধিকার ও কর্তব্য-সংশ্লিষ্ট করেছেন। তাতে কতক বিধিবিধান দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। তাই তো ভালোবাসা ও দয়াকে বৈবাহিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি নির্ধারণ করেছেন। আর এ দুইয়ের মাধ্যমেই মহব্বত ও হৃদ্যতা তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া; যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা।’ সুরা আর রুম : ২১

মহান স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করতে ও ন্যায়সংগতভাবে ব্যয় করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি অধিকার ও কর্তব্যকে ইনসাফভিত্তিক নির্ধারণ করেছেন। তিনি সংসার পরিচালনা ও নারীদের তত্ত্বাবধানের ভার পুরুষদের ওপর অর্পণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষরা নারীদের ওপর কর্র্তৃত্বশীল এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের এককে অন্যের ওপর মর্যাদা প্রদান করেছেন, আর এজন্য যে, পুরুষরা স্বীয় ধন-সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ সুরা আন নিসা : ৩৪

আল্লাহতায়ালা স্ত্রীদের প্রতি জুলুম, কষ্টপ্রদান, অত্যাচার, সীমালঙ্ঘন ও কঠোরতা থেকে সাবধান করেছেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করবে না, কেননা সে তার কোনো একটি আচরণকে অপছন্দ করলে অপরটিকে পছন্দ করবে।’ সহিহ মুসলিম

নিশ্চয় বিয়ে এক মহান দায়িত্ব এবং তার অধিকারসমূহও বিশাল। এর মাধ্যমে লজ্জাস্থানের হেফাজত ও বংশানুক্রম রক্ষা হয়। এতে রয়েছে সুখ ও প্রশান্তি। দৃঢ় প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তার বন্ধনকে মজবুত করা হয়েছে। তার স্তম্ভগুলোকে অলি (অভিভাবক), মোহরানা ও সাক্ষীর মাধ্যমে শক্তিশালী করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তালাককে বৈধ করেছেন, কিন্তু তার মূল বিধান হলোনিষেধ। তবে একান্ত প্রয়োজনে ও ক্ষতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তা বৈধ করা হয়েছে। ইসলাম বিয়েবিচ্ছেদের আগে বৈবাহিক সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তাই বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে উপদেশ প্রদান, শয্যাত্যাগ ও আদব শিক্ষা দিতে অনুমতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার কিংবা উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তবে তারা আপস-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোনো গোনাহ নেই এবং আপস-নিষ্পত্তিই শ্রেয়।’ সুরা আন নিসা : ১২৮

অর্থাৎ বিচ্ছেদ, রূঢ়তা, দুর্ব্যবহার ও তালাক অপেক্ষা আপস-নিষ্পত্তি উত্তম। আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি বিরোধ সৃষ্টি হয় ও একে অন্যের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে মিল-মীমাংসার অযোগ্য হয়ে পড়ে, তাদের বিরোধ নিষ্পত্তির আশা শেষ হয়ে যায় এবং একত্রে বসবাসের বিষয়ে নিরাশ হয়ে যায়, তাহলে তাকে বিধিসম্মতভাবে রেখে দেবে অথবা সদয়ভাবে মুক্ত করে দেবে। তালাক হলোসর্বশেষ সমাধান এবং সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল। এজন্য শরিয়ত পুনঃগ্রহণ ও ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। আর এর ক্ষমতাকে পুরুষের হাতে সমর্পণ করেছে। ফলে সে দুবার ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখে। তালাকপ্রাপ্ত নারী স্বামীর ঘরে তিন ঋতুস্রাবকাল ইদ্দত পালন করবে। হতে পারে আল্লাহতায়ালা ওই সময়ের মধ্যে কোনো সমাধানের পথ তৈরি করে দেবেন, ফলে তারা পুনর্মিলিত ও সমঝোতায় উপনীত হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তারা আপস-নিষ্পত্তি করতে চায় তবে এতে তাদের পুনঃগ্রহণে তাদের স্বামীরা বেশি হকদার। আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের ওপর পুরুষদের; আর নারীদের ওপর পুরুষদের মর্যাদা আছে।’ সুরা আল বাকারা : ২২৮

ইসলামের শিক্ষা, তালাকের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া এবং তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত। পারিবারিক ভাঙন ও বিচ্ছেদ কষ্টের সূচনা, হৃদয়ের মাঝে ঘৃণা সৃষ্টি ও প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্টের মূল উৎস। আর এর বলি হয় নিরপরাধ সন্তানরা। তালাক সহাবস্থানকে ধ্বংস করে, প্রিয়জনদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটায়, সংসারকে বিনাশ করে এবং পরিবারকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। তালাক হলোব্যর্থতার ধাপ, প্রত্যাশার সমাপ্তি, জীবনে অসুখী ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার সূচনা, সন্তান প্রতিপালনের প্রতিবন্ধক এবং সন্তানের বিপথগামিতা ও তাদের হক বিনষ্টের মাধ্যম। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইবলিস সমুদ্রের পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর তার বাহিনীকে চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার কাছে সর্বাধিক সম্মানিত যে মানুষকে সবচেয়ে বেশি ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ করেছি। তখন সে বলে, তুমি তো কিছুই করোনি। তারপর আরেকজন এসে বলে, আমি তাকে ছাড়িনি যতক্ষণ না স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ইবলিস এ কথা শুনে তাকে কাছে ডেকে নেয় এবং জড়িয়ে ধরে বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছো।’ সহিহ মুসলিম

বিয়ে সুদৃঢ় বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং পাপাচার থেকে মুক্ত ও পবিত্র থাকার উপায়। সুতরাং আপনারা বংশক্রম রক্ষায় সঙ্গী চয়ন করুন এবং এ ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিন। দুশ্চরিত্র সুন্দরীদের থেকে বেঁচে থাকুন, কেননা দুশ্চরিত্র নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, আর সচ্চরিত্র নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে নারীকে বিয়ে করা হয়। তার সম্পদ, বংশ মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারিতা। সুতরাং তুমি দ্বীনদার নারীকে প্রাধান্য দাও, নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ সহিহ মুসলিম

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল, বোঝাপড়ার অভাব এবং মনোমালিন্য ও বিরোধের সময় তালাক একটি উত্তরণের পথ। এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহকে ভয় করুন, আর তালাককে হিংসা-বিদ্বেষ এবং ভালোবাসা ও সম্পর্ক ছিন্নের মাধ্যম বানাবেন না। আপনারা সবাই দায়িত্বশীল, প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। জেনে রাখুন, নিশ্চয় নারীরা আপনাদের জিম্মায় আমানত এবং আল্লাহ ও তার নবীর অসিয়ত। সম্মানীরাই তাদের সম্মান করে, আর হীন লোকরাই তাদের অসম্মান করে।

স্বামীর প্রতি বিদ্রƒপ, অবাধ্যতা ও অসদাচরণ এবং ঘরের গোপনীয়তা প্রকাশ করা, দায়িত্বহীন হওয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুচ্ছ প্রদর্শনী দ্বারা প্রভাবিত হওয়াএমন নির্বুদ্ধিতা যা দ্বারা সংসার নষ্ট হয়, পারিবারিক বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। সুতরাং আপনারা সংসার ও স্বামীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। নিশ্চয় স্বামী-স্ত্রীকে অন্যায় কাজে প্ররোচিত করা, তাদের ভালোবাসাকে বিনষ্ট করা, তাদের মধ্যে ফিতনা ছড়ানো, তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ও তালাক সংঘটনে ভূমিকা রাখা হারাম। এরূপ ব্যক্তিকে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে এবং মালিকের বিরুদ্ধে কর্মচারীকে প্ররোচিত করে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ মুস্তাদরাকে হাকেম

হে নারী! আল্লাহকে ভয় করুন, কেননা বিয়ে একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি। সুতরাং অকারণে তালাক গ্রহণে আগ্রহী হবেন না। হজরত ছাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো স্ত্রী অহেতুক তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধও হারাম হয়ে যাবে।’ মুসনাদে আহমাদ

ধৈর্য একটি শ্রেষ্ঠ গুণ, উত্তম ইবাদত ও গুরুত্বপূর্ণ সৎকাজ। সুতরাং আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন এবং অসদাচরণকারীকে ক্ষমা করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা পরস্পরকে হকের উপদেশ দেয় ও ধৈর্য ধারণে পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করে।’ সুরা আল আসর : ৩

ধৈর্য যাবতীয় সমস্যা সমাধানের চাবি এবং এর মাধ্যমে মর্যাদা বাড়ে। অতএব, আপনারা ধৈর্যের পথ ধৈর্য অবলম্বন করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্বীয় রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ধাবিত হও, যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান। এটা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য। যারা সচ্ছলতা ও অভাবের সময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষদের ক্ষমা করে।’ সুরা আলে ইমরান : ১৩৩-১৩৪

২৫ নভেম্বর মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা

অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান