ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান করেছেন অভিষিক্ত জাকির হাসান। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান জাকির টেস্ট ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসেই করেছেন ঠিক ১০০ রান, এরপর আউট হয়েছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে। টেস্ট অভিষেকে শতরান করা চতুর্থ বাংলাদেশি ক্রিকেটার জাকির, তার আগে অভিষেকে শতরান আছে আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ আশরাফুল ও আবুল হাসানের।
জিততে হলে করতে হবে ৫১৩ রান, এই অবস্থায় বিনা উইকেটে ৪২ রানে যখন তৃতীয় দিন শেষ করে বাংলাদেশ তখন অনেকেই ভেবেছিলেন চতুর্থ দিনেই শেষ হয়ে যাবে চট্টগ্রাম টেস্ট। শেষ দিনটায় বিশ্রাম আর রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। কিন্তু সব পূর্বাভাস বদলে দিলেন জাকির হাসান।
সিলেটের এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান মূলত ব্যাটিং করেন মিডল অর্ডারে। সফরে আসা ভারত ‘এ’ দলের বিপক্ষে কক্সবাজারে চারদিনের ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭৩ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচটি ড্র করেছিলেন জাকির। সেই ম্যাচেও সুযোগ পাওয়া তৌহিদ হৃদয়ের চোটে। অমন ইনিংস আর তামিম ইকবালের কুঁচকির চোট জাতীয় দলের দুয়ার খুলে দেয় জাকিরের জন্য। প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ২০ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে ১০০ রান করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। অশ্বিনের বলে ব্যাট-প্যাড ক্যাচটা ধরেছেন বিরাট কোহলি। আম্পায়ার সংকেত দেওয়ার আগেই হাঁটা শুরু করে জাকির সম্মান জানালেন ক্রিকেটের চেতনাকেই।
চতুর্থ দিনের সকালে মাত্র ১২ ওভার পুরনো হওয়া বলটা হাতে নিয়ে উমেশ যাদব আর মোহাম্মদ সিরাজ মিলে লাঞ্চের আগেই বাংলাদেশের হার নিশ্চিত করবেন, এমনটাই হতে পারত কাল। যেমনটা ঘটে বেশিরভাগ সময়ে, শুধু প্রতিপক্ষের বোলারদের নামগুলো বদলায়। হতে দিলেন না জাকির, সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তও। কেন তাকে দলে নেওয়া হয়, এই নিয়ে অনেক সমালোচনা শুনতে হয় নির্বাচকদের। অন্তত চট্টগ্রামের এই ইনিংসের পর কিছুদিন কথাটা তাদের শুনতে হবে না। এই নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে উদ্বোধনী জুটিতে শতরানের দেখা পেল বাংলাদেশ, আর ভারতের বিপক্ষে এটাই উদ্বোধনী জুটিতে সর্বোচ্চ রান এবং একমাত্র শতরানের জুটি। শান্ত এবং জাকির প্রথম সেশনে কোনো উইকেট যেতে দেননি, লাঞ্চে বাংলাদেশ বিনা উইকেটে ১১৯।
কোহলি-পান্থ যৌথ প্রচেষ্টায় শান্তর ক্যাচ ধরলে প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। লম্বা সময় শান্তকে সেøজিং করে গেছেন সিরাজ, সেই সুফলটাই হয়তো পেলেন উমেশ যাদব। অফস্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে আউট হয়েছেন ৬৭ রান করা শান্ত। ওয়ান ডাউনে ইয়াসির আলি ৫ রানেই বোল্ড অক্ষর প্যাটেলের বলে, লিটনও সহজ ক্যাচ দিয়েছেন উমেশ যাদবের হাতে। জাকির দেখছেন অন্যপ্রান্তে সঙ্গী বদল হচ্ছে নিয়মিত, তবুও ধৈর্যটা ধরে রেখেছেন। তবে অক্ষর প্যাটেলকে চার মেরে শতরানে পৌঁছানোর পর জাকিরের হয়তো খানিকটা নড়ে গিয়েছিল মনোসংযোগ, তাতেই অশ্বিনের বলটা ব্যাট-প্যাড হয়ে কোহলির হাতে।
উদ্বোধনী জুটি যতটা আশা জাগিয়েছে, মাঝের ব্যাটসম্যানরা ততটাই হতাশ করেছেন। শুরুর পর আর জুটি হয়নি। মাঝের ৭, ৪২, ৩৫, আর ২৬ রানের জুটিগুলো আরেকটু বড় হলেই শেষ দিনে অন্তত ড্র করার স্বপ্ন দেখতে পারত বাংলাদেশ। জাকিরের বিদায়ের পর সাকিব আল হাসান এসে ওয়ানডে স্টাইলে খেলে ৬৯ বলে ৪০ রানে অপরাজিত। মেহেদি হাসান মিরাজ ৪০ বলে অপরাজিত ৯ রানে। বাংলাদেশের রান ৬ উইকেটে ২৭২, জয়ের জন্য চাই আরও ২৪১ রান।
অভিষেকে সেঞ্চুরি করা জাকিরের ক্যাচটা ধরেছেন বিরাট কোহলি, সবার আগে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানিয়েছেন ভারতের এই ব্যাটিং তারকাও। জাকির প্রশংসা পেয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়েরও, জানালেন ম্যাচের পর, ‘উনি (কোহলি) ছুটে এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আমি ধন্যবাদ দিয়েছি। স্যার (রাহুল দ্রাবিড়) বলেছেন যে খুব ভালো ব্যাটিং করেছি। অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমন গ্রেট একজন প্লেয়ার (দ্রাবিড়) আর গ্রেট একজন কোচ এসে যদি অনুপ্রাণিত করেন অবশ্যই খুব ভালো লাগে।’
অভিষেকে শতরান করা আমিনুল ইসলাম আগে থেকেই দেশের ক্রিকেট অঙ্গনের অন্যতম কৃতী ব্যাটসম্যান, অভিষেক টেস্টে শতরান তাকে দিয়েছে বিরল সম্মান। আশরাফুল নিজেকে জানান দিয়েছেন অভিষেক সেঞ্চুরিতে, ১০ নম্বরে নেমে ব্যাট করা আবুল হাসানের সেঞ্চুরিটা অনেকটাই প্রকৃতির খেয়াল আর ভাগ্যের খেলা। জাকিরের সুযোগটা নিঃসন্দেহে ভাগ্য গড়ে দিয়েছে, তবে শতরানটা পরিশ্রমের ফসল। অভিষেকেই শতরানে প্রত্যাশার মাত্রাটা যেমন বেড়ে যাবে, তেমনি পরের দিকের পরীক্ষাগুলোও হয়ে উঠবে কঠিন। জাকির কোন পথে যাবেন, সেটা আসলে তাকেই গড়ে নিতে হবে।