কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন না হলেও গোল্ডেন বুটটি গেছে ফ্রান্সের ঘরে। আর গোল্ডেন বল চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। অন্যদিকে, বাংলাদেশে অরাজনৈতিক পরিচয়ের হেফাজতে ইসলাম রাজনীতির মাঠে ঘুরছে ‘গোল্ডেন বুট’ নিয়ে। রাজনীতির ভোটের মাঠে সবদিকে বিচরণ তাদের। কদর-সমাদরও মিলছে। দৃশ্যত হেফাজত সরকারের কব্জায়। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে ভেতরে-ভেতরে তাদের সংযোগ আরও নানান দিকে। সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ায় সাড়ে আট বছর পর রাজধানীতে শোডাউন করেছে হেফাজত। রাজকীয় হালে ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলন করেছে মহানগর নাট্যমঞ্চে। ১৭ ডিসেম্বর শনিবার শীতের সকালে শুরু হওয়া সম্মেলনে সারা দেশ থেকে জড়ো করা হয় তাদের নেতাকর্মীদের। হেফাজতের ভাষায় তারা দেশের শীর্ষ আলেম, ওলামা, মাশায়েখ। সম্মেলন থেকে বিকেলে হেফাজত নেতারা চলে যান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে। কারাবন্দি নেতাদের মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি আছে তাদের। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের খবরটি গণমাধ্যম জেনেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাতে। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হেফাজত নেতাদের কথা দিয়েছেন তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেবেন বলে। হেফাজতের দাবির যুক্তি-অযুক্তি বরাবরই আপেক্ষিক। যাহা যৌক্তিক, তাহাই অযৌক্তিক। পক্ষে বা অনুকূলে থাকলে তারা ইসলামের ‘প্রকৃত সেবক’। তাদের দাবিও যৌক্তিক। আর বিপক্ষে অবস্থান নিলে তারা জঙ্গি, স্বাধীনতার দুশমন, তেঁতুল হুজুর ইত্যাদি। তখন তাদের দাবিও অযৌক্তিক। অন্তত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী মতের বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে হেফাজতের মানদণ্ড এ রকমই।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থি আরেক শক্তি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের এখন দৃশ্যত দুর্দিন। তারা নিজেদের অরাজনৈতিক দাবি করে না। পরিচয় দেয় ‘আল্লাহর আইন কায়েমকারী’ দল হিসেবে। আল্লাহর আইন কায়েমের লক্ষ্যে তারা ‘সৎ লোকের শাসন’ চাই সেøাগান দেয়। যদিও হালে সেøাগান তোলার শক্তিই নেই। রাজনীতিতে নিষিদ্ধ না হলেও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নেই তাদের। ‘ফিটনেস সনদ’ না থাকলেও এক ধরনের ‘রুট পারমিট’ নিয়ে রাজনীতির মাঠে চলাচলকারী এ দলটির পায়েও বল আছে। তিন-চারটি উইংয়ে খেলছে জামায়াত। বিএনপির সঙ্গে নেই, আবার আছেও। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পেতে সরকারি মহলের সঙ্গে দেন-দরবার করছে। নিজ নামে সামনে না থেকে ‘আমার বাংলাদেশ’‘এবি’ পার্টি এবং ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ ‘বিডিপি’ নতুন দুটি নামে নিবন্ধনের আবেদনও করে রেখেছে কমিশনে।
এর মধ্যেই নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়াকে জামায়াত সংগঠিত করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ডিএমপি কমিশনারের খন্দকার গোলাম ফারুকের দাবি, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়াকে শুধু সংগঠিত নয়, অর্থায়নও করছে তারা। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জামায়াতের আমির ডা. শফিকের ছেলে ডা. রাফাত নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ায় যোগ দিয়েছেন। বাবা জেনেশুনে বিষয়টি সমর্থন ও তাকে অর্থায়ন করেন। তাই বাপ-ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই অভিযোগ ও ঘটনার সত্যতা এখনো অজানা। তা অনেকটা একতরফাও। পুলিশের দাবির জবাবে জামায়াত বা এর কোনো নেতার বক্তব্য নেই। আমির-সেক্রেটারি জেনারেলসহ শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার বা পলাতক। এ দৌড়ের ওপর থেকে জবাব দেওয়ার অবস্থাও নেই তাদের। জামায়াতের এমন দুর্গতির বিপরীতে হেফাজত বেশ নির্ভয়ে। শনিবার সপ্তাহের প্রথম দিনে আলিশান সম্মেলন শেষে আসরের নামাজের পর তারা ১১ জন চলে যান গণভবনে। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। বৈঠককে ৭ দফা দাবি নিয়ে অত্যন্ত ‘ফলপ্রসূ’ উল্লেখ করে হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদরীদ নদভী জানান, প্রধানমন্ত্রী তাদের দাবিগুলো খুব আমল দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই নোট নিয়েছেন। নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেছেন। কয়েকটি দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখভালের বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন। কয়েকটি বিষয়ে দেখতে বলেছেন বৈঠকে উপস্থিত থাকা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকে।
মাওলানা নদভীর দেওয়া এসব তথ্য ঠিক থাকলে হেফাজতের আর পেছনে তাকানোর দরকার হবে না। সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীও জানিয়েছেন, ‘শাহ আহমদ শফী ঘোষিত হেফাজতের ১৩ দফা আন্দোলনে ক্ষমতাকেন্দ্রিক কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। তাই দেশের প্রতিটি মুসলমানই হেফাজতের নেতাকর্মী বা সমর্থক।’ এখানে হেফাজতের নতুন ৭ দফা উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশ্লেষণে দেখা যায়, হেফাজতের সাবেক আমির শাহ আহমদ শফী ঘোষিত ১৩ দফার একটি সংক্ষিপ্ত রূপই বর্তমান ৭ দফা। কথা কমিয়ে ১৩ থেকে ৭-এ আনা হয়েছে। যেমন : ১. অবিলম্বে হেফাজত নেতাকর্মী ও আলেম-ওলামাদের মুক্তি দিতে হবে। ২. নেতাকর্মীদের নামে সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. ইসলাম ও মহানবীকে (সা.) কটূক্তিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে সংসদে আইন পাস করতে হবে। ৪. কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। ৬. শিক্ষা কারিকুলামে ধর্মীয় শিক্ষার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৬. জাতীয় শিক্ষা কমিশনে হাইয়াতুল উলিয়ার প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৭. বিশ্ব ইজতেমায় বিতর্কিত মাওলানা সা’দকে আসার অনুমতি দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়ার আগে দাবিগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে হেফাজত নেতারা নাট্যমঞ্চের ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলন কাঁপিয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে আট বছর পর রাজধানীতে এমন সম্মেলনে হেফাজতের অন্যতম নেতা মাওলানা মামুনুল হকসহ নেতাকর্মীদের দ্রুত মুক্তি দাবি করা হয়। সামনে বিশাল আয়োজনে আরও কয়েকটি সম্মেলন করার ঘোষণাও দেওয়া হয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জেলা-উপজেলা কমিটি গঠন করা হবে খুব ঘটা করে। স্থানীয় জনগণকে চমকিত করে দিতে এ উপলক্ষে জমায়েতগুলো হবে বিশাল। বিভাগীয় শহরে হবে ‘শানে রেসালত’ সম্মেলন। এরপর রাজধানীতে ‘জাতীয় শানে রেসালাত’। সব মিলিয়ে সামনে অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য-ধারণাতীত সুদিন দেখছেন হেফাজত নেতারা। অন্যদিকে, একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতার আশীর্বাদ ও পারিপার্শ্বিকতায় এমন সুদিনে আসীন জামায়াতই এখন খাবি খাচ্ছে দুর্দিনে। অবশ্য দুর্দিন মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে দলটির। নিষিদ্ধ হয়ে আবার ফাঁকফোকরে সিদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে জামায়াতের। এ চর্চা তারা পাকিস্তান আমলেও করেছে।
সাম্প্রতিককালে এরশাদের পতনের পর সবদিকে বোলিং-ব্যাটিং শেষে বিএনপির সঙ্গে নেপথ্য বোঝাপড়ায় একানব্বইয়ের সংসদ নির্বাচনে ১৮ আসনে জিতে অবস্থান পোক্ত করে জামায়াত। নিজেদের রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর জন্য দোয়া চাইতে দুই দল ও দুই নেত্রীই সশরীরে ছুটে যান গোলাম আযমের কাছে। বোঝাপড়ায় সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন জুগিয়ে দুটি সংরক্ষিত আসন নেয়। বছর কয়েকের মাথাতেই চলে যায় বিএনপির বিরুদ্ধে। কেয়ারটেকার সরকার ফর্মুলা নিয়ে আন্দোলনের মাঠ গরম করে। আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির সঙ্গে মিলে বিএনপির বিরুদ্ধে ত্রিদলীয় লিয়াজোঁ কমিটিভুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শরিকানা নেয় জামায়াত। তবে, নির্বাচনের মাঠে একা একা সাফল্য পায়নি। ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনে সংসদে আসন নেমে আসে মাত্র ৩টিতে। এরপর আওয়ামী লীগবিরোধী হয়ে আবার মিত্রতা বিএনপির সঙ্গে। ২০০১ সালে একেবারে ঘোমটা খুলে বিএনপির জোটসঙ্গী। ১৭ আসনে জিতে দুই মন্ত্রিত্ব নিয়ে সরাসরি আসীন হয় রাষ্ট্রক্ষমতায়। জামায়াতের রাজনীতিতে অবিশ্বাস্য ধস নামে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসার পর থেকে। তাদের ভাবনাতেই আসেনি আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার করবে বা করতে পারবে বলে। অল্পতেই এদের ভাবনায় ছেদ পড়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে দেশ-বিদেশে তারা গলদঘর্ম চেষ্টা চালায় বিচারটি রোধ করতে। কিন্তু চেষ্টায় সাফল্য হাসিল হয়নি। মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড, মাওলানা সাঈদীর যাবজ্জীবন, সাবেক আমির গোলাম আযমের ৯০ বছর কারাদণ্ড জামায়াতের ওপর সিডর বইয়ে দেয়। এর মধ্যেই ইসিতে দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু দলটি এখনো নিষিদ্ধ হয়নি।
একেক সময় একেক ভূমিকা তাদের উত্তরাধিকারের বৈশিষ্ট্যের মতো। পাকিস্তানপন্থি এই দল একসময় ভারতের মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে। আবার ছেচল্লিশের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরোধিতা করেছে। বাষট্টিতে আইয়ুব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের বিরোধিতাও করেছে। দুবছর পর চৌষট্টির ৪ জানুয়ারি জামায়াতের রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। গ্রেপ্তার করা হয় মওদুদীসহ জামায়াতের ৬০ নেতাকে। এর মধ্যে ছিলেন গোলাম আযমসহ পূর্ব পাকিস্তানের ১৩ জন জামায়াত নেতাও। ওই বছর অক্টোবরেই আবার নিষেধাজ্ঞাটি ওঠে যায়। ওই জামায়াতই আইয়ুব খানের সামরিক আইন ঘোষণার সময় পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেয়। পঁয়ষট্টিতে সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জোটেও যায়। উল্লেখ্য, ছাত্রশিবিরও একটি বদলানো নাম। একাত্তরে জামায়াতের মূলশক্তি ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। সাতাত্তরের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মীর কাসেম আলীকে সভাপতি ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠন হয় ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির’। শুধু ‘সংঘ’ বাদ দিয়ে ‘শিবির’ যুক্ত করে পতাকা, মনোগ্রাম, প্রশিক্ষণব্যবস্থাসহ সাবেক কাঠামোই বহাল থাকে।
তেমনি এখন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নতুন কোনো নামে উদয় হলেও তারা বলে বুট চালাবে আগের মতোই।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন
mostofa71@gmail.com