বিক্ষোভে নমনীয় চীন

করোনা মহামারীতে ইউরোপ, আমেরিকায় ব্যাপক প্রাণহানি হলেও প্রাণঘাতী ভাইরাসটির কথিত উৎপত্তিস্থল চীনে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কম ছিল। করোনা ঠেকাতে দেশটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী শি চিনপিং গ্রহণ করেছিলেন কঠোর ‘জিরো কভিড’ নীতি। কিন্তু গত চারদিনে চীনে করোনা আক্রান্তের হার রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। দেশটিতে গতকাল সোমবার রেকর্ড পরিমাণ ৪০ হাজার ৫২ জন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যেই আবার জিরো কভিড নীতির বিরুদ্ধে চীনজুড়ে বিক্ষোভ করছে হাজার হাজার মানুষ। এই পরিস্থিতিতে দেশটির কয়েকটি শহরে জিরো কভিড নীতি কিছুটা শিথিল করেছে প্রেসিডেন্ট চিনপিংয়ের সরকার। চীনের সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এর আগে চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও সবচেয়ে জনবহুল শহর সাংহাইয়ের রাস্তায় প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের পদত্যাগের দাবিতে প্রকাশ্যে স্লোগান দেয় বিক্ষোভকারীরা। অনেককে ‘শি চিনপিং, সরে দাঁড়াও’, ‘কমিউনিস্ট পার্টি, বিদায় নাও’ স্লোগান দিতে শোনা যায়, বেশ কয়েকজনকে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে সাদা কাগজ প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। নজিরবিহীন এই ব্যাপক বিক্ষোভ মোকাবিলায় দমনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে চীন সরকার। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সোমবার সাংহাইয়ের বিক্ষোভস্থল থেকে পুলিশ দুজনকে আটক করেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন ওই এলাকার ছবি কিংবা ভিডিও করতে পথচারীদের বাধা দিয়েছে। রয়টার্স গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র সাংহাইয়ে গত রবিবার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। সাংহাইয়ে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় পুলিশ বিবিসি’র সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও প্রহার করে বলে দাবি করেছে বিবিসি।

চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জিনজিয়াং-এর রাজধানী উরুমকিতে গত বৃহস্পতিবার ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন প্রাণ হারায়। কঠোর লকডাউনের কারণে সেখানে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হয়েছে বলে জনগণ অভিযোগ করে। তবে কর্র্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তারা বিক্ষোভ শুরু করে। চীনের রাজধানী পেইচিংসহ বড় বড় বিভিন্ন শহরে শত শত লোক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শনিবার রাতভর বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্রাউডসোর্স করা তালিকায় দেখা গেছে, ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

মূলত চিনপিংয়ের দীর্ঘদিন ধরে চলমান জিরো কভিড নীতিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ তুলছে সাধারণ চীনারা। এ কঠোর নীতি জনগণের মনে হতাশা তৈরি করেছে। তারা লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন ও গণহারে করোনা পরীক্ষা নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সোমবার রাজধানী পেইচিংয়ের থার্ড রিং রোডে দুই গ্রুপের অন্তত এক হাজার বিক্ষোভকারী স্লোগান দেন, ‘আমরা মাস্ক চাই না স্বাধীনতা চাই, আমরা করোনা পরীক্ষা চাই না, স্বাধীনতা চাই।’

দেশটিতে চিনপিং এবং ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কিংবা স্লোগান দেওয়ার ঘটনা বলতে গেলে বিরল। দেশটির আইন অনুযায়ী সরকার ও প্রেসিডেন্টকে নিয়ে সমালোচনাকারীদের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। করোনা নীতি নিয়ে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ সত্ত্বেও শি চিনপিং এতদিন শূন্য করোনা নীতির পক্ষে অনড় ছিলেন।