সরকারিভাবে হাতে নেওয়া দেশের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প’ যাদের জমির ওপর করা হয়েছে, তারা প্রতি কাঠা জমির দাম পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। সেই জমি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বিক্রি করেছে প্রতি কাঠা কমবেশি ৫০ হাজার টাকায়। আর রাজউক থেকে যাদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তারা স্থানভেদে সেই জমি কাঠাপ্রতি কোটি টাকা বিক্রি করেছেন। আবার যেগুলোর অবস্থান তুলনামূলক ভালো না, সেগুলোও ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই অবস্থা দেখা যায় সরকারি সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নোয়াখালী মাইজদী হাউজিং এস্টেট নামের প্রকল্পেও। সেখানে আশির দশকের শেষের দিকে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল নামমাত্র দাম দিয়ে। সেই জমিতে প্লট তৈরি করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সর্বশেষ কাঠাপ্রতি ৪ লাখ টাকায়। আর যারা বরাদ্দ পেয়েছেন, তারা প্রতি কাঠা ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।
একই অবস্থা দেখা গেছে রাজউকের ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পটিতেও। রাজধানী ঘিরে এবং দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে সরকারিভাবে নেওয়া প্রায় ২০টি প্লট প্রকল্পের চিত্রও একই ধরনের।
এসব প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মানুষের মৌলিক অধিকার আবাসনের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয় সরকারি সংস্থা। নিয়ম অনুযায়ী মৌজা দরে জমি কিনে সেখানে সংস্থা পরিচালনার জন্য কিছু টাকা বাড়তি ধরে দাম নির্ধারণ করা হয়। এরপর তা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি একাধিক প্লট প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি প্রায় সবাই ধনী ও বিত্তশালী। তাদের মধ্যে মন্ত্রী, বিচারপতি, সংসদ সদস্য, সরকারি আমলা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে কর্মরত লোকজনসহ পেশাজীবীরাই প্রায় সব প্লট পেয়েছেন। অথচ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের সময় নামমাত্র মূল্যে ক্ষতিপূরণ পান সংশ্লিষ্ট ভূমিমালিকরা। আর পানির দরে তা বরাদ্দ দেয় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ অবস্থায় রাজধানীর পাশ্বর্বর্তী এলাকায় আরও বড় আকারের দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজউক। সেখানেও প্লট তৈরি করে তা বিক্রি করা হবে।
পূর্বাচল প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৫ হাজার ১৬টি আবাসিক প্লটের মধ্যে ১০ হাজার প্লট পেয়েছেন সরকারি চাকরিতে কর্মরত লোকজন; যা মোট প্লট বরাদ্দ গ্রহীতাদের ৪০ শতাংশ। ৪ হাজার প্লট পেয়েছেন প্রবাসীরা। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার প্লট পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবাই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল; যারা মোট প্লটের ৫৬ শতাংশের গ্রহীতা। আর বাকি প্লটের মধ্যে কিছু পেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকরা। তবে যাদের অধিগ্রহণ করা জমির পরিমাণ ৩৩ কাঠার কম, তারা ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্লট পাননি।
প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ মনে করেন, সরকারি সংস্থাগুলোর প্লট প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং এগুলো বরাদ্দের প্রক্রিয়ার মধ্যেই গলদ আছে। সেখানে একজন প্রান্তিক কৃষকের ভূমি কেড়ে নিয়ে ধনী ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলে আসছে। আবার ভূমি অধিগ্রহণের শিকার হওয়া ব্যক্তিকে পুনর্বাসনের যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেখানেও আরেক ধরনের বঞ্চনা। এ ধরনের প্লট প্রকল্প ব্যবস্থা বন্ধ হওয়া উচিত।
কেনাবেচার দামে আকাশ-পাতাল : পূর্বাচলে ১৪ হাজার প্লট গ্রহীতা তিন, পাঁচ, সাড়ে সাত ও ১০ কাঠার প্লট পেয়েছেন। তিন কাঠার জন্য যারা দেড় লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছেন, তারা এই প্লট বিক্রি করে স্থানভেদে এক থেকে দেড় কোটি টাকা পেয়েছেন। পাঁচ কাঠা আয়তনের প্লটের জন্য যারা ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় নিয়েছেন, তারা বিক্রি করে আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা পেয়েছেন। একইভাবে সাড়ে সাত কাঠা জমির জন্য প্লট গ্রহীতা পরিশোধ করেছেন দুই লাখ টাকা; আর সেই প্লট বিক্রি করেছেন সাড়ে তিন থেকে ৫ কোটি টাকা। একইভাবে ১০ কাঠা আয়তনের প্লটের জন্য ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও তা বিক্রি হয়েছে স্থানভেদে ৮ থেকে ১২ কোটি টাকার মতো।
তবে রাজউকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, পূর্বাচল প্রকল্পের শুরুর দিকে দাম কম থাকলেও পরে কাঠাপ্রতি আরও বাড়িয়ে রাজউক বরাদ্দ দিয়েছে। ২০০৯ সালে দাম বাড়িয়ে রাজউক ৩ কাঠা আয়তনের প্লটের দাম নির্ধারণ করে প্রতি কাঠা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর ৫ কাঠা আয়তনের প্লটের প্রতি কাঠা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সাড়ে ৭ কাঠা আয়তনের প্লটের প্রতি কাঠা ১ লাখ ৭৫ হাজার আর ১০ কাঠা আয়তনের প্লটের দাম প্রতি কাঠা ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, ২০০৯ পরবর্তী যারা বরাদ্দ পেয়েছেন, তারা এ দরে টাকা রাজউককে দিতে হয়েছে।
রাজউকের এ প্রকল্প নিয়ে নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের প্লটের প্রয়োজন নেই, তাদের হাতে প্লট দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা, প্রবাসীরা বেশির ভাগ প্লটের মালিক। সরকার ধনীদের সাজিয়ে-গুছিয়ে জমি তুলে দেওয়ার ফলে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর নিঃস্ব হচ্ছে প্রকল্প এলাকায় থাকা জমির মালিকরা। কৃষিজমি হারিয়ে অনেক মানুষ এখন হয়তো কষ্টে আছে। আর নামমাত্র মূল্যে প্লট পেয়ে তা বিক্রি করে টাকা পেয়েছে একটি বিশেষ শ্রেণি।’
রাজউকের পূর্বাচল সেলে যোগাযোগ করে জানা যায়, বেশির ভাগেরই সেখানে বসবাসের তাগিদ নেই। তারা এগুলো হাতবদল করে দাম হাঁকিয়ে বিক্রি করছেন। দেশের বাইরে অবস্থানরত বেশির ভাগ নাগরিক তাদের প্লট বিক্রি করে দিয়েছেন।
রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ২৪ হাজার প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ১৭৫টি বাড়ির নকশা অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাড়ি করেছেন মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জনের মতো বরাদ্দগ্রহীতা।’
রাজউকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৫ হাজার প্লটের মধ্যে বেশির ভাগ প্লটই সরকারি লোকদের (সরকারি কর্মকর্তা) হাতে। আর ৪ হাজার প্লট আছে প্রবাসীদের হাতে। সব মিলিয়ে যাদের হাতে রাজউকের প্লটগুলো গেছে তারা বাড়ি করছেন না। তাদের বাড়ি করার প্রয়োজন নেই। তারা এসব প্লট কেনাবেচার মধ্যে রয়েছেন। বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় সংশোধন আনতে হবে বলে মনে করেন তারা।
রাজউকের প্রকৌশল দপ্তর জানায়, একটি আধুনিক শহর করার লক্ষ্যে ৬ হাজার ২৭৭ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে এ প্রকল্প শুরু হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অংশে রয়েছে ৪ হাজার ৫৭৭ দশমিক ৩৬ একর এবং গাজীপুর অংশে ১ হাজার ৫০০ একর জমি। এই প্রকল্পে ১৫০ একর জমি ঢাকা জেলার খিলক্ষেত থানায় কুড়িল ফ্লাইওভার এবং লিংক রোড নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে বিভিন্ন আকারের মোট ২৭ হাজার ১৭১টি প্লট এবং ৬২ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের সুযোগ রয়েছে। যেখানে ২৫ হাজার ১৬টি আবাসিক প্লট রয়েছে।
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) ও পূর্বাচল নতুন শহরের প্রকল্প পরিচালক উজ্জ¦ল মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ হাজার সরকারি কর্মকর্তা ও ৪ হাজার প্রবাসী প্লট পেলেও তাদের একজনও বাড়ি করেননি। তারা করবেনও না। তারা প্লটগুলো কেনাবেচা করেন।’
পূর্বাচলের যখন এ অবস্থা, তখন তুরাগ নদ এলাকায় একটি কম্প্যাক্ট টাউনশিপ উন্নয়ন প্রকল্প এবং কেরানীগঞ্জ ওয়াটারফ্রন্ট স্মার্ট সিটি প্রকল্প দুটি নিয়ে কাজ করছে রাজউক। ইতিমধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠনের কার্যক্রম চলমান। এর মধ্যে ৪ হাজার ৭০০ একর ভূমির ওপর গড়া হবে কেরানীগঞ্জ উপজেলায় স্যাটেলাইট সিটি।
এর আগে রাজউকের ঝিলমিল প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এরপর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও তা সমাপ্ত হয়নি। এরই মধ্যে নতুন পরিকল্পনা নিয়েও অনেকের মধ্যে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
তুরাগ নদ এলাকার প্রকল্প বিষয়ে রাজউকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে। সেগুলো নিয়ে কোনো জটিলতা না থাকলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সমস্যা হবে না।
২০ প্লট প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন প্রভাবশালীরা : গৃহায়নের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২০টি প্লট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কথা বলা হলেও বাস্তবে হয় ভিন্ন কিছু। সেখানে বেশির ভাগ প্লট বাগিয়ে নেন প্রভাবশালী লোকজন। নামমাত্র কিছু প্লট সাধারণ মানুষ পেয়ে থাকে।
গৃহায়ন সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে নতুনরূপে গঠন হওয়ার পর সংস্থাটি নোয়াখালীর মাইজদীতে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের পাশে প্লট প্রকল্প, রাউজান উপজেলায় আবাসিক প্লট প্রকল্প, মিরসরাই উপজেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প (সোনাপাহাড় মৌজায়), মৌলভীবাজারের প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট শহরে সীমিত আয়ের লোকদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, গোপালগঞ্জে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, মাগুরায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, খুলনার বয়রায় হাউজিং এস্টেট প্লট প্রকল্প, নড়াইল সদর উপজেলায় প্লট প্রকল্প, নাটোরে প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, কুষ্টিয়ায় প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, পাবনায় প্লট প্রকল্প, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া চলমান আছে নোয়াখালীর সোনাপুরে আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, শেরপুরে সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেটের সুনামগঞ্জে সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, রাজশাহীর তেরখাদিয়া প্লট উন্নয়ন প্রকল্প, ঝিনাইদহ সদরে প্লট প্রকল্প, নোয়াখালীর মাইজদীতে প্লট প্রকল্প, ঝালকাঠীর নলছিটি উপজেলায় পূর্বচর দপদপিয়ায় প্লট প্রকল্প, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কিসমত জাফরাবাদে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প এবং পিরোজপুর সদরে আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প।