দফা প্রতিশ্রুতি আর প্রত্যাশার গোলকধাঁধা

দাবির সঙ্গে দফা আর ক্ষমতার সঙ্গে প্রতিশ্রুতি স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, আওয়ামী লীগের ৬ দফা, ৬৯-এর ১১ দফা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিন জোটের রূপরেখা জনগণের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা গড়ে তুলতে যেমন ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি আন্দোলনকেও বেগবান করেছে সে সময়। এখন আবার কেউ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, কেউ ‘রাষ্ট্র মেরামত’ করার কথা বলছেন, কিন্তু তারা নিজেদের স্মার্ট করা বা মেরামত করে বদলাতে চান কি না, গণতান্ত্রিক চরিত্র ও সংস্কৃতি অর্জন করতে চান কি না সেই প্রতিশ্রুতি খুব জোরের সঙ্গে দিচ্ছেন না।  

এরই মধ্যে আমাদের স্বাধীনতার বয়স ৫১ বছর পার হয়ে গেছে। কোন ক্ষেত্রে কতটুকু এগিয়েছি তা বর্ণনা করার মতো অনেক বিষয় আছে। যেমন অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। জিডিপি ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৮০ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু আয় ২৮২৪ ডলার হয়েছে। মানুষের গড় আয় ও আয়ু দুটোই বেড়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কর্মসংস্থান ও পদায়ন হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গ্রামের যে মেয়েরা কখনো ঘরের বাইরে আসেননি, তারা জীবনের চাপে ও জীবিকার টানে শুধু তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করছেন তা নয় জীবন ও সম্মানের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে মধ্যপ্রাচ্যেও যাচ্ছেন। প্রবাসী নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা বছরে ২৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। কৃষি গবেষণার উন্নতি হয়েছে। গবেষক ও কৃষকরা দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। ১ কোটি ১০ লাখ টন খাদ্য উৎপাদনকে ৪ কোটি টনে উন্নীত করেছেন। এ রকম বেশ কিছু নজির সৃষ্টি হয়েছে আবার শিক্ষা, চিকিৎসা নিয়ে ব্যাপক বাণিজ্য হচ্ছে, খরচের ৭০ শতাংশ জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে। কৃষক ব্যাপক শোষণের শিকার, দেশে বৈষম্য এখন চরম আকার নিয়েছে। এর কারণ রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন বা জনগণ যাদের হাতে তাদের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়েছে, তারা সাফল্য দেখাতে পারেননি। বরং দুর্নীতি ও লুটপাটের নতুন নতুন নজির স্থাপন করেছেন, বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের তীব্রতা বাড়িয়েছেন এবং রাজনীতিতে সুস্থধারা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

পুঁজি ও প্রযুক্তি কোনো দেশের সীমানা মানে না। যেখানেই মুনাফা আর বাজার সেখানেই ছুটে যাবে সে। ভাষা, ধর্ম, গায়ের রং নিয়ে যত বিরোধই থাক না কেন আর দূরত্ব যতই হোক না কেন সে হাজির হয়ে যাবে। সে কারণেই শিক্ষার গুণগত মানে পিছিয়ে থাকা দেশও অনেক আধুনিক যন্ত্র এবং অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশও তেমনি অ্যানালগ থেকে  ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। এখন আওয়াজ তোলা হচ্ছে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার। কিন্তু রাজনীতিটা পড়ে আছে ঢাল-সড়কি নিয়ে জমি দখলের মতো ভোটকেন্দ্র দখলের সেই পুরনো ধরনের মতোই। ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই সবকিছু আবর্তিত হয় বলে ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরা একে অপরকে শত্রু মনে করেন। পরস্পরকে অভিযুক্ত করেন দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে। একবারও ভাবেন না এ ধরনের অভিযোগের গুরুত্ব কত। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন কিন্তু গণতান্ত্রিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করার কোনো চেষ্টাই করেন না। রাজনীতির মাঠে ক্ষমতা দখলের যুদ্ধ হয় মাঝখানে পড়ে উলুখাগড়া জনগণ কখনো ক্ষমতার চাপে পিষ্ট হয় কখনো তাদের প্রাণ যায়।

এ রকম পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে দফা এবং রূপরেখার উল্লেখ হচ্ছে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে। বিএনপি ২৭ দফার ভূমিকায় বলছেÑবাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়া এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিয়াছিল, সেই রাষ্ট্রের মালিকানা আজ তাহাদের হাতে নাই। বর্তমান কর্র্তৃত্ববাদী সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রকাঠামোকে ভাঙিয়া চুরমার করিয়া ফেলিয়াছে। এই রাষ্ট্রকে মেরামত ও পুনর্গঠন করিতে হইবে। দেশের জনগণের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরাইয়া দেওয়ার লক্ষ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয়লাভের পর বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার হটানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের সমন্বয়ে একটি ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হইবে। উক্ত ‘জাতীয় সরকার’ নিম্নলিখিত রাষ্ট্র রূপান্তরমূলক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করিবে। 

বিএনপি নেতারা বলছেন, তাদের ১৯ দফা ও ভিশন ২০৩০-এর আলোকে এটি তৈরি করা হয়েছে। ফলে খুব বেশি নতুনত্ব না থাকলেও ‘রাষ্ট্র মেরামত’ কথাটি বেশ  আকর্ষণীয়। এসব কথা আকর্ষণ তৈরি করলেও ভরসা দেবে কতটুকু? কারণ অতীত ইতিহাস বলে বিরোধী দলে থাকতে রাজনীতিকরা গণতন্ত্র, সুশাসন ও সহিষ্ণুতার চর্চা নিয়ে অনেক কথা বললেও ক্ষমতায় গিয়ে তারা সেসব বেমালুম ভুলে যান। এবং তোমরা এই করেছো তাহলে আমরা করব না কেন? বরং বেশি করেই করব এবং মজাটা বুঝিয়ে দেব এই নীতিতে চলেন। এই মনোভাব বিএনপির জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য আওয়ামী লীগের জন্যও। 

সংসদের উচ্চকক্ষ চালু, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন, নির্বাচন কমিশন আইন সংশোধন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, দেশীয় জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান, ন্যায়পাল নিয়োগ, ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য কমানো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার বাজেট বৃদ্ধি, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের তালিকা তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এগুলোকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বলে মনে করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো মিলিয়ে দেখলে খুব বেশি পার্থক্য পাওয়া যাবে না। 

রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাবে বিএনপি যে ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ স্লোগানটি সংযুক্ত করেছে এবং দেশের ভূখণ্ডে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে যে অঙ্গীকার করেছে, সেটি তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলীয়ভাবে না করার কথা বলেছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের প্রস্তাবও তাদের দফায় আছে।

রূপরেখায় তারা রাষ্ট্রের নিয়মিত কাজ সম্পর্কে বলেছেন। যেমন : জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, অর্থপাচারের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা, গুম ও বিনা বিচারে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করা, বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা, স্বাস্থ্যবীমা চালু করা, চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো, শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি করা। বস্তুত এই রূপরেখায় একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিতে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি তেমন নতুন কিছুই নয়। আর কমিশন গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না সে দৃষ্টান্ত কম নয়। 

যেমন বিএনপির আমলেই দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও দেশে দুর্নীতি কমেনি, বরং বেড়েছে। এ ধরনের বিভিন্ন কমিশন রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। আর মেরামত করতে গেলে রাষ্ট্রের যে মৌলিক স্তম্ভগুলো রয়েছে, তা মেরামত ও শক্তিশালী করতে হবে। বলা হয়ে থাকে, আমাদের কনস্টিটিউশন এবং ইনস্টিটিউশনগুলো তার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। এগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা এবং পরিচালিত হয় তাদের মর্জিমাফিক। ফলে এই রাজনৈতিক পদ্ধতি বহাল থাকলে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, দুই কক্ষের সংসদ গঠন, দুবারের বেশি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী না হওয়া রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে না বা জনগণের ক্ষমতায়ন হবে না তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

অন্যদিকে হুজুগ উঠছে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার আওয়াজ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে চারটি ভিত্তি স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটির কথা বলেছেন। তার কথা অনুযায়ী সবাই স্মার্ট হবে। সবাই প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা’ সবকিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে। ই-এডুকেশন, ই-হেলথসহ সবকিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে। তারপর তিনি পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, বিশ্বমানের স্মার্ট পুলিশ গড়ে তোলা হবে। 

এত দিন ছিল ‘ডিজিটাল কৃতিত্ব আর আনন্দ’। গণতন্ত্র এবং জবাবদিহি না থাকলে যন্ত্রের সুফল কে পায় সেই শিক্ষা এবং ডিজিটাল হওয়ার বাণিজ্যিক দিক আর নিপীড়নের ঘটনা জনগণ দেখছে। কীভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়, নজরদারি বাড়ানো যায় আর বিরোধী মত দমন করা যায় তা যেমন দেখা গেছে, তেমনি নিরীহ সংখ্যালঘুদের হয়রানি, মিথ্যা ঘটনায় ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়ানো এবং সেজন্য দায়ীদের শাস্তি না হওয়ার উদাহরণ প্রচুর। কারণ সমাজে ডিজিটালাইজেশন হয়েছে কিন্তু ডেমোক্রেটাইজেশন হয়নি। আধুনিক হওয়ার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নাকচ করা যায় না। কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে আলোচনা ও সতর্কতা না থাকলে চটকদার কথা ও চমক লাগানো যন্ত্র দিয়ে যে মানুষের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি আনা যায় না সেটা তো প্রমাণিত। নাগরিকদের সম্মতিভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্রের রীতিনীতি ও গণতান্ত্রিক আইনের শাসন ছাড়া স্মার্ট পুলিশ ও স্মার্ট নগরের যেসব উদাহরণ আছে তাতে স্মার্ট দেশের চেহারাটা আশার চেয়ে আতঙ্ক জাগায় বেশি। 

বাম গণতান্ত্রিক জোটও তাদের দাবি উত্থাপন করেছে। তাদের দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জবাবদিহি আনতে হবে সব ক্ষেত্রে। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচিত হওয়ার পরে সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বাড়াতে হবে, দলনিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে আর সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করতে হবে। 

আমরা স্মার্ট হতে চাই কিন্তু মানবিক বোধগুলো হারিয়ে ফেললে ভয়ংকর দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে যাব। রাজনীতি জনগণকে শেখায়। সেই শিক্ষা থেকে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, রাজনীতিতে যদি যুক্তির চেয়ে কৌশল প্রধান হয়, ক্ষমতা যদি দখল আর দমন করার ক্ষমতা হয় তাহলে জনগণের দফা আর দাবি কখনো পূরণ হবে না।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

rratan.spb@gmail.com