অনেকে আওয়ামী লীগ বিক্রি করে, অনেকে বুকে লালন করে। ফলে বিক্রি করা নেতাকে নয়, বুকে লালন করা নেতাদের আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানান দলটির নেতারা। তারা বলেন, বিএনপির প্রচার সেল শক্ত। আমাদের প্রচার সেল দুর্বল। প্রচার সেল শক্তিশালী করা গেলে, শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরতে পারলে ক্ষমতায় আসা কেউ ঠেকাতে পারবে না বলেও দাবি করেন নেতারা।
গতকাল শনিবার দলের ২২তম জাতীয় সম্মেলনে দ্বিতীয় অধিবেশনে রাখা বক্তব্যে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। সবাই মিলে সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরলে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত হবে।
সারা দেশ থেকে কাউন্সিলর-ডেলিগেটসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল। সকালে উদ্বোধন করে বিরতি দিয়ে বিকেলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে নেতা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের সম্মেলন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সম্মেলনস্থলে উপস্থিত হয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় সব সাংগঠনিক ইউনিটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ১৫৬ জন নির্ধারিত প্ল্যাগস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পরে শান্তির পায়রা, বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধন শেষে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন তিনি। এরপর সংস্কৃতিবিষয়ক উপকমিটির উদ্যোগে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়। নৃত্যও প্রদর্শন করা হয়। এ সময় সরকারের উন্নয়নের চিত্র ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার করা হয়। এ পর্ব সঞ্চালনা করেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস। এরপর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করেন দলের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক শেখ ফজলুল করিম সেলিম। সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ওবায়দুল কাদের। দলের প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহাস গোলাপ ও ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভাপতি শেখ হাসিনা বক্তব্য দেন।
সম্মেলন উপলক্ষে সারা দেশের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে ঢাকায় এক ধরনের উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। থেমে থেমে স্লোগান, গান, মিছিল করেন সম্মেলনস্থলের আশপাশে ও সংলগ্ন সড়কে। সব বয়সের নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সম্মেলনে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর পদচারণায় পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দল আরও সুসংগঠিত হবে বলে প্রত্যাশা করেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।
সম্মেলনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোটের শরিক দলের নেতারা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও ছিলেন সম্মেলনের উন্মুক্ত অধিবেশনে।
এবারের জাতীয় সম্মেলনে সারা দেশ থেকে প্রায় ২১ হাজার কাউন্সিলর অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া ডেলিগেট ও আমন্ত্রিত অতিথি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের খাবারের আয়োজন রেখেছিল দলটি। সম্মেলনের মূলমঞ্চে কেন্দ্রীয় কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চে ১২০ জনের বসার ব্যবস্থা করা হয়।
দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাদেক কোরাইশী। তিনি আগামী নির্বাচনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে লক্ষাধিক ভোটে পরাজিত করার ঘোষণা দেন।
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, ‘অনেকে দল বুকে লালন করছে, অনেকে দল বিক্রি করে খাচ্ছে। আগামীতে নির্বাচনে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে মনোনয়ন দিলে যতই মিথ্যাচার হোক, আপনার (শেখ হাসিনা) জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না।’
নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুভাষ বোস বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিকল্প কেউ নেই।’ পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আলমগীর বলেন, ‘পটুয়াখালী এখন আর খালি নেই, পটুয়াখালী ভরা। পটুয়াখালীর চারটি আসন আপনার নিজের। মাঠপর্যায়ের যারা রাজনীতি করে তাদের মধ্যে থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হোক।’
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আপনার নেতৃত্বে যে কমিটি আসবে সেই কমিটির প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে। সারা বাংলাদেশে বিএনপির অপপ্রচার ও কুৎসা রটনা চলছে তার বিরুদ্ধে আমাদের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। সারা বাংলাদেশে উন্নয়ন চলছে কিন্তু আমাদের বিশ্বনাথ ওসমানী নগরে উন্নয়ন পিছিয়ে আছে। কারণ আমাদের দলীয় সংসদ সদস্য নেই। সিলেটে অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের গতি আরও বৃদ্ধি করতে হবে।’
চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এ দেশ আমার গর্ব, এ মাটি সোনা। শেখ হাসিনা ছাড়া বাঙালির বিকল্প নেই।’
জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় মুদ্রায় আপনার ছবি দেখতে চাই মাননীয় নেত্রী। আপনার ছবি বাংলাদেশের মুদ্রায় দেখলে আমরা শান্তি পাব।’
জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘টাকায় একমাত্র জাতির পিতার ছবি থাকবে।’ রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘মাইর দিবো তোমাকে, ভাগো।’
ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হক বলেন, ‘দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। তাদের প্রচার সেল এত শক্ত, যার তুলনায় আমাদের প্রচার সেল দুর্বল। জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন যদি আমরা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রচার করতে পারি, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাবে। জননেত্রীর স্বপ্ন পূরণ হবে।’
সম্মেলনস্থল ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা : পুলিশ ও র্যাব ছাড়াও সাদা পোশাকে বিভিন্ন বাহিনীর কড়া নজরদারি ছিল। উদ্যানসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে দোয়েল চত্বর এবং মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও অন্য কয়েকটি বাহিনীর সদস্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন পয়েন্টে ছিল র্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স, প্যাট্রল পার্টি, ডগ স্কোয়াড। পাশাপাশি প্রস্তুত ছিল র্যাবের কমান্ডো টিমও।
সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীরা ভোর থেকেই জড়ো হতে থাকেন। সকাল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ গেটগুলোতে দেখা যায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে তারা প্রবেশ করছেন। উদ্যানে প্রবেশের গেটগুলোতে নেওয়া হয়েছিল পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি প্রবেশমুখে ছিল আর্চওয়ে। পোশাকধারী পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সাদা পোশাকে ছিলেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। কয়েক ধাপে তল্লাশি শেষে নেতাকর্মীদের উদ্যানে ঢুকতে দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহেন শাহ। তিনি বলেন, ‘সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ডিএমপি কমিশনার যেসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন, সেগুলোর সবই নেওয়া হয়েছে। মানুষজন উৎসবমুখর পরিবেশে আসছেন এবং আমাদের সহযোগিতা করছেন।’