মহানগর ও রাজধানী ঢাকার আজ এক নবযাত্রা শুরু হলো। নাম ঢাকা’র মতোই নগর ঢাকার ঢাকা পড়া ইতিহাসের অনেক পাতা হারিয়ে গেলেও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ইতিহাসবিদদের রচনায় এটা স্পষ্ট যে, ঢাকা কেবল বাংলাদেশই নয় বরং বঙ্গীয় ভূগোলের অন্যতম প্রাচীন নগরী যা এখনো জীবন্ত ও ক্রমবর্ধমান। পূর্ববাংলার বাণিজ্য ও অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র ঢাকা একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকার ওপর বহু দুর্যোগ নেমে এসেছিল। এসব কারণে ঢাকার ধারাবাহিক ক্রমোন্নতি পাওয়া যায় না। তবে এটাও ঠিক যে, ১৮৬৪ সালে যে ঢাকায় প্রথম পৌরসভা চালু হয়েছি আর ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে ১৯১৭ সালে যে ঢাকা মহানগরের জন্য প্রথম নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই তুলনায় আধুনিক মহানগর হিসেবে ঢাকা এখনো অনেক পিছিয়ে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ঢাকা বারবারই ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং পুরো দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে গেছে। তা যেমন রাজনীতিতে ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে, তেমনি অর্থনীতিতেও। আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ঢাকা মহানগর ঘিরে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং যেসব পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নাধীন তাতে আগামীতে ঢাকা মহানগর সত্যিকার অর্থেই একটা আধুনিক মেট্রোপলিটন সিটি হিসেবে গড়ে ওঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ রাজধানী ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল চালু মেট্রোপলিটন ঢাকার অগ্রযাত্রায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের চলমান টানা তৃতীয় দফার প্রথম দফায় ২০১২ সালে এই মেট্রোরেল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। মূল কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইনের দৈর্ঘ্য ২১ কিলোমিটারের কিছু বেশি। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আজ চালু হচ্ছে উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ। মতিঝিল পর্যন্ত ২০২৩ সালে এবং কমলাপুর পর্যন্ত ২০২৫ সালে চালু হওয়ার কথা। এই মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। ক্রমেই দৃশ্যমান হতে থাকা ঢাকা মেট্রোতে কেবল এই উত্তরা-কমলাপুর রুটই নয়, আওয়ামী লীগ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় মোট ছয়টি মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সব মেট্রোরেল মিলে মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২৮ কিলোমিটার। এসব মেট্রো রুটের মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে পূর্বাচল সিটি, গাজীপুর, সাভারের আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের দ্রুততম সময়ে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। মেগাসিটি ঢাকার আগামীর চাহিদা পূরণ এবং যানজট নিরসনে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প এসব। আশা করা যায়, ইতিমধ্যেই চালু হওয়া পদ্মা সেতু যেমন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভাবনীয় অগ্রগতির দুয়ার খুলে দিয়েছে; তেমনি ভবিষ্যৎমুখী গণপরিবহন ব্যবস্থার শুভসূচনা হিসেবে মেট্রোরেল ঢাকা মহানগরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
ঢাকার মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে মেট্রোরেলের চলাচল, স্টেশনে থামা, কোথায় কত গতিতে চলবে সেসবের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে, সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থা উত্তরার দিয়াবাড়ির ডিপোতে থাকা অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারে (ওসিসি) থাকবে। আজ থেকে আগামী কিছুদিন মেট্রোরেল চলবে দিনে মাত্র চার ঘণ্টা করে। যদিও অন্তত মেট্রোরেলের বহরে ১২টি ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত আছে, যা দিয়ে প্রতি তিন থেকে পাঁচ মিনিট অন্তর ট্রেন ছাড়া সম্ভব। এ ছাড়া মেট্রোরেলের মাত্রাতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। আলোচনা-সমালোচনা চলছে মেট্রোরেলের নির্ধারিত ভাড়া সবার জন্য উপযোগী কি না তা নিয়েও। এটা মনে রাখতে হবে যে, ঢাকার ৬০-৭০ শতাংশ মানুষই গণপরিবহন ব্যবহার করেন। কিন্তু একটা সেকেলে ও অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষকে দ্রুতগতির গণপরিবহনে নিয়ে আসার এই ক্রান্তিকালে সবদিক থেকেই মেট্রোরেলকে যাত্রীবান্ধব করে তুলতে হবে।
ঢাকা মহানগরের যানজট কমাতে ও মেট্রোরেলের পূর্ণাঙ্গ সুফল পেতে মেট্রোর পাশাপাশি এক ছাতার নিচে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা এবং মেট্রো স্টেশনগুলোর সঙ্গে তা যুক্ত করা খুবই জরুরি। এ ছাড়া মেট্রো স্টেশনের কাছে পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা এবং স্টেশনের আশপাশে পথচারীদের প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছন্দে হাঁটাচলার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তবে মেট্রোরেলের কাক্সিক্ষত সুফল পেতে হলে ঢাকার চারপাশ ঘিরে যে সার্কুলার রুট ও বাইপাসের পরিকল্পনা রয়েছে সেটা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে এবং এসব সার্কুলার রুটের সঙ্গে মেট্রোরেল রুটগুলোকে যুক্ত করতে হবে। এভাবে ঢাকা মেট্রোকে ঘিরে থাকা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মতো শহরগুলো সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে গেলে ঢাকা সত্যিকার অর্থেই যুগোপযোগী ঢাকা মেট্রোতে পরিণত হতে পারবে।