সম্প্রতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি এক বিতর্কিত মন্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘গুজরাটের কসাই’ বলে কটাক্ষ করেন। এরপর থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিলাওয়ালের বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন প্রতিবাদে। এরই মাঝে মনুপাল বনসল নামে উত্তরপ্রদেশের এক বিজেপি নেতা বিলাওয়াল ভুট্টোর মাথার ‘দাম’ ঘোষণা করেছেন।
মনুপাল বনসল উত্তরপ্রদেশের বিজেপির এক তাবড় নেতা। বিজেপির কিষাণ মোর্চার এই নেতা ঘোষণা করেছেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টোর ‘মাথার দাম’। এই মূল্যের ২ কোটি টাকা তিনি দেবেন বলেও সোচ্চার ঘোষণা প্রতিবাদের মঞ্চ থেকে দিয়েছেন।
মনুপাল বনসল বলেন, ‘আমি নিজের ক্ষমতায় এই পুরস্কার ঘোষণা করছি’। সেই সঙ্গেই তিনি ২ কোটি টাকার পুরস্কার মূল্য ঘোষণা করেন বিলাওয়ালের মাথার দাম হিসাবে। মানুপাল বলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি যে, যিনি বিলাওয়াল ভুট্টোর মাথা থেকে শরীর আলাদা করে দেবেন, তাকে আমি ২ কোটি টাকা দেব।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে এই বিতর্কিত মন্তব্যের পর মনুপাল বনসল সাংবাদিকদের সম্মুখে বলেন, ‘হ্যাঁ আমি একথা বলেছি। ২ কোটি টাকার পুরস্কার আমি দেব। যে প্রধানমন্ত্রীকে আমরা এত শ্রদ্ধা করি, সেই প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে যদি ওরা (পাকিস্তান) এমন কথা বলতে পারে, তাহলে সেই ব্যক্তিকেও আমরা সহ্য করব না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের খুবই আন্তরিকতা রয়েছে। আর আমরা এটা মেন নেবনা। তার জন্য কিছু করতে হলে আমাদের কোনও অসুবিধা নেই।’
ওদিকে, ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেত্রী তথা পাকিস্তানের মন্ত্রী শাজিয়া মারি ভারতকে পরমাণু যুদ্ধের হুমকিও দিয়ে বসেছেন। শাজিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারতের ভুলে গেলে চলবে না যে পাকিস্তানের কাছেও পরমাণু বোমা আছে। আমাদের পারমাণবিক স্টেটাস চুপ করে বসে থাকার জন্য নয়। প্রয়োজনে আমরা পিছপা হব না। বারবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকলে, পাকিস্তান চুপ করে শুনবে না, এমনটা হবে না।’
তবে পরে চাপে পড়ে সেই বক্তব্য পরে ঘুরিয়ে দিয়েছেন শাজিয়া মারি। সাম্প্রতিক টুইটে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর দায়িত্বশীল রাষ্ট্র।’
শাজিয়া টুইটে লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের মন্ত্রীর প্ররোচনামূলক মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন মাত্র। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তানকে ভারতের চেয়েও অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।’ পাশাপাশি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের উপর ঘটনার দায় চাপিয়ে তার সংযোজন, ‘পাকিস্তান একটি দায়িত্বশীল পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র।’
গত সপ্তাহের শেষদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে পাকিস্তানকে বিন লাদেন নিয়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। এর জবাবে ভুট্টো বলেন, ‘লাদেন তো মারা গিয়েছে, তবে গুজরাটের কসাই এখনও বেচে আছে। এবং তিনি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।’
বহুপাক্ষিক সংগঠন নিয়ে আলোচনা চলাকালীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে বলতে শুরু করেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল জারদারি ভু্ট্টো। এর জবাবে বিলাওয়লকে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানান জয়শংকর। বিলাওয়াল বলেন, ‘বহুপাক্ষিকতার সাফল্য দেখতে হলে কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘের রেজোলিউশন বাস্তবায়ন করুন। আপনার (ভারত) সভাপতিত্বে এই অঞ্চলে শান্তি স্থাপন করুন।’
বিলাওয়ালের ওই মন্তব্যের পরই বিন লাদেন ইস্যু তোলেন জয়শংকর। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন যে পাকিস্তানই বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। পাশাপাশি ২০০১ সালের সংসদ হামলার ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে অভিযোগ করেন, পাকিস্তান লস্কর এবং জইশ জঙ্গিদের জন্য স্বর্গ।
জয়শংকর বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গোটা বিশ্ব যখন আরও সম্মিলিত ভাবে কাজ করছে এবং একত্রিত হচ্ছে, তখন অপরাধীদের সুরক্ষা দিতে বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার করা হচ্ছে।’ এই অপমান হজম না করতে পেরে মোদীকে আক্রমণ শানান পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর জবাবে ভুট্টোর কড়া সমালোচনা করে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে ভুট্টো এবং পাকিস্তানের সমালোচনা করে বলা হয়, ‘সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে নিম্নরুচির আক্রমণ করেছে পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে আজকের দিনে (১৬ ডিসেম্বর) কী হয়েছিল, সেই কথা সম্ভবত ভুলে গিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশের মাটিতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল পাক সেনারা। তারপর এতদিন কেটে গেলেও সংখ্যালঘুদের প্রতি পাকিস্তানের মনোভাবে কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। এমন পাকিস্তান কোনও ভাবেই ভারতের দিকে আঙুল তুলতে পারে না।’
ভারতের মন্ত্রণালয়ের তরফে আরও বলা হয়, ‘মুম্বাই, পুলওয়ামা, নিউইয়র্ক, লন্ডন, পাঠানকোটের মতো শহর পাক সরকারের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের সাক্ষী থেকেছে। এই হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানের বিশেষ সন্ত্রাসবাদ জোন থেকে। সেখান থেকে সন্ত্রাসবাদের রফতানি করা হচ্ছে বিশ্ব জুড়ে। এই দেশই জাতিসংঘের তালিকায় থাকা ১২৬ জন জঙ্গি এবং ২৭টি জঙ্গি সংগঠনের আশ্রয়দাতা।’
ওদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন করে তিক্ততা সৃষ্টি হওয়ায় উদ্বেগে রয়েছে ভারতের কুটনৈতিক মহল। ভুট্টোর ওই মন্তব্য হঠাৎ করে করা নয় বলেই ধারণা সাউথ ব্লকের। এর প্রেক্ষাপট এবং সম্পর্কের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ ও আলোচনা। শীতকালে সীমান্ত অনুপ্রবেশের ঘটনা এমনতিই কমে আসে। তবুও সীমান্তে সজাগ রাখা হয়েছে প্রহরা। চীনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার বিভিন্ন সেক্টরে যখন টানটান উত্তেজনা এবং সংঘাত চলছে ভারতের, তখন ইসলামাবাদের সঙ্গে ফের সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে রক্তচাপ বাড়াচ্ছে সাউথ ব্লকের। সব মিলিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।