সরকার সোনা আমদানিতে নানা সুযোগ দেওয়ার পরও পাচার রোধ করতে পারছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। প্রতিদিনই দেশের সবকটি বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকা দিয়ে চালান পাচার হচ্ছে। আবার বিভিন্ন দেশ থেকেও আসছে চালান। পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর তালিকার পর তালিকা করছে। পাচারের সময় মাঝেমধ্যে দুই-একজন গ্রেপ্তার হলেও প্রকৃত পাচারকারীরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ধরা পড়া বাহকরা প্রকৃত সোনার মালিকদের পরিচয়ও দিতে পারছে না। মোটা অঙ্কের অর্থ পেয়ে অপরিচিত বাহকরা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে নানা রকমের তথ্য। বিদেশ থেকে পাচার নিয়ন্ত্রণ করছে পাচারকারীরা। ইতিমধ্যে ৬৭ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। তাদের ধরতে ইন্টাপোলের সহায়তা চাইবে পুলিশ।
জানা গেছে, নির্দিষ্ট হারে শুল্ক দিয়ে সোনা আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। দুবাই, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও আর্জেন্টিনা থেকে সোনার চালান আনা হচ্ছে দেশে। এরপর তা স্থলপথে চলে যাচ্ছে ভারতে। মাঝেমধ্যে বিমানবন্দরে কিছু সোনা জব্দ হলেও সম্প্রতি সীমান্তে উল্লেখযোগ্য হারে উদ্ধার হচ্ছে। এতে চিন্তিত পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দারা। কাটআউট পদ্ধতিতে এসব সোনা পাচার হচ্ছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে বাহক কখনোই প্রকৃত মালিকের সন্ধান দিতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোনা পাচারকারীদের ধরা হচ্ছে। যারা গোপনে সক্রিয় আছে তাদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে। একই কথা বলেছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পাচারকারী দলনেতারা বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করেন সোনার চালান। ইতিমধ্যে পুলিশ ও আমরা একটি গোপন প্রতিবেদন পাঠিয়েছি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। কোন কোন দেশ থেকে কারা সোনা পাচার নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের শনাক্ত করা গেছে। ৬৭ জনের নাম পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তাদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে। এই নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে।
তদন্ত তদারক সূত্র মতে, চার ধাপে সোনা পাচার হয়ে থাকে। প্রথম ধাপে বাহক হিসেবে দুবাই ও সিঙ্গাপুর থেকে একজন ব্যক্তি সোনার চালান নিয়ে আসেন। এক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তি নিজেও জানেন না ওই সোনা কার কাছে পৌঁছাতে হবে। শুধুমাত্র বিদেশে তার পাসপোর্টের ফটোকপি রেখে দেওয়া হয়। এরপর তাকে বলে দেওয়া হয় দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে তার কাছ থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি একটি সাংকেতিক কোড ব্যবহার করে চালান রিসিভ করবে। দ্বিতীয় ব্যক্তির কাজ হচ্ছে ওই সোনা সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া। সেখান থেকে বাহক হিসেবে সাধারণ কোনো ব্যক্তিকে ব্যবহার করে ওই স্বর্ণ সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
গোয়েন্দাদের ভাষায় এ ধরনের কার্যকলাপকে কাটআউট বলা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র জঙ্গি ও সোনা ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করে থাকেন। তবে সম্প্রতি কিছু সোনা আটকের ঘটনায় পুরান ঢাকার এক নামকরা ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। তাকে সবাই সোনা ও হুন্ডি ব্যবসার মাফিয়া বলে থাকেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে সোনার বড় চালান নির্বিঘেœ বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায়। এ কাজে সহায়তা করেন শুল্ক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও বিমানের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ১০ তোলা ওজনের একেকটি সোনার বার বিমানবন্দর থেকে বাইরে এনে দিলে চোরাচালানিদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে ১২শ টাকা পান তারা। আবার অনেক সময় দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিমানের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সোনা পরিবহনে সহায়তা করেন। বাহকদের হাতে সোনা ধরিয়ে দেন দুবাইয়ে অবস্থানরত চক্রের প্রধানরা। বাহক সেই সোনা বিমানের আসনের নিচে, শৌচাগারে বা অন্য কোনো স্থানে লুকিয়ে রেখে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। পরে বিমানবন্দরে কর্মরত লোকজন নিজ দায়িত্বে সেই সোনা বের করে বাইরে নিয়ে আসেন।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুই মাসে ১২টি জেলার বিভিন্ন সীমান্ত থেকে অন্তত শত কোটি টাকার সোনা জব্দ হয়েছে। সোনাগুলো ভারতে চালানের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল। এসব ঘটনায় আটকরা প্রকৃত সোনার মালিককে কখনো চোখে দেখেননি বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। কাটআউট পদ্ধতিতে তারা টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করার দায়িত্বে ছিলেন। বিদেশ থেকে যারা এসব অপকর্ম করছেন তাদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হবে। ১২ জেলার অর্ধশতাধিক পয়েন্ট দিয়ে ভারতে সোনা পাচার হচ্ছে। কৃষক, দিনমজুর, ট্রাক-লরির চালক, খালাসি, রাখাল ও জেলেরাও জড়িয়ে পড়ছেন এসব কাজে। কখনো টিফিন বক্স, ফলের ঝুড়ি, সবজি ও মানব শরীরে পাচারের সময় ধরা পড়ছে। তবে চোরাচালানের মূল হোতাদের ধারেকাছে যাওয়া যাচ্ছে না তা সত্য। সাতক্ষীরা, বেনাপোল, কুষ্টিয়া, যশোর, লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চল বেশি নজরদারি চলছে। চোরাকারবারিরা কথাবার্তা বলেন এসএমএসের মাধ্যমে। তিনি আরও বলেন, পাচারে নিজস্ব বাহক যেমন কাজে লাগানো হচ্ছে, তেমনি টাকার টোপে কখনো পাইলট, কখনো ক্রু, কখনো বিমানবালাকেও কাজে লাগাচ্ছেন তারা। তাছাড়া বিমানের ক্লিনার, ট্রলিম্যান এমনকি প্রকৌশলীরাও এই চক্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সোনা পাচার চালিয়ে যাচ্ছেন।