দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন

আ.লীগের ভাবনায় ২০১৪ মডেল

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি যে অনড় অবস্থানে ছিল, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সেই পরিস্থিতি এখন রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বয়কট করে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল বিএনপি। তখনো নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ছিল দলটির। এবার বিএনপির অবস্থান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। সেবারও সংবিধানের বাইরে গিয়ে বিএনপির দাবি মানতে চায়নি আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনের বছরখানেক বাকি থাকতেই আওয়ামী লীগ সেই আগের অবস্থানই বারবার জানিয়ে আসছে।

আওয়ামী লীগের অবস্থান যেকোনো মূল্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। ২০১৪ সালেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যেকোনো মূল্যে নির্বাচন করা ও নির্বাচন ঠেকানোর অনড় অবস্থানে চলে গিয়েছিল। ওই সময় ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনার পরও আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় থেকেছে। অন্যদিকে বিএনপি বিরোধী দল থেকে ছিটকে দেশের তিন নম্বর দলে জায়গা পেয়েছে।

বিভিন্ন মহলও মনে করছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে উভয় দলের নেতাদের মাঠের বক্তব্য ২০১৪ সালের অনড় অবস্থানের জানান দিচ্ছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে সারাংশ দাঁড়ায় বিএনপির নির্বাচন ঠেকানোর ষড়যন্ত্রের কথাই ইঙ্গিত করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। দুই দলের পরস্পরবিরোধী এই অবস্থান ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সংঘাতময় পরিস্থিতি ডেকে আনবে কিনা এই প্রশ্নও উঠছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মহল এগিয়ে এলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে বিএনপি ও দূতিয়ালি করা আন্তর্জাতিক মহল ধরাশায়ী হয়। তখনকার জাতিসংঘের বিশেষ দূত তারানকো ফার্নান্দেজ আওয়ামী লীগ-বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন সেসময়। সেই বৈঠকে সংবিধান রক্ষার নির্বাচন করার কথা বলে দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়। সেই নির্বাচনের পরে ছয় মাসের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে এবং সহিংস আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। ফলে ছয় মাসের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার অঙ্গীকার আওয়ামী লীগও রাখেনি। দশম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই ১৫৩ আসনে জয়ী হয়ে যান আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। দুর্বল ওই নির্বাচন করেও ৫ বছর সরকার টেনে নিয়ে যাওয়ার সফলতা দেখান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপেও যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাই তারানকোর সঙ্গে অলিখিত ওই সন্ধি না মানলেও আওয়ামী লীগকে সরকার পরিচালনায় তেমন বেগ পেতে হয়নি। ফলে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ভোটের সময় বিএনপির কোনো প্রার্থী মাঠে দাঁড়াতে পারেননি। যদিও বিএনপি ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ তুলে ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানায়। কিন্তু এরপর তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ দেয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রথম সোয়া তিন বছর মাঠেই পাওয়া যায়নি বিএনপিকে। তবে গত বছরের মাঝামাঝিতে এসে বিএনপি মাঠে নামতে শুরু করে। ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করতে থাকলেও গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে তাদের ওপর দমন- পীড়নের কৌশল গ্রহণ করে সরকার। পাশাপাশি বিএনপিকে মোকাবিলা করতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীরা মাঠে অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে খানিকটা পিছু হটে বিএনপিকে ওই সমাবেশ করতে হয় গোলাপবাগ মাঠে গিয়ে। পরদিন দলটির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেন। কিন্তু পদত্যাগীদের মধ্যে উকিল আবদুস সাত্তার আবার উপনির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে।

রাজনীতি নিয়ে মাঠে দাঁড়াতে না পারলেও গত ৪ বছর বিএনপি বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে লবিস্ট নিয়োগ করার পাশাপাশি কূটনৈতিক রাজনীতিতে জোর দেয়। এক পর্যায়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে বিএনপির রাজনীতি ধীরে ধীরে মাঠে সরব হচ্ছে। তারা ২০১৪ সালের মডেলে আন্দোলন করার এক রকম সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে জানিয়ে ওই সূত্রগুলো আরও জানায়, বিএনপি সরকার ফেলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে এবং আগামী নির্বাচন ঠেকাতে পারবে বলে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।

এই প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় দুই দলের অবস্থান ২০১৪ সালের অবস্থানের মতোই মনে হচ্ছে। তবে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই ২০১৪ সালের মতো দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারবে এমনটা তারা মনে করেন না। তারা মনে করেন, গত ১০ বছরে রাজনীতি বদলেছে, মানুষের বোধবুদ্ধিতে পরিবর্তন এসেছে। তা ছাড়া বিদেশিরা গভীরভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নজর রাখছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, করোনা মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে রেখেছে। তাই দেশের রাজনীতি অস্থির করে তোলার পরিণাম করোর জন্যই সুখকর হবে না। এসব দিক থেকে দুদলকেই এখনকার অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে, সেটা হতে পারে নতুন বছরের মাঝামাঝিতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দল ও তাদের জোটসঙ্গীরা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে বাধ্য হবেন। তবে সেটা পর্দার আড়ালে গিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ বিএনপির অবস্থান পরস্পরবিরোধী। যেকোনো মূল্যে দাবি আদায় করা যেমন অসম্ভব, তেমনি দমনপীড়ন করে ক্ষমতায় টিকে থাকাও সম্ভব নয়। তিনি বলেন, রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে অনেক সমস্যার সমাধান হয়, এখানেও তা হতে পারে, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতা দখলের মানসিকতা ও ক্ষমতা দখল করে রাখার রাজনীতিটাই শিখেছে বিএনপি। জনগণের কীসে ভালো, কীসে শান্তি সেটা তাদের রাজনীতির লক্ষ্য নয়। ফলে আগুন সন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে তারা। ষড়যন্ত্র করে নির্বাচন ঠেকানোর চক্রান্তও রয়েছে বিএনপির মধ্যে।’ তিনি বলেন, বিএনপির সকল অপরাজনীতি জ্বালাওপোড়াও আন্দোলন দমন করে সঠিক সময়ে সংবিধানসম্মতভাবেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হবে।

দলের অপর সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি ২০১৪ সালে ধ্বংসাত্মক রাজনীতির ধারায় যাচ্ছে। নির্বাচনকেন্দ্রে আগুন দেওয়া, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে মানুষ মেরেও নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। এবারও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন করার মতো সাংগঠনিক শক্ত ভিত্তি আওয়ামী লীগের আছে, প্রশাসনিক সমর্থনও থাকবে সরকারের দিকে। ফলে ২০১৪ সালের ফর্মুলায় গেলে বিএনপি আবার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

কিন্তু বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, দলটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোরদারে মনোযোগ দিয়েছে। এই লড়াইয়ে মিত্রের সংখ্যা বাড়াচ্ছে তারা। সরকারবিরোধী সব দলকে সঙ্গে নিয়ে চলমান আন্দোলনকে চূড়ান্ত সফলতায় নিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প তাদের হাতে নেই। আন্দোলন দমাতে সরকার আরও কঠোর হবে এতে সন্দেহ নেই। এমনটা ধরে নিয়েই তারা মাঠে থাকতে চায়। কারণ তারা জানে, এবারের আন্দোলনে ব্যর্থ হলে নেতাকর্মীদের চরম মাশুল দিতে হতে পারে। রাজনৈতিক ময়দানে টিকে থাকাই হবে কঠিন। তাই ২০১৪ সালের মতো আন্দোলন করতে হলেও তারা পিছপা হবে না।

বিএনপি ঘোষিত ১০ দফার প্রধান দাবি হচ্ছে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। এই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারলে সংবিধানে নিরপেক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কীভাবে অর্জিত হবে? সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করেনি দলটি। তবে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, এমনটি হলে ১৯৯১ সালে যে অবস্থা তৈরি হয়েছিল সেই আলোকে এবারও ব্যবস্থা হবে।

জানা গেছে, ১১ জানুয়ারি সব বিভাগীয় শহরে চার ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। বিশেষ কোনো পরিস্থিতি না হলে কোনোভাবেই দলটি এখন হরতাল অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যাবে না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কয়েক মাস আগ থেকেই আন্দোলনের গতি বাড়ানো হবে। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে সরকার একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেই চূড়ান্ত আন্দোলনে নামবে তারা। ১০ দফা তখন এক দফায় পরিণত হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের দাবি মেনে নেয়, তাহলে এই সংসদেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নিরপেক্ষ সরকারের একটি ফর্মুলা পাস করতে পারে। এটা ৫ মিনিটের ব্যাপার। কিন্তু তারা যদি আমাদের দাবি মেনে না নেয়, তাহলে সরকার পতনের আন্দোলনের বিকল্প পথ থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের মতো একতরফা নির্বাচন সরকার করতে চাইলে এক দফার আন্দোলন ঘোষণা করা হবে। আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।’

কীভাবে সেই নির্বাচন হবে তার উদাহরণ রয়েছে জানিয়ে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ’৯১ সালেও এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি। আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, একটি নিরপেক্ষ সরকার তিন মাস দায়িত্ব পালন করে নির্বাচন শেষে বিদায় নিয়েছে। পরের নির্বাচিত সরকার সেই সরকারের সকল কার্যক্রমের বৈধতা দিয়েছে।

সরকার যদি ২০১৪ সালের মতো নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বলে আলোচনার প্রস্তাব দেয়, তাহলে বিএনপির অবস্থান কী হবে এমন প্রশ্নে দলটির এই নীতিনির্ধারক বলেন, আমরা আলোচনার প্রস্তাব এখনো পাইনি। পেলে কী করব সেটা পরের ব্যাপার। কিন্তু তারা যে কথা দিয়ে কথা রাখে না সেটা তো প্রমাণিত।’