সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বেকারি পণ্য, শিক্ষার উপকরণসহ অন্যান্য পণ্যের দামের মতো শিশুদের খেলনার দামও বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আমদানি করা খেলনার দাম ৬০-৭০ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য সে তুলনায় দেশীয় খেলনার দাম খুব কমই বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ডলারের তুলনায় টাকার মান কমায় এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে সমস্যা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ কমায় বিদেশি খেলনার দাম বেড়ে গেছে। অন্যদিকে বিদেশি কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশে তৈরি খেলনার দামও বেড়ে গেছে একই কারণে।
পুরান ঢাকার চকবাজারে গড়ে উঠেছে শিশু খেলনার কয়েকশ পাইকারি দোকান। সেখানকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে শিশু খেলনার বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে এর বাজার প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার।
তারা বলেন, একদিকে ডলার পরিস্থিতি, অন্যদিকে খেলনা উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিকের দাম বেশির অজুহাতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকরা তাদের ইচ্ছেমতো খেলনার দাম বাড়াচ্ছেন। এর মধ্যে বাজারে যেসব খেলনার চাহিদা বেশি সেগুলোর দাম আকাশছোঁয়া।
সরেজমিনে চকবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ২০টি এক পাতা রাবার বল বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা, যা ৬ মাস আগেও ছিল ১২০ টাকা, ৩৫০ টাকার প্রতিসেট রিমোর্ট কন্ট্রোল গাড়ি বিক্রি হচ্ছে ৪৯০ টাকা, ১০০ টাকার পানি হাঁস এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা, ২৪০ টাকার জেনারেল জিপ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, ২৫ টাকার লাইট খরগোশ এখন ৪০ টাকা, ৩২ টাকার লাইট গাম-বল এখন ৬০ টাকা, ২৮ টাকার পানিবল এখন ৫৮ টাকা ও ২৬ টাকার বাঁশি বল বিক্রি হচ্ছে ৪৯ টাকা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চকবাজারের একজন খেলনা ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুটি প্রতিষ্ঠানের দখলে এখন খেলনার বাজার। সাগর নামের আরেক খেলনা ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাটারিচালিতসহ কিছু কিছু খেলনার মাদারবোর্ড গুরুত্বপূর্ণ। এটি চীন থেকে আসে। এ ছাড়াও স্প্রিং ব্যবহৃত খেলনাগুলোও চীন থেকে আসে। যেহেতু অধিকাংশ যন্ত্রাংশ চীন থেকে আমদানি করতে হয়, তাই খরচ বেড়ে গেছে। কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার মান কম হওয়ায় আমদানি করতে বেশি খরচ পড়ায় বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন উৎপাদক ও আমদানিকারকরা। যে কারণে তাদেরও বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
জোন প্লাস্টিক স্টোরের স্বত্বাধিকারী মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব খেলনার চাহিদা কম সেসব খেলনার দাম বাড়েনি। তবে তাও মাত্র কয়েকটি। এর বাইরে বাচ্চাদের যত খেলনা আছে সব খেলনার দাম দ্বিগুণ হয়েছে। সাভার থেকে খেলনা কিনতে আসা বেলায়েত দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাতে গোনা কয়েকটি খেলনার দাম বাড়েনি। এর বাইরে অধিকাংশ খেলনার দামই বেড়েছে। একটি সাধারণ ব্যাটারিচালিত গাড়ি পাইকারি বাজার থেকে কিনে অন্যান্য খরচ যোগ করলে দাম পড়ে যায় ১৬০ টাকার বেশি। তাদের বিক্রি করতে হয় ১৭০-১৮০ টাকা করে। একই খেলনা পাঁচ-ছয় মাস আগেও ১০০ টাকায় বিক্রি করে ১০-১৫ টাকা লাভ করা যেত।
খেলনা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আমান প্লাস্টিকের মহাব্যবস্থাপক তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি আরব, ওমান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে আমাদের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ একমাত্র চীন থেকে আমদানি করে থাকি। সব মিলিয়ে ১৫-২০ হাজার ডলারের বেশি এলসি করা যাচ্ছে না। কয়েক মাস ধরে এভাবে চলছে।’
তিনি বলেন, দেশে উৎপাদিত খেলনার দাম পাঁচ-ছয় শতাংশ বেড়েছে। বাকি যেগুলোর দাম বেড়েছে সেগুলো আমদানি করা। সেগুলোর ক্ষেত্রে ৬০-৭০ শতাংশ দাম বেড়েছে।
জিয়ান গ্রুপের বিপণন বিভাগের প্রধান নাহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম অনেক বেড়েছে। যে কারণে আমদানি করতে আমাদের অনেক খরচ হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে আমদানি শুল্ক বেড়েছে। সব খরচ মিলিয়ে একটি খেলনায় খরচ বেড়েছে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
তিনি আরও বলেন, গত কিছুদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় পণ্য উৎপাদনের জন্য তারা পুরোপুরি জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তার একটি বাড়তি খরচ, পাশাপাশি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ মনিহারি বণিক সমিতির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশুদের খেলনা উৎপাদনে যে কাঁচামালের দরকার হয় তা দেশে উৎপাদন করা গেলে বাংলাদেশে উৎপাদিত খেলনা সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব।