ভরসা পল্লী চিকিৎসক

খুলনার সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এ কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের চিকিৎসার জন্য জেলা শহরে আসতে হচ্ছে। অনেকে ঝক্কি এড়াতে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে রোগ হচ্ছে জটিল।

উপজেলাগুলোর বাসিন্দারা জানায়, শীতের ঠা-া আবহাওয়ায় শিশু রোগী সংখ্যা বাড়ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি ও জ¦রে আক্রান্ত হচ্ছে বেশিরভাগ শিশু। শহরের কাছে দুটি উপজেলা বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়ায় শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও কয়রা, পাইকগাছা, তেরখাদা, ফুলতলা, দাকোপ, দিঘলিয়া ও রূপসাতে দীর্ঘদিন ফাঁকা রয়েছে শিশু কনসালট্যান্ট পদ। ফলে এসব উপজেলায় মেডিকেল কর্মকর্তারা রোগীদের যেনতেনভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন।

কয়রা উপজেলার কয়েকজন রোগীর স্বজনরা জানান, দক্ষিণ জনপদের সব থেকে অবহেলিত কয়রা উপজেলা। জেলা শহরের উপজেলা সদরের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার। নদীপথে শহরে যেতে সময় লাগে ৯-১০ ঘণ্টা আর সড়কপথে ৫-৬ ঘণ্টা। এ উপজেলার পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ও খাজরা ইউনিয়নের মানুষও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১৩ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তখন থেকেই শিশু কনসালট্যান্ট পদটি ফাঁকা রয়েছে। ফলে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ওই অঞ্চলের লাখো মানুষ।

হাসপাতালে ভর্তি আশাশুনির একশরা গ্রামের শিশু সাইফুলের মা হাফিজা বেগম বলেন, ‘ডায়রিয়ার কারণে হাসপাতালে নিয়ে আসছি। দুদিনেও কোনো উন্নতি হয়নি। মেডিকেল অফিসাররা চিকিৎসা দিচ্ছেন। এখানে কোনো শিশু চিকিৎসক নেই। অধিকাংশ সময় গ্রামের ডাক্তারদের দেখাই। গরিব মানুষ শহরে নিতে পারি না। এ হাসপাতালে একটি শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলে দুই উপজেলার মানুষ উপকৃত হতো।’

খুলনা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও নেই শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সেখানেও মেডিকেল কর্মকর্তারা শিশুদের চিকিৎসা দেন। সমস্যা জটিল হলে খুলনা মেডিকেলে কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

উপজেলার গড়াইপুর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বলেন, ‘আমার নাতি জন্মের পর থেকে অসুস্থ। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে এক দিন রেখে খুলনায় রেফার্ড করা হয়। শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এখনো সুস্থ নয়। খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

খুলনা থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা দাকোপ। নদীদ্বারা বেষ্টিত একটি দ্বীপ। জেলায় যাতায়াত করা বেশ কষ্টকর। একটু সমস্যা হলেই শিশুদের নিয়ে ছুটতে হয় শহরে।

উপজেলার কৈলাশগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ‘দুই বছরের ছেলেটাকে নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছি। ঠা-া লেগে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হয়েছে। উপজেলা হাসপাতালের শিশুদের জন্য ডাক্তার নেই। মাঝে সাত দিন শিশু হাসপাতালে থেকে এলাম। কিছু হলেই খুলনার হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে কাজ বন্ধ। এখন না খেয়ে থাকার উপক্রম। এখানে ডাক্তার থাকলে এ সমস্যাই পড়তে হতো না।’

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নূরুল হুদা খান বলেন, ‘আমি মনে করি অগ্রবর্তীর তুলনায় দূরবর্তী উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন অনেকটা বেশি। কয়রা থেকে জরুরি রোগী খুলনায় পৌঁছতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে এখানে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একান্ত প্রয়োজন।’

তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার জানান, হাসপাতাল ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকে সেখানে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেওয়া হয়নি। ঠা-াজনিত শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শেখ সুফিয়ান রুস্তুম বলেন, ‘বহির্বিভাগে রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে। নভেম্বর মাসে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলে ১ হাজার ৭৮৩ শিশু চিকিৎসা গ্রহণ করেছে।’

দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীব বালা বলেন, সেখানে শিশু বিশেষজ্ঞ নেই। বহির্বিভাগে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলে শিশুদের রেফার্ড কমে যাবে। শিশুমৃত্যু রোধে কার্যকারী পদক্ষেপ হবে। হার্ড টু রিচ এলাকা কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছায় শিশু ডাক্তার থাকলে ভোগান্তি অনেকটা কমে আসবে। এসব এলাকা থেকে শিশু রেফার্ডে অভিভাবকদের খুবই ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে কয়রা সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা, সেখানে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একান্ত প্রয়োজন। শূন্য পদের তালিকা পাঠানো রয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এটির সমাধান হবে।’

খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. মনজুরুল মুরশিদ বলেন, ‘সব উপজেলাতেই শিশু কনসালট্যান্ট জরুরি। তবে সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কনসালট্যান্ট পদে পদায়ন দেওয়া হয়। শূন্য পদের তালিকা আমরা বহুবার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। হয়তোবা কনসালট্যান্ট কম থাকায় পদায়ন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’