১৯৮৬ বিশ্বকাপটা ছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর এই বছর এটা হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ। হ্যাঁ, এখনই বলে দেওয়া যায় যে এই বিশ্বকাপটা হচ্ছে মেসির বিশ্বকাপ, তার জীবনের সেরা বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনার হয়ে সেরা বিশ্বকাপ। কী রেকর্ড হচ্ছে আর ফল কী হচ্ছে সেসবের তোয়াক্কা না করেই কথাটা বলছি। এখন আর ফুটবল মাঠে তার নেতৃত্বের গুণাবলি আছে কি নেই এইসব নিয়ে কোনো আলোচনাই হওয়া উচিত না, কারণ এই আর্জেন্টিনা দলটা যে শেষ চার পর্যন্ত এসেছে তার প্রতিটা পদক্ষেপেই মেসি তার জাদুকরী ফুটবল সামর্থ্য দেখিয়ে এসেছে। ডাচদের টাইব্রেকারে হারিয়ে তারা এখন স্বপ্নের শিরোপা থেকে মাত্র দুই ম্যাচ দূরে। লুসাইল স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তারা ঐতিহাসিক জয় পেয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ দিয়ে, তবে এই যাত্রার শেষ অধ্যায়টা এখনো লেখা বাকি। গোটা বিশ্বকাপ অভিযাত্রায়, কাতার বিশ্বকাপে মেসিকে যতটা দলের সঙ্গে একাত্ম মনে হয়েছে, বাকি আসরগুলোতে এতটা মনে হয়নি। শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের হিসাব করলেই চলবে না, নেতা হিসেবেও মেসিকে এতটা দায়িত্বশীল ভূমিকায় আগে কখনো দেখা যায়নি। শুক্রবার রাতে তো সে সবার জন্য লড়াই করল। পুরোটা ম্যাচজুড়ে মেসির পারফরম্যান্স ছিল দেখার মতো। প্রথমে সে নাহুয়েল মলিনাকে অ্যাসিস্ট করল দারুণভাবে। ১২ কদম দৌড়ে সে যে পাসটা দিল মলিনাকে, সেটাই ছিল প্রথম গোলের উৎস। এরপর অমন টানটান উত্তেজনার ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করা।
তবে শেষ ১০-১৫ মিনিটে ওভাবে গোল হজম করাটা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু তারপরও আর্জেন্টিনা যেভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে খেলে গেছে এবং আর কোনো বিপদ বাড়তে দেয়নি, সেটা প্রশংসার দাবিদার। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মন্তিয়েল আর ডি মারিয়ার উপস্থিতি এই ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তবে আগের ম্যাচগুলোতে আমরা যেভাবে রক্ষণ করেছিলাম, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কিন্তু সেভাবে আমরা রক্ষণটা আগলে রাখতে পারিনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যেমনটা ছিল অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোর বিপক্ষে। কিন্তু এবার আমরা পারিনি। কারণ আমরা পুরোপুরি ধকল কাটিয়ে উঠতে পারিনি আর মাঠে তার ছাপ পড়েছে। গোল করে এগিয়ে থাকা দল কীভাবে এই অগ্রগামিতাকে টিকিয়ে রাখে, সেই খেলাটাও আমাদের শিখতে হবে, আমাদের ভালোভাবে রক্ষণ করাটাও জানতে হবে।
তবে যাই হোক, আমার মনে হয় প্রাথমিকভাবে লিওনেল স্কালোনি যে ট্যাকটিকসটা অবলম্বন করেছিল সেটা দারুণ কাজে দিয়েছে। আর্জেন্টিনা ম্যাচটা নিয়ন্ত্রণ করেছে, প্রতিপক্ষের অর্ধে গিয়ে খেলেছে বেশিরভাগ সময়। ব্যক্তিগত দ্বৈরথগুলো জিতেছে এবং গোল করেছে।
দ্বিতীয় গোলটা করার পর আর্জেন্টিনা বলের দখল ছেড়ে দিয়ে রক্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তখন ডাচরা হাওয়ায় ভাসিয়ে দূর থেকে বল আর্জেন্টিনার বক্সে ফেলছিল। আমার মনে হয় এখানেই আর্জেন্টিনা একটু ভুল করেছিল, এই কৌশলের কোনো প্রতিরোধ স্কালোনির হাতে ছিল না। আমার মনে হয় যখন তারা এগিয়ে গিয়েছিল, তখন বল নিজেদের পায়ে রেখেই তাদের রক্ষণ করে যাওয়া উচিত ছিল। আমি বলব না যে তাদের মধ্যে একটা আয়েশি ভাব চলে এসেছিল, যেটা বলব যে তাদের খেলায় মনোযোগ একটু হালকা হয়ে এসেছিল। পরের ম্যাচে এই ব্যাপারটা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
যাই হোক, অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডসের কাছ থেকে পার পেয়ে গেছে তাদেরও পালটা মার দেওয়ার মানসিকতার কারণেই। এরকম জয় দলের বন্ধনকে শক্ত করে। উসকানিমূলক আচরণের জবাব কী করে দিতে হয়, এই খেলোয়াড়রা সেটা ভালোই জানে। প্রতিপক্ষ শেষ মুহূর্তে ড্র করে এমনিতেই তাদের বিরক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিল, তার ওপর অমন আচরণ মাঠে। সব মিলিয়েই বিস্ফোরণ হয়েছে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মনে ও দেহে। সেটাই তাদের তাতিয়ে দিয়েছে, উত্তেজনার জ্বালানি জুগিয়েছে যেটা তাদের নিয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত।
মাঠে সাংবাদিকরা সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করছিল এমিলিয়ানো মার্তিনেজের কথা। নির্ধারিত সময়ে তাকে খুব কমই ব্যস্ত হতে হয়েছে। একটা ফ্রি-কিকে আসা ক্রস ধরেছে রিবাউন্ড না করে, সে হাওয়াই বলে বেশ ভালো তবে আগের ম্যাচে পায়ের কাজ ছিল কম। আর ওয়েগহর্স্টের হেড থেকে করা গোল আর ফ্রি-কিক নিয়ে আসলে ওর কিছুই করার ছিল না, সেট-আপটাই ছিল অমন। তবে পেনাল্টি শুটআউটে সে আবারও নায়ক হয়ে উঠল। দুটো পেনাল্টি বাঁচাল। দিবু মেসির এই অবদান ও নেতৃত্বকে সফল করে তুলেছে।
ভাগ্য আর্জেন্টিনার সঙ্গী ছিল তাই তারা জিততে পেরেছে কিন্তু লাতিন আমেরিকার আরেক ফেভারিট ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে। ক্রোয়েশিয়া সেটাই করে দেখিয়েছে যেটা অসম্ভব মনে হচ্ছিল, তবে গতবারের রানার্সআপরা তাই করেছে। খেলাটা অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়া এবং পেনাল্টি শুটআউটে নিয়ে যাওয়ার যে ফরমুলায় তারা ২০১৮ সালে সফল হয়েছে, এবারও তারা সেই নকশাতেই হাঁটছে। ইউরোপিয়ান শক্তিটি প্রমাণ করেছে যে আর্জেন্টিনার জন্য তাদের ডিঙিয়ে ফাইনালে যাওয়া সহজ হবে না। আর ৩৭ বছর বয়সে এসেও লুকা মদ্রিচ যা খেলছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় কেন সে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে।