গত শতকের ষাট সত্তর দশকে, পৃথিবীর ছবিটা ছিল অন্যরকম। তখন দুনিয়াজুড়ে বামপন্থি রাজনীতির বিপুল দাপট। এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার সর্বত্রই বাতাসে বারুদের গন্ধ। আমার দেশও পিছিয়ে নেই। আমরা বড় হচ্ছি, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও, কমরেড মাও-এর চিন্তাধারা শুনতে শুনতে। দেয়ালে দেয়ালে মাও-এর মুখ। জ্বলজ্বলে পোস্টারে জানান দেওয়া হচ্ছে, চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান...।
আবেগের আতিশয্যে কোনো কোনো বিপ্লবী রেড বুক সাক্ষী রেখে বিয়ে অবধি সেরে ফেলতেন। গায়ক অজিত পান্ডে একই ভাবে লাল কেতাব হাতে নিয়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজের পোর্টিকোতে বিয়ে করে অনেকের চোখে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। আজকের পৃথিবী বদলে গেছে। দক্ষিণপন্থি রাজনীতির রমরমা একটা দুটো দেশ বাদ দিয়ে সব জায়গায়। খোদ চীনেও বাজার অর্থনীতির দাপটে সমাজতন্ত্র আদৌ টিকে আছে কি-না তা নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মাও সেতুং নিয়ে কোনো চর্চাও নিজের দেশেই যেখানে নেই, সেখানে তার তিন দুনিয়ার তত্ত্ব বা গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা কতটা তা নিয়ে প-িতেরা আলোচনা করুন। আমরা বরং এদেশে মাওবাদী রাজনীতি নিয়ে যে বিরাট জল্পনা তা নিয়ে একটু-আধটু কথা বলি।
এ লেখা একাধারে ডায়েরি, রিপোর্টাজ, এলোমেলো চলতে চলতে দেখা থেকে। আসলে ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকার হিসেবে ভারতের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়কে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এদেশে যারা মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি করেন বা দাবি করেন যে তারাই আসল মাও রাজনীতির ধারক, তারা রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত বিপজ্জনক শক্তি। এখন তো আর্বান নকশাল শব্দটি রাজনৈতিক ডিসকোর্সে ঢুকে পড়েছে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তাদের নিয়ে লেখালেখি করাও দেশের পক্ষে গর্হিত কাজ। আমি যে সময়ের কথা বলব তখন অবশ্য মাও শব্দটি এমন নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু তখনো বস্তার, দ-কারণ্য এলাকায় উপদ্রুত ঘোষণা হয়ে গেছে। তল্লাটজুড়ে আধা সামরিক বাহিনীর বিপুল জমায়েত। তার মধ্যেই গড়ে উঠেছে মাওবাদী সংগঠনের গোপন গেরিলা ঘাঁটি।
খানিকটা ঝোঁকের মাথায় ঠিক করে ফেলেছিলাম যে নিষিদ্ধ এই বামদের নিয়ে একটা ছবি করব। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল যে এদেশের সবকটি বাম দলের কর্মসূচি, দলিল, চিন্তাভাবনা নিয়েই একধরনের ভিজ্যুয়াল প্রবন্ধ লিখব যা ভবিষ্যতে গবেষণার কাজে লাগবে। অন্য দলগুলো নিয়ে কাজ করা অনেক সহজ বলে প্রথমেই ঠিক করে নিলাম, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক মাওবাদী গেরিলাদের নিয়েই শুরু করব। ভাবা সহজ। কাজটা কঠিন। কুড়ি একুশ বছর আগেও গোপন ঘাঁটিতে গিয়ে শ্যুটিং করা ছিল অকল্পনীয়। একে তো মাওবাদীদের দিক থেকে ছাড়পত্র নাও মিলতে পারে। তারপর যদি তারা অনুমতি দিল, কিন্তু সরকার তো ছাড়বে না। এ একেবারে মারীচের মতো অবস্থা। হয় রামে না হয় রাবণে মারবে।
যাই হোক, অনেক কষ্টে, কাঠখড় পুড়িয়ে প্রায় এক বছর ধরে চেষ্টার পর বস্তার দ-কারণ্যের গভীর জঙ্গলে মাওবাদী ডেরায় গিয়ে শ্যুটিংয়ের অনুমতি পেলাম। একমাস ছিলাম গোপন ঘাঁটিতে। কীভাবে যে এখনো বেঁচে আছি, মাঝেমধ্যে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করি। এক এক সময় এখন ভাবি, জীবন বাজি রেখে ডকুমেন্টারি করতে যাওয়ার পেছনে বোধহয় ছিল শৈশব কৈশোরে অবচেতনে মাও-এর প্রভাব। আগেই বলেছি যে, তখন তো এক অন্য সময়। বিশ্বে এনেছে নতুন দিন, মাও সে তুং আর হো চি মিন।
তখন অবশ্য মাওবাদ ছিল না। বলা হতো মাও চিন্তাধারা। সারা বিশ্বে দিচ্ছে নাড়া কমরেড মাও-এর চিন্তাধারা। এদেশে নকশালপন্থিদের দুটো গোষ্ঠী এমসিসি বা মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র ও সিপিআই-এমএল জনযুদ্ধ এই টার্মটা সামনে আনে মাওবাদ। পরে দুই গোষ্ঠী এক হয়ে নতুন পার্টির নাম রাখে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)।
বাদ না চিন্তা তা বিতর্ক রয়েছে। নকশালপন্থিদের বড় অংশ মাওবাদ বলে কিছু হতে পারে বলে বিশ্বাস করে না। প্রথম কথা দ্বান্দ্বিক দিক দিয়ে দেখতে গেলে মার্কসবাদী তাত্ত্বিকতায় বৈপ্লবিক চিন্তা, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে নীতি ও কৌশল তার থেকে মাও রাজনীতির নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ফারাক যথেষ্ট। মাও তৃতীয় বিশ্বে কৃষকদের অগ্রণী ভূমিকা যে বিপ্লবের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তা চোখে আঙুল দিয়ে যান্ত্রিক মার্কসবাদীদের সফল চীন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মার্কসবাদী তত্ত্বে মাও-এর নিজস্ব কিছু অবদান আছে তা অনস্বীকার্য।
কৃষিপ্রধান ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে তাই মাও সেতুং-এর প্রভাব অন্যান্য অনেক রথীমহারথীদের চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি এটা ঠিক। প্রভাব না বলে আপনি জনপ্রিয়তাও বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে কার্ল মার্কস বা লেনিন সাহেবকেও পেছনে ফেলবেন মাও। কিন্তু তা হলেও মাওবাদ কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকবেই। বস্তুত ইদানীং কখনো কখনো খুব মনে হয় যে ১৯৪৯-এ চীন বিপ্লবের সময় সেদেশের পরিস্থিতি মেনে একুশ শতকের ভারতে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাটা বোধহয় একটু বেশিমাত্রায় রোমান্টিক। অ্যাডভেঞ্চারিজম তো বটেই। আজকের দিনে ঘাঁটি এলাকা, লাল ফৌজ, গেরিলা যুদ্ধ, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও বাস্তবে কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
বস্তারে মাও রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগারে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আবেগ, পরিশ্রম, দুর্জয় সাহস এসব বাদ দিলে কোথাও যেন পুরনো দিনের মাও পথকে অন্ধ অনুসরণ করার ঝোঁক খুবই চোখে লাগে। ওড়িশা, বিহার, অন্ধ্র, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় রাজ্যের যে সব এলাকায় মাওবাদী রাজনীতির প্রভাব রয়েছে সব জায়গাতেই জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আদিবাসী। উন্নয়নের তথাকথিত ঝলমলে ভারতে এই দলিত, আদিবাসীরাই সব থেকে বঞ্চিত। জল, জঙ্গল, জমি থেকে হাজারে হাজারে তারা নগরায়ণের নামে স্বাধীনতার পর থেকেই পিছু হটছেন। ফলে মাওবাদী রাজনীতির মূল সাফল্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে বড়মাপের গণআন্দোলন গড়ে তোলা। এ এক আদিবাসী বিদ্রোহ। তেলেঙ্গানার কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে বস্তারের জনযুদ্ধের মিল আছে। বস্তারের জঙ্গল বড় গভীর। ভালুক, চিতা, হায়েনার উৎপাত খুব। মাইলের পর মাইল হাঁটছি। দিন রাতে কম করে দশমাইল হাঁটা বাধ্যতামূলক। জল ফুটিয়ে খেতে হতো। খাওয়া বলতে দিনে ভাত তরকারি, রাতে রুটি সবজি। দশদিন বাদে একদিন ডিম পেয়ে খুব আনন্দ হয়েছিল। নদী, পাহাড় পার হচ্ছি গেরিলাদের সঙ্গে। ছোট ছোট স্কোয়াড। পিঠে রুকস্যাক, তারমধ্যে বাড়তি জামাকাপড় আর বই। পড়া কম্পালসারি। রাতে খোলা আকাশের নিচে ঘুম। ভুল বললাম, গাছের তলায় একটা নীল পলিথিন পেতে ঘুমিয়ে পড়া। থাকতে থাকতে শিখে গেছিলাম কেন বাঁশঝাড়ের নিচে শুতে নেই, কেন বট, অশ^ত্থ শোয়ার পক্ষে ভালো, দূর থেকে প্রাণীর ডাক শুনে বোঝা বিপদ আসছে কিনা আরও কত কিছুই যে শিখেছি, জীবনে ভুলব না। তাইতো কখনো কখনো ফিল্মের ক্লাসে ছাত্রদের বলি সব কথা তোমরা বইয়ে পাবে না। কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে ডকুমেন্টারি বানাতে হয় তা বাস্তবে ক্যামেরা কাঁধে নিয়েই তোমাকে শিখতে হবে।
হাঁটছি আর গ্রাম দেখছি। শতাব্দী প্রাচীন এক একটা গ্রাম। মূলত গোন্দ জনজাতির বাস। গোন্দ ভারতের প্রাচীনতম বাসিন্দা। আদিতে এই জায়গা ছিল গন্দোয়ানা ল্যান্ড। তখন হিমালয় পর্বতমালার জন্ম হয়নি। অস্ট্রেলিয়া ছিল গন্দোয়ানা ভূখ-ের অংশ। ভূমিকম্পের ফলে অস্ট্রেলিয়া আলাদা হয়ে গেল। আজ মাও সেতুং-এর জন্মদিন। ফলে এলোমেলো অনেক কথা মনে পড়ছে।
লেখকঃ ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com