দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি নিয়ে যত আলোচনা-সমালোচনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হয়েছে ততটা এর আগে দীর্ঘদিন দেখা যায়নি। এর বড় কারণ ছিল দফায় দফায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সেসবের প্রয়োগ ও কৌশল নিয়ে। একসময় ‘বহু নির্বাচনী প্রশ্ন’ পদ্ধতি আর ‘সৃজনশীল শিক্ষা’ পদ্ধতি নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা কিছু শেখার চাইতে পরীক্ষার্থী হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ থেকে বের হয়ে আসতে হলে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের উদ্দেশ্য, ধরন ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন শিক্ষাক্রমে এ বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব পরিবর্তনের প্রস্তাব এ মুহূর্তে বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
২০০৯ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীকে বছরের প্রথম দিনে উৎসবের মাধ্যমে বিনামূল্যের পাঠ্যবই দেওয়াটা সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। এবার বিষয়টি ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। কারণ, চলতি বছর রবিবার বই উৎসবের সঙ্গে দেশে যাত্রা শুরু করেছে নতুন কারিকুলাম। তবে এ বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলামের বই দেওয়া হবে। ২০২৪ সালে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণি এ শিক্ষাক্রমের আওতায় আসবে। ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণি যুক্ত হবে। ২০২৬ সালে একাদশ ও ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণি যুক্ত হবে। ফলে এ বছর থেকেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন বই নিয়ে উৎসাহ ও কৌতূহল আগের চেয়েও বেশি।
নতুন কারিকুলামে সামষ্টিক মূল্যায়নের চেয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের এত বেশি পরীক্ষায় বসতে হবে না। নতুন কারিকুলামের আওতায় ২০২৪ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিভাগ বিভাজন উঠে যাচ্ছে। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে ওঠার পর একজন শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ বেছে নিতে হবে না। একজন শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ই পড়তে হবে। তবে সব বিষয়েই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতে হবে না। আর যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরীক্ষা হবে সেখানেও কিছুটা অংশ থাকবে শিখনকালীন মূল্যায়ন আর কিছুটা অংশ থাকবে সমষ্টিক মূল্যায়ন। উন্নত দেশে বিভাগ নেই বটে, তবে একজন শিক্ষার্থী যে যে বিষয় পড়তে চায় সেই বিষয় নির্বাচনে প্রচুর বিকল্প থাকে। সেখানে সবাইকে একই সাবজেক্ট পড়তে বাধ্য করা হয় না। যে যেমন চায় সে সেই রকম বিষয় নির্বাচন করতে পারে। এছাড়া, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে যেসব বিষয়ে লিখিত মূল্যায়ন রাখা হয়নি ছাত্রছাত্রীরা কি সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পড়বে?
গত ১৪ বছর ধরে সৃজনশীল পদ্ধতিতে চলছে শিক্ষাব্যবস্থা। তবে খোদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, এখনো ৪১ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল বোঝেন না। এ অবস্থায় শিক্ষকদের নতুন কারিকুলাম সম্বন্ধে ধারণা দিতে মাত্র এক দিনের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আর জানুয়ারিতে সব শিক্ষককে সরাসরি নতুন কারিকুলামের ওপর মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু এতে শিক্ষকরা কতখানি প্রস্তুত হতে পারবেন তা নিয়ে সন্দিহান সংশ্লিষ্টরা। উপযুক্ত শিক্ষক ছাড়া উপযুক্ত শিক্ষা সম্ভব নয়। নতুন এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকাই হবে মুখ্য। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলকে তার দেশের বিচারক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা যখন সে দেশের সর্বোচ্চ বেতনভোগী শিক্ষকদের সমতুল্য বেতনের অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, ‘যারা আপনাদের শিক্ষাদান করেছেন, তাদের সঙ্গে কীভাবে আপনাদের তুলনা করি?’ জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো এবং শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) আদলে পৃথক কর্মকমিশন গঠন করা জরুরি দরকার। নতুন কারিকুলামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও। এক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা না রাখা এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যতটা সম্ভব পরীক্ষা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সারা বছরের শিখনকালের মূল্যায়ন ও বছরশেষের সামষ্টিক মূল্যায়নের পদ্ধতি প্রবর্তন অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। এতে সারা বছর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মনোযোগ বাড়বে বলে আশা করা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষাহীন শিক্ষার এই স্তর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করাটা বাঞ্ছনীয়। এছাড়া সাধারণ শিক্ষার এই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে দেশে বিদ্যমান মাদ্রাসা, কারিগরি ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য বিধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নইলে শিক্ষাক্রমের মধ্য দিয়ে যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে সেটা কমিয়ে আনা কোনোদিনই সম্ভব হবে না।