আজ থেকে তিন বছর আগে আখভিত্তিক ৬টি চিনিকল বন্ধ ঘোষণার সময় আমরা বলেছিলাম এটি জাতির জন্য হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর ফলে সয়াবিন তেলের মতো চিনির দাম একশ’ টাকা অতিক্রম করবে। আখের আবাদ হ্রাস পাবে। কৃষি শ্রমিকের কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। গুড়ের দাম বেড়ে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুষ্টি, পরিবেশ ও চিনিকল এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে। সেই সঙ্গে চিনির বাজারে পরিশোধন কারখানাগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের ফলে ভোক্তা ও আখচাষিরা পড়বে মহাবিপদে। আমরা সরকারকে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত পরিহারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কে শুনে কার কথা? আর গরিবের কথা বাসি হলেই ফলে। চিনি ও গুড়ের ক্ষেত্রে আমাদের আশঙ্কা শতভাগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিকেজি গুড় ১২০ টাকা, চিনি ১১০ টাকা এবং খেজুর নামের তথাকথিত ভেজাল ও চিনি মিশ্রিত গুড় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২২০ টাকায়।
শিল্প মন্ত্রলয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশেনের উদ্যোগে নাটোর জেলার লালপুরে অবস্থিত ‘নর্থ বেঙ্গল’ সুগার মিলের ডোঙ্গায় সম্প্রতি (২৫.১২.২২) আখ নিক্ষেপ করে ২০২২-২৩ আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প বলতে চিনিশিল্পকেই বুঝায়। আজ থেকে তিন বছর আগেও দেশে ১৫টি আখভিত্তিক চিনিকল ছিল। চিনিকলগুলোতে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ টন চিনি উৎপাদিত হতো। দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা ১৮ থেকে ২০ লাখ টন। মোট চাহিদার ৮ থেকে ১০ ভাগ চিনি দেশের সরকারি চিনিকলগুলোতে উৎপাদিত হলেও, চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে এবং ভোক্তাকে সুলভমূল্যে গুণগত মানের চিনি সরবরাহে চিনিকলগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজ থেকে মাত্র এক বছর আগেও প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এর আগে যখন দেশে ১৫টি চিনিকল চালু ছিল, তখন প্রতিকেজি চিনির দাম ছিল ৬০ টাকা। দেশে র-সুগার থেকে পরিশোধিত চিনি তৈরির কারখানা স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দেশীয় চিনি কলগুলোর সঙ্গে এক আত্মঘাতী অসম প্রতিযোগিতা। সরকার চিনির দাম ৬০ টাকা নির্ধারণ করলে পরিশোধন কারখানার মালিকরা বিক্রি করে ৫৮ টাকা কেজি দরে। এমনকি বিক্রীত চিনি নিজ পরিবহনে ব্যবসায়ীদের গুদামে পৌঁছে দেয়। আবার সরকার চিনির দাম ৫৮ টাকা নির্ধারণ করলে তারা ৫৬ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি করে। এসব কারণে সরকারি চিনিকলের চিনি অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকে। কৃষকের আখের মূল্য, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, কারখানার উৎপাদন উপকরণ কিনতে পারে না চিনিকলগুলো টাকার অভাবে। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ সময় মতো পরিশোধ করতে না পারায় সুদের বোঝা বাড়তে থাকে দিন দিন। আর সময় মতো আখচাষিদের পাওনা পরিশোধ না করায় আর টাকার অভাবে সার, কীটনাশক কিনতে না পারায় কমতে থাকে মিল জোন এলাকায় আখের চাষ। আখ উৎপাদন ও চিনিকলে আখ সরবরাহ। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অবৈধ পাওয়ার ক্রাশার মালিকরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে গুড় তৈরি করে। ফলে আখের অভাবে চিনিকলগুলো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না। লোকসানের বোঝা ভারী হতে থাকে। এভাবেই দেশের একমাত্র কৃষিভিত্তিক চিনিকলগুলোকে ঋণের রশির ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।
অন্যদিকে একদল অসৎ অতিলোভী পরিশোধন কারখানা মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চিনির বাজার এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের কাছে আখচাষিদের স্বার্থ নয়, ভোক্তার স্বার্থ নয়, শুধু মুনাফাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। , পরিশোধন কারখানায় উৎপাদিত চিনির ৫০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হবে। কিন্তু পরিশোধন কারখানা মালিকরা সে শর্ত পূরণ করেনি। তারা ছলে-বলে-কৌশলে র-সুগার থেকে উৎপাদিত চিনির সম্পূর্ণটাই দেশের বাজারে বিক্রি করে শর্ত ভঙ্গ করছে।
গত ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে আখ থেকে চিনি উৎপাদন হয়েছে ২৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার শতকরা ১.৩৬ শতাংশ। চলতি (২০২২-২৩) মাড়াই মৌসুমে ৯টি সরকারি চিনিকলে ৮ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে শতকরা ৬.৫০ শতাংশ আহরণ হারে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন, যা অর্জন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কুইন্টাল প্রতি আখের মূল্য ১০০ টাকা বৃদ্ধির ফলে মিলগেটে বর্তমানে প্রতি কুইন্টাল আখের সরকারি মূল্য ৪৫০ টাকা। অথচ পাওয়ার ক্রাশার মালিকরা প্রতি কুইন্টাল আখ কৃষকের মাঠ থেকে সরাসরি ক্রয় করছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। এ কারণে আখচাষিদের মধ্যে মিলের পরিবর্তে পাওয়ার ক্রাশার মালিকদের কাছে আখ বিক্রি ও ঋণ ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ফলে চিনিকলগুলো এ মাড়াই মৌসুমেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন করতে পারবে কি না, তা এ মুহূর্তে বলা যাবে না।
বাংলাদেশের চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. কাঁচামাল অর্থাৎ গুণগত মানের আখের অভাব। ২. উচ্চ ফলনশীল ও উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত আখের জাতের স্বল্পতা। ৩. অপরিপক্ব আখ মাড়াই। ৪. আগাম ও মুড়ির আখের স্বল্পতা। ৪. পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ। ৫.আখচাষি কর্র্তৃক মিলে অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন, ময়লা-আবর্জনা ও আগা-ডগাযুক্ত আখ মিলে সরবরাহ। ৬. মাটির সমানে কোদাল দিয়ে আখ কর্তন না করা। ৭. আখ কাটার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিলে আখ মাড়াই না করা। ৮. বাহির কেন্দ্রে আখের ওজনে কারচুপি। ৮. সময় মতো আখের মূল্য পরিশোধ না করা। ৯. পুরাতন, জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি। ৯. দক্ষ রসায়নবিদ ও প্যানম্যানের অভাব। ১০. অতিরিক্ত যান্ত্রিক ত্রুটি। ১১. চিটাগুড়, প্রেসমাড প্রভৃতি উপজাতের সঠিক ব্যবহার না হওয়া। ১২. পুঞ্জীভূত ঋণের সুদের বোঝা বহন। ১৪. পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগের অভাব। ১৫. উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে চিনি বিক্রি। ১৬. সাবজোন ও ইউনিট পর্যায়ে আখ উৎপাদন, সম্প্রসারণ কাজে যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ সম্প্রসারণকর্মী এবং মাঠ কর্মকর্তার অভাব। ১৭. সম্প্রসারণ কর্মকা-ে গুরুত্ব না দেওয়া ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না থাকা। ১৮. চিনি আহরণ হার কম হওয়া। ১৮. জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। ১৯. কম সূর্যালোক ঘণ্টা ২০. নিচু জলাবদ্ধ জমিতে আখ চাষ করা। ২১. দৈনিক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আখ ক্রয় এবং বাসি আখ মিলে সরবরাহ করা ইত্যাদি।
এই সব সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টি হয়েছে বহু বছরের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে। সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে বিদ্যমান চিনিকলগুলো এখনো টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এজন্য এখানে কিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হলো। ১. মিলজোন এলাকায় আগাম ও মুড়ি আখ চাষ বাড়াতে হবে। ২. একবার আগাম আখ চাষ করে কমপক্ষে দুইবার মুড়ি আখের চাষ করতে হবে। ৩. আখের সঙ্গে কমপক্ষে দুটি সাথি ফসলের চাষ করতে হবে। ৪. একরপ্রতি আখের ফলন বাড়াতে হবে এজন্য আগাম আখ রোপণ, পরিচ্ছন্ন বীজের ব্যবহার, সঠিক পরিচর্যা এবং সময়মতো পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন কার্যক্রম আরও জোরদার ও গতিশীল করতে হবে। ৫. আগা-ডগা, ময়লা-আবর্জনামুক্ত পরিপক্ব টাটকা আখ মিলে সরবরাহ করতে হবে। ৬. চিনি রিকভারি হার বাড়ানোর স্বার্থে আগে মুড়ি ও আগাম রোপণকৃত আখ মিলে সরবরাহ করতে হবে। ৭. সম্ভব হলে চিনি আহরণ হারের ভিত্তিতে আখের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। ৮. আখ বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে আখের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। ৯. বাহির কেন্দ্রে আখের সঠিক ওজন নিশ্চিত করতে হবে। ১০. আখ বিক্রি ও পুর্জি প্রদানে সব ধরনের অনিয়ম, কারসাজি ও স্বজনপ্রীতি দূর করতে হবে। ১১. মিল থেকে সরবরাহকৃত উপকরণ সময়মতো আখ উৎপাদন কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ১২. বাহির কেন্দ্রে ক্রয়কৃত আখ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাড়াই করতে হবে। ১২. দৈনিক নির্ধারিত ক্রয়কোটার চেয়ে কোনো কেন্দ্রে কোনো অবস্থাতেই অধিক আখ ক্রয় করা যাবে না। ১৩. পণ্য উৎপাদন বহুমুখী করতে হবে। কেরু এন্ড কোম্পানির মতো প্রতিটি চিনিকলে ডিস্টিলারি স্থাপন এবং প্রেসমাড থেকে জৈব সার উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ১৪. আমাদের প্রতিবেশী চিনি উৎপাদনকারী দেশের চিনিকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের চিনিকলগুলোর সেটআপ সংশোধন এবং অতিরিক্ত জনবল সমন্বয় করতে হবে। এছাড়া প্রতি বছর প্রতিযোগী ফসলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রোপণ মৌসুমের আগেই আখের বর্ধিত মূল্য ঘোষণা করতে হবে।
করপোরেশনের ব্যাংকঋণ ও দায়দেনার পরিমাণ ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকার ওপর। লোকসান কমাতে ব্যাংকঋণ সুদসহ এককালীন মওকুফ করে চিনি শিল্প করপোরেশন না লাভ না ক্ষতি পর্যায়ে আসা পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব থেকে বেতন প্রদান করতে হবে।
লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
netairoy18@gmail.com