বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা নানা কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছে। দাবি আদায়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মানুষের সংগঠিত হওয়া, প্রতিবাদ জানানো কিংবা ধর্মঘট অন্যতম গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমরা বলপ্রয়োগ ও সহিংসতায় পর্যবসিত হতে দেখেছি। রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা দেশশাসন দুটোই করে রাজনৈতিক দল। কিন্তু এসব সংঘাতে প্রাণ হারায়, পঙ্গু হয় সাধারণ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধনকৃত অলাভজনক স্বাধীন সংগঠন আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই রাজনৈতিক বৈরিতা ও বিরোধে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেখা গেছে নির্বাচনের আগে ও পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈরিতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই অস্থির হয়ে পড়ছে রাজনৈতিক পরিবেশ, উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজপথ। এর জের ধরে একদিকে অভিযোগ আসছে দমন-পীড়ন, বলপ্রয়োগ ও অপকৌশলের, অন্যদিকে সংঘাত-সহিংসতা ও প্রাণহানির পুরনো শঙ্কা ফিরে আসছে।
ঢাকায় বিএনপির আগামী ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি সে সাক্ষ্যই দেয়। সর্বশেষ গতকাল বুধবার, রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা। পুলিশের দাবি, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা অনুমতি ছাড়াই রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ করছিলেন। তাদের সরে যেতে বারবার অনুরোধ করা হলেও তারা কথা শোনেনি। একপর্যায়ে তাদের সরিয়ে দিতে গেলে তারা পুলিশের ওপর হামলা করেন।’ ঘটনা যাই হোক না কেন পুলিশ প্রাণহানির দায় এড়াতে পারে না। রাজনৈতিক সংঘাতে পুলিশকে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে কৌশলী হতে হবে। আবার ক্ষমতাসীনদের বেলায় যেখানে সেখানে রাস্তা আটকে সভা-সমাবেশে পুলিশকে কখনো ‘অনুমতি’ নিয়ে তৎপর হতে যেখানে দেখা যায় না, সেখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে আইন কি কেবল বিরোধী দমনের জন্য তৈরি কি না। উপরন্তু, পুলিশের একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে বলপ্রয়োগ করে ঢুকে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার যেমন অপ্রত্যাশিত তেমনি জব্দ তালিকায় খিঁচুড়ি থাকার ঘটনাটিও উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, নয়াপল্টনের মতো রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে সমাবেশ যে যানজটের শহরে জনভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে তোলে সেটিও ভুলে গেলে চলবে না। তবে, এর আগে বিএনপির অন্যান্য বিভাগীয় সমাবেশের ঠিক আগে প্রতিটি ক্ষেত্রে সেখানে ‘কাকতালীয়ভাবে’ পরিবহন ধর্মঘটের বিষয়টি বিএনপিকে সমাবেশের স্থান নিয়ে অনড় অবস্থানের দিকে ঠেলে দিয়েছে কি না ভাবা দরকার।
আগামী ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসও বটে। এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ এক বিবৃতিতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠান এবং মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকার সনদের বিভিন্ন বিধান মেনে চলার অঙ্গীকার রক্ষায় বাংলাদেশকে তাগিদ দিয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ‘আইনের শাসনের প্রতি সম্মান দেখাতে এবং সহিংসতা, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে আমরা সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাই।’ এর আগে, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেছিলেন রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচনী অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের ভীত করে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে মোট ৩৮৭টি। এতে নিহত হয়েছেন ৫৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪০০ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনসহ রাজনৈতিক কারণে দেশের প্রায় সব জেলায় এসব সহিংস ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন ভবিষ্যতে, বিশেষ করে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তেমনটি ঘটলে তা হবে দেশ ও জনগণের জন্য অশুভ ও অকল্যাণকর, যা বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় উভয় দলের রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি। আমরা জানি, বিশ্ব একটি অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যা সমাধানের উদ্যোগকেই শ্রেয় বলে মনে করি আমরা। অনেকে মনে করেন, দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক চলছে, তা দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার রাজনীতি পরিহার করে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে উন্নয়ন আরও বেগবান হবে। সংঘাত-সহিংসতার পথ ধরে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে, যা কারও কাম্য নয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে সবাই সহনশীলতার পরিচয় দেবেন, এটাই প্রত্যাশা।