দ্য মেসি শো!

দ্য মেসি শো! হ্যাঁ, আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ নিয়ে আমি এ কথাটাই সবার আগে লিখব। পুরো মেসিময় এক ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়াকে তাই হারতেই হলো। মেসির জাদুর ছোঁয়ায় প্রতিপক্ষকে তো এভাবেই পুড়তে হয়!

আহমেদ বিন আলি স্টেডিয়ামে শনিবার রাতে যারা মাঠে ছিলেন তারা সত্যিই সৌভাগ্যবান। ২-১ গোলে জিতল আর্জেন্টিনা। পা রাখল কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে। প্রত্যাশিতভাবেই। তবে জয়টা তো আর খুব সহজে এলো না। ব্যবধান গড়ে দিলেন একজন লিওনেল মেসি। টেলিভিশনেও আমরা যারা ম্যাচটা দেখলাম, মেসিতে মোহগ্রস্ত হওয়ার মতোই পরিস্থিতি হলো।

অনেক দিন পর দেখলাম একটা খেলায় মাঠে অনেক কিছু করে দেখালেন মেসি। উইথ বল, উইদাউট বল, মুভমেন্ট, পাসিং। যেভাবে গোল করলেন সেটা তো অবিশ্বাস্য। কঠিন পরিস্থিতিতে একটা জায়গা তৈরি করা এবং সেখান থেকে গোল করা। এটা মেসি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

নিজের প্রিয় জায়গা থেকেই গোলটা করেছেন মেসি। বার্সেলোনায় যেমন ডান দিকে খেলতেন। ওই জায়গা থেকে তিনি খুবই সাবলীল। ডি মারিয়া যেহেতু ছিলেন না, তার ওই জায়গাতে খেলাটা অনুমিতই ছিল। পাপু গোমেজ শুরুর একাদশে থাকলেও মেসি সব সময় ওই জায়গাতে চলে যাচ্ছিলেন। যা অস্ট্রেলিয়াকে বেশ সমস্যায় ফেলেছে।

অস্ট্রেলিয়াকে অবশ্য কৃতিত্বও দিতে হবে। তারা লড়াকু ম্যাচ উপহার দিয়েছে। ২-০ তে এগিয়ে থাকায় অবস্থায় মনে হচ্ছিল খুব সহজেই জিতে যাবে আর্জেন্টিনা। সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া লড়াইয়ে ফেরে। যদিও আত্মঘাতী গোল পায় তারা। তবে সেটা আসলে তাদের প্রচেষ্টার ফল।

অস্ট্রেলিয়া এ ম্যাচে হাইপ্রেস খেলে চমকে দিয়েছে সবাইকে। সাধারণত ওরা মিডব্লক করে খেলে থাকে। আর্জেন্টিনার সঙ্গে হাইপ্রেসে গিয়ে সাহসিকতার পরিচয়ই দিয়েছে বলব। ম্যাচে দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন বাড়বে তখন ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে জরুরি হয়। এই ম্যাচে মেসি সেটাই দেখিয়েছেন। আরেকজনের কথা বলতেই হবে- জুলিয়ান আলভারেজ। ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটা তার। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে গোল পেলেন ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা ২২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই খেলোয়াড়ের মধ্যে কিছুটা কার্লোস তেভেজ ও কিছুটা সার্জিও আগুয়েরোর মিশ্রণ আছে।

আর্জেন্টিনার দুই মার্তিনেজের কথা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তাদের সেভ আর্জেন্টিনাকে টিকিয়ে রাখে ম্যাচে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ যে ট্যাকলটা করলেন আজিজ বেহিচকে, মনে হচ্ছিল বেহিচ যেন মেসি হয়ে গেছেন। আর এমিলিয়ানো মার্তিনেজ তো শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত গোল রুখে দিলেন। রদ্রিগো ডি পল ও এনজো ফার্নাদেজ মিডফিল্ডে অসম্ভব কঠোর পরিশ্রম করেছেন। বক্স টু বক্স দারুণ খেলেছেন ডি পল। দ্বিতীয় গোলটা তো তার জন্যই হয়েছে। তিনি যে প্রেসিং করেছেন, সেটা দেখেই আলভারেজ প্রেসিং শুরু করেছেন। দুজনের বোঝাপড়াটাও ছিল দারুণ।

তবে খুবই হতাশ করেছেন লাওতারো মার্তিনেজ। সহজ সহজ সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেছেন। একটা গোল করা তার জরুরি ছিল। সেটা হলে তিনি আত্মবিশ্বাসীও হতেন। এই জায়গাটায় দ্রুত উন্নতির দরকার। কারণ নকআউট পর্বে ম্যাচ যতটা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। না হলে ঝুঁকি থেকে যায়। আর্জেন্টিনার যেমন ৩-০ বা ৩-১ করার সুযোগ ছিল। লাউতারো কেন নিজেকে মেলে ধরতে পারছেন না এটা একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কোপা আমেরিকায় প্রথম একাদশে খেলেছিলেন তিনি। অনেক সময় ক্লাবের পারফরম্যান্স জাতীয় দলেও প্রভাব ফেলে। ক্লাবে যতটা ভালো করা দরকার সেট হয়তো করতে পারছিলেন না। বা অনেক সময় বিশ্বকাপ অনেকের ক্ষেত্রে চাপ হয়ে যায়। লাউতারোকে এখন থেকে কামব্যাক করতেই হবে।

লিওনেল স্কালোনির ট্যাকটিসের প্রশংসা আগেও করেছি। আজও করি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ভেতরে ট্যাকটিসে কিছু বদল আনেন তিনি। এটা তিনি নিয়মিত করছেন। ১-০ গোলে এগিয়ে থাকা অবস্থায় যেমন রক্ষণে চারজনের জায়গায় পাঁচজন করে দিলেন। শেষ আটে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে খেলতে হবে তার দলকে। ডাচ দলেও একজন লুইস ফন গাল আছেন। স্কালোনি ও ফন গালের ট্যাকটিসের লড়াইটা দেখার হবে।

মেসির কথা দিয়েই লেখাটা শেষ করি। আমরা অনেক ড্রিবলারকেই তো দেখি, যারা খুব কাটাতে পারেন এবং মাথা নিচু করে সেটা করতে থাকেন। কিন্তু মেসি এমন একজন তিনি ড্রিবলিংয়ের মধ্যেও দেখেন সতীর্থরা কে কোথায় ফ্রি হচ্ছে। পাসিং চ্যানেল কোথায় ওপেন হচ্ছে। এটা জিনিয়াস। মেসি এমন খেলতে থাকলে আর্জেন্টিনাকে রোখা কষ্ট হবে যে কারও জন্য।