কেউ চাইলে একমত হতে পারে অথবা দ্বিমত পোষণ করতে পারে, আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা লিওনেল মেসিরই বিশ্বকাপ। সে এখন আর শুধু আর্জেন্টিনার নেই। সে এখন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিনিধি। মেসি এখন দলটাকে মাঠে এবং মাঠের বাইরে, দুই জায়গাতেই নেতৃত্ব দিচ্ছে। সে এখন
গোল করছে, গোল করাচ্ছে এবং একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইও করছে যেটা আগে ওর মধ্যে দেখিনি। এখানে, কাতারে আমি তাকে দেখেছি ড্রেসিং রুমে গোটা দলকে উদ্বুদ্ধ করতে। এই বিশ্বকাপে লোকে ম্যারাডোনার সেই প্যাশন, স্পিরিট আর গোল করার ক্ষুধাটা মেসির ভেতর খুঁজে পেয়েছে। এখন মেসি বিশ্বকাপ শিরোপা থেকে মাত্র ১ ম্যাচ দূরে, যে শিরোপার জন্য অপেক্ষা চলছে ৩৬ বছর ধরে।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা শুরু হয়েছিল ক্রোয়েশিয়ার বলের দখল নিজেদের ভেতর রাখার কৌশল নিয়ে। যেটা তারা খুব ভালোভাবেই পারে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা কৌশল পরিবর্তন করল। শুরুটা হয়েছিল নাহুয়েল মলিনাকে দিয়ে, সে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বল এত জোরে পাঠিয়েছিল যে সতীর্থদের কেউই বলটা আয়ত্তে নিতে পারেনি। এর খানিক পর ক্রিস্তিয়ান রোমেরো পাস পেল রদ্রিগো দি পলের কাছ থেকে কিন্তু সেটা গোলরক্ষকের কাছে পাঠাল।
দুই দলই চেয়েছিল ঝুঁকিমুক্ত খেলা খেলতে যাতে খুব বেশি ক্ষতি না হয়। আর্জেন্টিনা সেখানে একটু বেশিই ঝুঁকি নিয়েছিল। প্রথমার্ধের ১০ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর, ক্রোয়েশিয়া আস্তে আস্তে মাঝমাঠের দখল নিতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ম্যাচেরও। তারা খুব কমই থামছিল আর বেশ কিছু ভালো আক্রমণে ক্রস, কর্নার, ভালো কাটব্যাক এসব আদায় করে নিচ্ছিল।
এরপর এলো সেই মুহূর্ত, একটা সামনের দিকে বাড়ানো লম্বা পাস যেটায় মেসি বল ছুঁয়ে দিয়েছিল জুলিয়ান আলভারেজকে আর আলভারেজ দৌড়ে গেলে তাকে বাধা দেয় গোলরক্ষক ফলে পেনাল্টি হয় যেটা থেকে মেসি গোল করে।
দ্বিতীয় গোলটা ছিল নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাক, জুলিয়ান ৭০ মিটারের মতো বল নিয়ে দৌড়ে যায়। নাহুয়েল মলিনা মার্কারদের তার কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিল না আর সেই সুযোগে আলভারেজ তার সামনে ক্রোয়েশিয়ার যত খেলোয়াড় পড়েছিল সবাইকে কাটিয়ে গিয়ে গোলটা দিয়ে ২-০ করে ফেলে। দ্বিতীয়ার্ধে গতবারের রানার্সআপরা ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিল এবং বেশ বিপজ্জনকই হয়ে উঠছিল, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের ২৪ মিনিটে মেসির পাসে জুলিয়ান আলভারেজের গোলটা ম্যাচটাকে আর্জেন্টিনার দিকে শতভাগ নিশ্চিত করে দেয়। কী দারুণ গোলই না করল আর্জেন্টিনা, আর জুলিয়ান আলভারেজের কথাও যদি বলি, একই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সহজ আর কঠিন দুরকম গোলই সে করল। গোলগুলো ওর নিজের জন্য আর প্রতিপক্ষের জন্য, মনে রাখার মতো হয়েই থাকবে। কোনো সন্দেহ নেই মেসি আর আলভারেজ এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেরা দুই খেলোয়াড়। এখন তাদের কাজ হচ্ছে ফাইনালে সেরা পাসটা দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো।
স্বপ্নের মতো একটা ম্যাচ খেলল মেসি। প্রথমে পেনাল্টিতে গোল করে দলকে এগিয়ে দিল। উঁচু করে জোরাল শট নিয়েছিল লিভাকোভিচের বিপক্ষে। যে গোলে সে আর্জেন্টিনার পক্ষে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গেল। শট নেওয়ার আগে সে নিজের উরুতে হাত বুলাচ্ছিল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এসে চোট পেলে এরচেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। তবে প্রথমার্ধের শেষ সময়ে সে যেভাবে দৌড়াল, ড্রিবল করল আর ক্রোয়েশিয়ার কর্নার ফ্ল্যাগের কোণে গেল তাতে মনে হয়েছে সে দেখে নিল সব ঠিকঠাক আছে কি না। কোনো সন্দেহ নেই এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ, তবে এবার তার আশপাশে ভালো খেলোয়াড়রা আছে আর কোচ লিওনেল স্কালোনি তার কৌশলও ঠিক করছে মেসির সর্বোচ্চ উপযোগ নিশ্চিত করে। ফলে দলটা খুব চমৎকারভাবে খেলছে, বেশ কিছু ফুটবলীয় শিক্ষা তারা এরই মধ্যে দিয়েছে আর এরই মধ্যে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।
আমি মেসিকে জানি। সে সবসময় জিততে চায়, সে হারতে চায় না। আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা অনেক ভালো, আমরা জাতীয় দলে একসঙ্গে খেলেছি। ম্যারাডোনা-পরবর্তী সময়টাতে তার জন্য সবকিছু সহজ ছিল না। সবসময় তাকে ডিয়েগোর সঙ্গে তুলনা করা হতো, সেজন্য বোধহয় তার একটু খারাপও লাগত। তবে এখন সে তার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে আর মাত্র ১ ম্যাচ দূরে। এই ম্যাচটা জিততে পারলেই তাকে ঘিরে যত তুলনামূলক আলোচনা আছে, সব থেমে যাবে।
মেসি এতদিনে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হয়ে গেছে, বিশ্বকাপ জেতাটা হবে তার রাজ্য অভিষেক।