আঠার মতো লেগেছিলেন জাসকো গাভারডল। লিওনেল মেসির চেয়ে দৈহিক গড়নে অনেকটা বড়। পেছনে মাতেও কোভাসিচ থামাতে এসেছিলেন মেসিকে। ছুঁয়েও দেখতে পারেননি। ডি বক্সে চলে আসার পর ডেজান লভরেনও সতর্ক। কিন্তু কিসের কী, মেসি যখন সেরা ছন্দে তখন বিপক্ষে তিন কেন, ছয়জন থাকলেও লাভ নেই। ঠিক যেমন লাভ নেই উচ্চতা ও দৈহিক শক্তির হিসাব করেও। জাদুকর যখন ছোটেন সব বাধাই তার কাছে কম পড়ে যায়। জাতীয় ও ক্লাব মিলিয়ে ১০২৪ ম্যাচে ৩৮৮টি অ্যাসিস্ট, সেসবে এমন কতবার ব্যারিকেড পড়েছিল তার সামনে। সবগুলোয় তার জাদুকরী পায়ে চিড়েচ্যাপ্টা।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালের ৬৯ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজকে যে গোল উপহার দিয়েছেন। অ্যাসিস্টের দিক থেকে তা হুবহু মিলে যায় বার্সেলোনার সেরা সময়ের মেসির সঙ্গে। তার বয়স এখন ৩৫, অথচ বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে স্মৃতির ডানায় ভাসিয়ে নিচ্ছেন ২০০৫ থেকে ২০২০-এ। যে ১৫টি বছর পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন পুরো বিশ্বকে। সেই ১৫ বছর ফিরিয়ে এনেছেন এই ২২ দিনে। ২২ নভেম্বর সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ থেকে ১৩ ডিসেম্বর ক্রোয়েশিয়া পর্যন্ত, যেন বার্সেলোনার মেসি মুগ্ধ করে যাচ্ছেন পুরো বিশ্বকে।
বিশ্বকাপ কাতারে হওয়া নিয়ে যত সমালোচনা ছিল। তা কি আর মনে আছে কারও। নিশ্চয় নেই। মেসি একাই চাদর হয়ে গেলেন সেসবের জন্য। উল্টো আর্জেন্টিনা জাদুকরের মূর্ছনায় কাতার এখন সেরা জাদু মঞ্চ। মঙ্গলবার তেমনই এক প্রদর্শনীর দেখা মিলল। মধ্যমাঠের ডানপ্রান্তে গাভারডলের সঙ্গে বলদখলের লড়াই মেসির। গায়ের জোরের সঙ্গে পারছিলেন না তিনি। বল কোনো রকমে মাঠের ভেতর রেখে গাভারডলের ধাক্কায় নিজেকে সরে যেতে হয় দাগের বাইরে। পরক্ষণেই ক্ষিপ্রগতিতে ফিরে এসে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর গাভারডল গায়ের সঙ্গে লেগে থাকলেও কোনো পাত্তা পাননি। শক্তির হার হয় শিল্পের কাছে। এই ডিফেন্ডারসহ মেসি ক্রোয়েশিয়ার ডিবক্সে একদম গোলপোস্টের কাছে চলে যান ডানপ্রান্ত দিয়ে। সেখান থেকে কাছেই আনমার্ক হয়ে দাঁড়ানো আলভারেজকে পাস দেন। ক্যারিয়ারে মেসির এমন শ্বাসরুদ্ধকর ড্রিবলিং অনেকবারই দেখা গেছে। ২০১৫ সালে অ্যাথলেটিকো বিলবাওয়ের বিপক্ষে মধ্যমাঠ থেকে তিন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে গোলের কীর্তিটা এখন বিরাজমান। সেই গোলটিকে বলা হতো গাণিতিক ভাবে অসম্ভব গোল। নানা যুক্তি, বিতর্ক ও গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বিশ্লেষকরা বুঝিয়েছিলেন এই গোল করা যে কারও পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু মেসির পক্ষে কোনো কিছুই কি অসম্ভব?
একটুও না। মেসি মাঠের ডানপ্রান্ত দিয়ে এমনই সেরা ছন্দে থাকেন। বার্সেলোনায় জীবনের সেরা সময়গুলোতে ডানপ্রান্ত থেকে বল নিয়ে বাম দিকে এগোতেন। বিপক্ষের ডি বক্সে তার ওই দৌড় মানেই ছিল গোল। লাইনে দাঁড়ানো ডিফেন্ডাররা একে একে পা বাড়াতেন আর মেসির ড্রিবলে পরাস্ত হতেন। দুই-তিন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে গোলরক্ষকও পরাস্ত হতেন। এমন চোখধাঁধানো শটে মেসির গোল একটা সময় ছিল নিয়মিত ব্যাপার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মেসিকে এই কৌশলে গোল করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয় বিপক্ষ দলগুলো। তাই গত দুই বছরে মেসি নিজেকে ভিন্নভাবে তৈরি করেছেন। এখন প্রায় রক্ষণে নেমে বল তুলে আনার কাজও করেন। শরীরের সঙ্গে বয়স সঙ্গ না দিলেও মেসি জাদুকরের পক্ষে ‘জাদু’ দেখানো তো আর বন্ধ হতে পারে না। মেসিকে নিয়ে সাবেক ইংলিশ ফুটবলার গ্যারি লিনেকার যথার্থই বলেছেন, ‘এখনো কি বিতর্কটা আছে? আমি সর্বকালের সেরার (ফুটবলার) কথা জিজ্ঞেস করছি।’
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে যে অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি, ঠিক একই রকম অ্যাসিস্ট ছিল রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এল ক্লাসিকোতে। সামনে দাঁড়ানো রোনালদো মেসির ড্রিবল শেষে সেই পাসে বোকা বনে যান। এই বিশ্বকাপে আপন আলোয় নতুন করে উদ্ভাসিত মেসি নকআউটে অ্যাসিস্টের হিসাবে ছাড়িয়ে গেছেন পেলেকে। ৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে পাশে বসেছেন ম্যারাডোনার। কিংবদন্তিদের পেছনে ফেলে নিজেকে এই তালিকায় সবার ওপরে নেওয়ার লড়াইয়ে আছেন সময়ের সেরা গ্রেট।
শুধু অ্যাসিস্টে কেন, মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথম গোলটি। ওই ম্যাচে ডি বক্সের একটু বাইরে মাঠের ডান পাশ থেকে ডি পলের পাস রিসিভ করেন মেসি। পোস্টের সরাসরি দাঁড়ানো অবস্থাতেই ৩৫ গজ দূর থেকে বাম পায়ের শট নেন। তার মায়া জড়ানো শট কেমন যেন, ওচোয়া যতই লম্বা হয়ে বাঁ পাশে ঝাঁপিয়ে পড়েন বল ততই বামে চলে যায়। এমন মায়াজাল ছড়ানো শটে কতবার বিপক্ষ গোলরক্ষককে বোকা বানিয়েছেন মেসি। ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে তার পানেনকা স্টাইলের ফ্রি কিকও ‘মায়াজাল’ শটের প্রমাণ রাখে। অথবা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ‘পয়েন্ট অব নো ভিউ’ থেকে গোল। ওই ম্যাচে ডান প্রান্তে ডি বক্সের বাইরে থেকে মধ্যমাঠে থাকা ম্যাক অ্যালিস্টারকে পাস দেন মেসি। ফিরতি পাসে অ্যালিস্টার বল দেন ডি বক্সের ভেতরে থাকা ওতামেন্দিকে। ততক্ষণে মেসি চলে আসেন বক্সের ভেতর। আলতো টোকায় মেসির বাঁ পায়ের সামনে বল দিয়ে দেন ওতামেন্দি। মেসির মাটি কামড়ানো শট অস্ট্রেলিয়ার এক ডিফেন্ডারের জন্য ঠিকঠাক দেখতে পারেননি গোলকিপার। ক্যারিয়ারে এই রকম গোলও মেসির পা থেকে অসংখ্যবার দেখা গেছে। এছাড়া সৌদি আরব ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পেনাল্টি আরও দুই গোল করেন।
আর্জেন্টিনা সত্যিকারের ১৯৮৬’র সুবাস পাচ্ছে। সেই সৌরভ ফিরিয়ে এনেছেন মেসি। নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে উজ্জীবিত করেছেন। প্রতি ম্যাচে দলের প্রাণভোমরা হয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচ জেতাচ্ছেন। জাদুকর মেসির জাদুখেলা চলুক আর একটি ম্যাচে। ওই জয় মেসিদের নিয়ে যাবে অমরত্বের কাছে। আর্জেন্টিনাকে এনে দেবে তৃতীয় বিশ্বকাপের স্বাদ।