আজ ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০৮তম জন্মদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ আয়োজিত জয়নুল উৎসবসহ (২৯-৩১ ডিসেম্বর, ২০২২) বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকায় গ্যালারি চিত্রকে চলছে শিল্পীর চিত্রকর্ম নিয়ে ‘সংগ্রাম’ শীর্ষক বিশেষ প্রদর্শনী, যা চলবে আগামী ৪ জানুয়ারি, ২০২৩ পর্যন্ত। প্রদর্শনীটির কিউরেটর শিল্পী ও শিক্ষক সুমন ওয়াহিদ। জন্মদিন এবং এই বিশেষ প্রদর্শনী নিয়ে জয়নুল আবেদিনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এ লেখা।
‘শিক্ষিত হয়ে দেশের সম্পদকে আজও চিনতে-বুঝতে পারছি না। বিদেশ ঘুরে এসে নকল জিনিসকে আসল বলে ভুল করছি। বাংলার সম্পদকে নিজের করে গ্রহণ করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছি।’জয়নুল আবেদিন। ১৯৭১ সালের ২৬ জানুয়ারি রাজশাহীতে চারু ও কারুকলা প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ কথা বলেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। ‘পালপাড়ায় শিল্পাচার্য’ শীর্ষক সফিউদ্দীন আহমদের লেখায় এ কথার উল্লেখ রয়েছে। জয়নুল সেখানে লোক শিল্পের নিপুণ কারিগরদের ‘প্রকৃতির শিল্পী’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাদের বাঁচাতে নগর ও গ্রামীণ সভ্যতার প্রাচীর ভেঙে দেওয়ার বিষয়েও মত দিয়েছিলেন।
জন্মের শতবর্ষ পেরিয়ে আসা শিল্পী জয়নুল আবেদিনের প্রকৃতির শিল্পীকে স্বীকৃতি দেওয়ার সংগ্রামের প্রয়োজন কি আজও আছে? কীভাবে তার সংগ্রামের আবেদন আজকের প্রেক্ষাপটে আমরা নির্ণয় করতে পারি? উল্লেখ্য, শিল্পী জয়নুল ১৯৫৪ সালে টেম্পারা মাধ্যমে এঁকেছিলেন ‘সংগ্রাম’ শীর্ষক তার বিখ্যাত চিত্রকর্মটি। চিত্রকর্মটিতে লোকজীবনের প্রাত্যহিক সংগ্রামের আখ্যান চিরায়ত রূপ লাভ করেছে। একইভাবে তার আঁকা রেখা ও পরিসর বণ্টনের বলিষ্ঠতায় তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় মানুষের জীবনের মৌলিক চাওয়া-পাওয়ার দাবির কথা তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন কত না সহজে। আসলে যা ন্যায্য, যা সত্য, যা বাস্তব তা বলতে, লিখতে, আঁকতে ও প্রকাশ করতে কোনো বাধা থাকে না মানুষের যজ্ঞে।
জয়নুল সেই সময়ের মানুষ যখন ভারতে চলছে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্ব। দুইশ বছরের শাসনকালের এ পর্যায়ে এরই মধ্যে উপনিবেশ মানুষের জীবনকে করে দিয়েছে একদম পরিবর্তিতকরে দিয়েছে টাল-মাটাল আর উলট-পালট। কৃষ্টি-আচার-সংস্কৃতির এ সেই বদলে যাওয়া, যার মধ্য দিয়ে বিচ্যুতি ঘটেছে মানুষের তার ঐতিহ্য থেকে, তার পরম্পরা থেকে। যদিও ক্রমান্বয়ে নতুন ও অপর সংস্কৃতি, আদর্শ ও বিশ্বাসের ভেতর দিয়ে আরেকটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল এ স্থানের মানুষের জগৎ। ঔপনিবেশিক শাসনকালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ ঐতিহ্যের মুখাপেক্ষী হয়ে গড়ে উঠলেও সেখান থেকে বলা হয়েছিল ভারতের ঐতিহ্যের দিকে চোখ ফেরাতে। যদিও তত দিনে আধুনিকতার বিস্তার আমরা দেখতে থাকি গোটা বিশে^ই। পশ্চিমের পরিসরে পত্তন হওয়া এ আধুনিকতা ছিল আগের ঘটনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরম্পরা ও ঐক্য তৈরি করা। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে বিকশিত হওয়া বিশেষত ভারতবর্ষের মানুষের কাছে আধুনিকতা ছিল ‘মেলবন্ধন’, ‘বিচ্যুত হওয়া’, কিংবা ‘নিজেকে খোঁজার অবিরত সংগ্রাম’।
গত শতকে এ অঞ্চলে আধুনিকতার প্রারম্ভিক পর্বের ‘সার্থক’ রূপ দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, যামিনী রায়, জগদীশ চন্দ্র বসু, জীবনানন্দ দাশ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও জসীম উদ্দীনের সৃষ্টিশীলতায়। এ অঞ্চলে বিকশিত আধুনিকতার এ বোধের পরম্পরার বিবেচনায় জয়নুলের অবস্থান আলাদা। তার জমিন বাস্তবসরাসরি চোখে দেখা পৃথিবী আর পূর্ব-পশ্চিম থেকে অর্জিত ও অনুপ্রাণিত শিল্প ঐতিহ্যের প্রাথমিক সূত্রগুলোর যথার্থ প্রয়োগ। এর সঙ্গে তিনি উত্তরসূরি হলেন ঔপনিবেশিক পূর্ববাংলায় আবহমানকালের যতে্ন থাকা মানুষের জীবন ও লোকশিল্পের বিচিত্র শক্তিকে আহরণ করে। ১৯৫৪ সালে জয়নুলের আঁকা ‘সংগ্রাম’ ছবির সার্থকতা তার এমন অভিজ্ঞতা থেকেই নিহিত ও উদ্ভাসিত। এ সময়ই তিনি আঁকলেন ‘পাইন্যার মা’। এক উল্লম্ব, ঊর্ধ্বগামী ও আত্মমর্যাদার অঙ্গীকার নিয়ে পরিসরে ছড়িয়ে যেতে চাওয়া মানুষের চিত্রই জয়নুলের সংগ্রামের মূল শক্তি। জয়নুলের গ্রাম, তার লোকালয়, তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আর সর্বোপরি তার শ্রেণির প্রতি সম্মান এবং নিজের শ্রেণিকে ভুলে না যাওয়ার সংকল্পের প্রতি বিশ্বাসই তার ভিত্তি।
আধুনিকতার জটিল পাটাতনে জয়নুলের এ সংগ্রাম খুব সহজ ও স্পষ্ট। বাংলার জীবনই জয়নুলের সংগ্রামতার ভ্রমণের পথঅন্বেষণের পথ। অনেক পথ তিনি মিলিয়েছেন এ পথেই। জয়নুলের এ সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি। জয়নুল আবেদিনের অনেক পরিচয়অনেক অবদান। আধুনিকতার নিরিখে স্থান ও স্থানীয়বোধের স্বকীয়তা এর মূল সুর। যদিও এ বহুমাত্রিক প্রস্তাবনা আজ অনেক প্রসারিত হয়েছে। মানুষের রুচি তৈরি করতে চেয়েছিলেন জয়নুল। কোনো মানুষদের রুচির তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি? যারা বিচ্যুত হয়েছিলেন, যারা পথ হারিয়েছিলেনতাদের দিশা দিতে চেয়েছিলেন বাংলার ঐকতানের মধ্য দিয়ে।
বাংলার মানুষের অভিজ্ঞতা বদলালেও, তার শ্রেণি ও অবস্থানের পরিবর্তন হলেও এবং তার অর্জনের রূপান্তর ঘটলেও ‘ঐক্য’ই পারে সেটি রক্ষা করতে। এর মধ্যে দিয়েই শনাক্ত হবে নিজস্বতারযা দীর্ঘ ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকবে। এটাই জয়নুলের নন্দনবোধতার জ্ঞানতার শাস্ত্রতার অর্জন। রুচি তৈরির উপাদান হিসেবে জয়নুল আবেদিন শনাক্ত করেছিলেন বাংলার লোকায়ত মানুষের জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান শিল্পের ভা-ার। একই সঙ্গে পরিবেশ, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে শিল্পিত আখ্যান দেওয়ার প্রয়াস। জয়নুল আবেদিনের গোটা শিল্পজগৎ এ ধারণায় পূর্ণ। বহু মানুষের কথা তিনি ধারণ করেছেন তার সৃষ্টি করা পরিসরে। ভূমি, ভূগোল, পরিবেশ ও ইতিহাসের সম্মিলনই ছিল জয়নুলের আরাধনা। এর সঙ্গে সংযোগ ও সম্পর্ক গড়ে মানুষের ইতিহাস নির্মাণ করেছেন তিনি। এ মানুষদের তিনি করেছেন সর্বজনীন, যা বর্তমানযার রূপ বদলায়, কিন্তু ভাব বদলায় না। এমন রূপের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন মনে করি ১৯৭০ সালে প্রথম প্রদর্শিত জয়নুলের আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ ‘নবান্ন’ শীর্ষক স্ক্রলচিত্র। কৃষিপ্রধান বাংলার মানুষের জীবন ও অন্নকে ঘিরে পুরো মানবসভ্যতার জীবন যেন ধরা আছে এ চিত্রে। মানুষের জীবনকে উদযাপন করার যে ধারাবাহিক এবং ঐকান্তিক লক্ষ্য, যা এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে ঘটে‘নবান্ন’ সেই কথাই বলে। ১৯৭০ সালটি জয়নুল আবেদিনের জন্য নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সেই বছর তিনি ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু শিবিরগুলো ও গোরিলাযুদ্ধের এলাকা পরিদর্শন করেন। সেই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বিবরণ তার চিত্রমালায় যুক্ত হয়েছে। ওই বছরই ১১ নভেম্বর বাংলাদেশে উপকূলীয় ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তান্ডব দেখার পর ১৯৭৩ সালে আঁকেন ‘মনপুরা ৭০’। আট লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল সেই ঝড়ে। অনুভূমিক এ চিত্রটি শেষ হয়েছে দুর্দমনীয় রেখায় বেঁচে থাকা মাথা নিচু করে বসা এক মানুষ আঁকার মধ্য দিয়ে। হয়তো এটাই মানুষের শক্তি। বেঁচে থাকাই মানুষের চিরন্তন সাধনা। এই রূপ সৃষ্টি করা একজন শিল্পীর কাজ। জয়নুল আবেদিন সেটিই করেছেন।
তিনি মানুষের আদিম আকাক্সক্ষার প্রতি অনেক বেশি আস্থাশীল ছিলেন। এশীয় এলাকার মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তারা আত্মিক শক্তিতে প্রতিভাত। এ আত্মিক শক্তির বিচরণ রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে-শরীরে। এ সাধারণের কথাই বলেছেন জয়নুল। জয়নুল সেই সময়ের মানুষ যখন শিল্পবিপ্লব, বিশ্বায়ন ও আধুনিকতা মিলেমিশে উদ্দেশ্য হারাচ্ছে সবকিছু কিংবা নতুন ধরনের উদ্দেশ্যের বিকাশ ঘটাতে অগ্রসর হচ্ছে। এ কারণেই হয়তো কাকুজো ওকাকুরা ‘প্রাচ্যের আদর্শ’ বইতে লিখছেন, ‘এশিয়া যদি তার আত্মিক শক্তিকে বিনষ্ট হতে দেয় তবে তা নিঃসন্দেহে বিশেষ মারাত্মক হবে। সেই সুদূর অতীতকাল থেকে যাবতীয় শ্রমজাত শিল্প ও আলংকারিক শিল্পধারা, যা হলো যুগ-যুগান্তরের কুল ক্রমাগত জাতীয় সম্পদ, তা অবাধ গতিতেই প্রবহমান আছে। সেই সম্পদ যদি এশিয়া কখনো হারায়, তবে সে শুধু বস্তু সামগ্রীর সৌন্দর্য থেকেই বঞ্চিত হবে না, আরও বিফল হবে স্রষ্টার আনন্দ ও তার অন্তর্দৃষ্টির বৈশিষ্ট্য এবং যুগ যুগব্যাপী শ্রমসাধনায় মানবধর্ম আরোপের শুভ চেষ্টা। কারণ, যেমন নিজের তাঁতে বোনা কাপড়ে নিজের দেহসজ্জা স্বগৃহে বাস করার মতোই আনন্দদায়ক ও তৃপ্তিকর, তেমনি নিজ পরিবেশে স্বীয় আত্মসত্তার বিকাশও সমরূপে সুফলপ্রসূ।’
জয়নুলের সংগ্রাম হলো অন্তর্দৃষ্টির বৈশিষ্ট্য এবং যুগ যুগব্যাপী শ্রমসাধনায় মানবধর্ম আরোপের শুভ চেষ্টা। তার শিল্পী জীবনের লক্ষ্য হলো মানবধর্মের স্থানীয় রূপকে সৃষ্টি করা। এ রূপের নানা আঙ্গিক আছে জয়নুলের সৃষ্টিতে-কর্মে। জয়নুলের আঁকা একটি চিত্রকর্মের শিরোনাম ‘ঘরে ফেরা’। বিকেল-সন্ধ্যার ডুবতে থাকা সূর্যের আলোতে কয়েকটি গরু নিয়ে এক রাখাল ফিরছে। হয়তো জয়নুলও ফিরতে চেয়েছিলেন ঘরে। যে ঘরটি একান্তভাবেই তার। জয়নুলের সংগ্রাম আসলে ঘরে ফিরে আসার সংগ্রাম। প্রকৃতি-পরিবেশে থাকা সেই ঘর এক সাধারণ মানুষের। এটাই জয়নুলের সবাইকে নিজের কাছে ফিরে আসার আহ্বান।
লেখক: লেখক ও সাংবাদিক