স্লো ফ্যাশনের কারিগর

বাংলাদেশে প্রথম স্লো ফ্যাশন ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু হয়েছে। যার নেতৃত্ব দিয়েছেন ফ্রেন্ডশিপ এনজিও এন্টারপ্রাইজ ফ্রেন্ডশিপ কালারস অব দ্য চরস । বিশাল এই কর্মযজ্ঞে পুরো ডিজাইন টিমকে যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি হলেন ডিজাইনার ইমাম হাসান। মোহসীনা লাইজুকে তিনি জানালেন তার বিশেষ কাজের আদ্যোপান্ত

করোনা-পরবর্তী পৃথিবীজুড়েই মানুষের জীবনযাপনে পরিবর্তন এসেছে। ফ্যাশন ট্রেন্ডেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। এর মধ্যে যে বিষয়গুলো বেশি আলোচনায় এসেছে তার মধ্যে আছে সাসটেইনেবল ফ্যাশন, ইকো ফ্রেন্ডলিং এবং জিরো ওয়েস্ট। ফ্যাশনের এই ধারা আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতেও ছুঁয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই এ বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে আছে ফ্রেন্ডশিপ এনজিও। তারাই বাংলাদেশের প্রথম ‘স্লো ফ্যাশন ব্র্যান্ড’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের চিরাচরিত বয়নপদ্ধতি অনুসরণ করেই তৈরি হয় তাদের কাপড়। প্রাকৃতিক রঙের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় এজোমুক্ত রং। সেই কাপড়ে তৈরি হয় পোশাকসহ নানা ধরনের পণ্য। কখনো কখনো আবার বেঁচে যাওয়া কিংবা বাতিল কাপড়কে পুনর্ব্যবহার যেমন করা হয়, তেমনি আপসাইলকেলও।

এ কাজটি যারা করছেন তারা হলেন চর অঞ্চলের প্রান্তিক নারীরা। তারা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষকর্মী করে তুলছেন। যাদের দ্বারা পরিবেশবান্ধব সাসটেইনেবল পোশাক ও হস্তশিল্প তৈরি হচ্ছে। 

আপসাইকেল ভাবনার বিষয়টি বলতে গেলে শুরু থেকে গতানুগতিক ফ্যাশন ভাবনার বেড়াজাল থেকে বের হয়ে একটা দায়িত্ববোধ কাজ করেছে আমার মধ্যে। দায়িত্বটা আমাদের পরিবার, সমাজ, দেশ, জাতি, সংস্কৃতি সর্বোপরি বিশ্বায়নের এই সংস্কৃতি। পৃথিবীজুড়ে মানবজাতির জন্য যে বিরূপ পরিবেশ তৈরি হয়েছে তার জন্য আমরাই দায়ী। তাই এই পরিস্থিতিতে বিশে^র অর্থাৎ মানবজাতির নিরাপদ ও সুনিশ্চিত জীবনযাপনের জন্য সবারই কাজ করে যেতে হবে।

একজন ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব এবং ভাবনা। আসলে সবাইকে কাজ করে যেতে হবে। পৃথিবী দূষণের বড় কারণ ল্যান্ড ফিলিং অর্থাৎ ভূমি ভরাট, যা মানব ইতিহাসের জন্য বড় হুমকি। এর পরিত্রাণের জন্য আমাদের সচেতন ফ্যাশন-বোদ্ধারা বেশ কিছু বছর ধরে আপসাইকেলিং বা রিসাইকেলিং কাজ করে যেতে হবে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে পৃথিবীজুড়েই মানুষের একটা উপলব্ধি হয়েছে, যা একদিকে পরিবেশের সৌন্দর্য এবং কাপড়ের পুনরায় ব্যবহারের বিষয়টা নিশ্চিত করে।

নিজেকে আসলে খুব ভাগ্যবান মনে করি যে বাংলাদেশ থেকে সাসটেইনেবল ফ্যাশন নিয়ে কাজ করতে পারছি। বিশেষ করে ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। যে প্রতিষ্ঠানটি আমাকে এই কাজের জন্য সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার রুনা খানের প্রতি কৃতজ্ঞ যিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষ করে উত্তর অঞ্চলের চর এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীদের হাতে-কলমে শিখিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করা হয় এবং তাদের শিল্প-দক্ষতা বিশ^ দরবারে তুলে ধরার একটা চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ইউরোপের অনেকগুলো দেশের মানুষ আমাদের এই পোশাকগুলো পরছে।

এসব প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের দিয়ে আমাদের তৈরি পোশাক ও হস্তশিল্প তৈরি হলেও যথাযথ দক্ষতা ও সুনিপুণ-শৈলী দিয়ে আমাদের ডিজাইন বিভাগ সর্বক্ষণিক সহযোগিতায় সমসাময়িক ফ্যাশন ট্রেন্ড ধরে রাখতে পারছি, যা কি না দেশ ও দেশের বাইরের সচেতন নাগরিক এবং উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের পোশাক দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে বিশেষ করে প্রাকৃতিক রং এবং এর ব্যবহার। বিশেষ করে ক্ষতিকর পদার্থ না থাকায় সবার জন্যই উপযোগী।

পণ্যতালিকার কথা বলতে গেলে পণ্যতালিকায় রয়েছে তাঁতের শাড়ি, জামদানি, সিল্ক, মেয়েদের পোশাক, ছেলেদের পোশাক, কুর্তি, কামিজ, পাঞ্জাবি, ছেলেদের ফতুয়া, ট্রাউজার, কাঁথা, শাল, হাতে বানানো নানা গহনা, হোমওয়ার ও হস্তশিল্পসহ নানা ফ্যাশন অনুষঙ্গ। এসব অনুষঙ্গ ফ্রেন্ডশিপের বনানী ও গুলশানের শোরুমে পাবেন।

ডিজাইন ডেভেলপ থেকে পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত একটা বড় ভূমিকা পালন করতে হয়। এক কথায় বলা যায়, বেশ বড় একটা জার্নি। যেখানে ব্রেন স্ট্রেমিং থেকে কনসেপ্ট ডেভেলপ, রঙের ব্যবহার, প্যাটার্ন মোটিফ উন্নয়ন, কাঁচামাল উৎপাদন, সেলাই এবং মান নিশ্চিত করে ক্রেতার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা দুই ধরনের রং ব্যবহার করি। একটা প্রাকৃতিক রং আর একটা অ্যাজোফ্রি। অ্যাজোফ্রি আমরা তাকেই বলি যেখানে ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকে না। অর্থাৎ এ ধরনের রঙে ব্লিচ ও ক্ষতিকর নাইট্রোজেনের ব্যবহার একেবারেই করা হয় না। যেটা মানুষের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর নয়।

আবার পরিবেশসম্মত ও ত্বক উপযোগী পোশাক হাতে তৈরি করা হয়। যার জন্য সময় অপেক্ষাকৃত বেশি লাগে। এ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটা যেহেতু হাতে করা হয় কল-কারখানা ও মেশিনের সাহায্য ছাড়াই। লোকাল আর্টিজান এবং ইকো ফ্রেন্ডলিং ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয় । সুনিপুণ হস্তশিল্প যোগ হয়, যা কি না ফাস্ট ফ্যাশনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এজন্য এটাকে স্লো ফ্যাশন বা সাসটেইনেবল ফ্যাশন বলে থাকি। আজকাল মানুষ অনেক সচেতন। তবে এটা সত্যি যে ইউরোপের দেশগুলোতে স্লো ফ্যাশন বা সাসটেইনেবল ফ্যাশনের চাহিদা অনেক বেশি। আমাদের দেশের ক্রেতাদেরও পোশাক কেনা ও পরার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আমরা যদি সবাই সচেতন হই তবেই পৃথিবী অনেক সুন্দর হয়ে যাবে। আমাদের জীবনযাপনও অনেক সুন্দর হবে।

মডেল : রামিশা নিলা পোশাক : ফ্রেন্ডশিপ কালারস অব দ্য  চরস সাজ : শোভন মেকওভার

ছবি : আবুল কালাম আজাদ