দেশে গত বছর সড়কে ৬ হাজার ৮২৯টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৭১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৬১ জন নারী ও ১ হাজার ১৪৩ শিশু রয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬১৫ জন। বছরজুড়ে ২ হাজার ৯৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩ হাজার ৯১ জন; যা মোট নিহতের ৪০ দশমিক ০৭ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বলে এ সময় জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৬২৭ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২১ দশমিক ০৯ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছে ১ হাজার ৬৪৮ জন বা ২১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ সময় ১৯৭টি নৌ দুর্ঘটনায় ৩১৯ জন নিহত, ৭৩ জন আহত এবং ৯২ জন নিখোঁজ রয়েছে। ৩৫৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৩২৬ জন নিহত এবং ১১৩ জন আহত হয়েছে।
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ৩ হাজার ৯১ জন (৪০ দশমিক ০৭ শতাংশ), বাসযাত্রী ৪২৭ জন (৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ), ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি আরোহী ৪৫৩ জন (৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ), প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স-জিপের যাত্রী ২৬৮ জন (৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ), থ্রি-হুইলারের যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজিচালিত অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পো-লেগুনা) ১ হাজার ২৪৮ জন (১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ৩৯৩ জন (৫ দশমিক ০৯ শতাংশ) এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান আরোহী ২০৬ জন (২ দশমিক ৬৭ শতাংশ) নিহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৫৯৬টি (৩৮ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ২ হাজার ২০৫টি (৩২ দশমিক ২৮ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ১ হাজার ১৮২টি (১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে, ৭৮৪টি (১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং ৬২টি (শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ) অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৩৩১টি (১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২ হাজার ৮৯২টি (৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১ হাজার ৬৪৮টি (২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ) পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া, ৭৮৫টি (১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৭৩টি (২ দশমিক ৫৩ শতাংশ) অন্যান্য কারণে ঘটেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনার জন্য ১০টি কারণকে চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি ও গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
দুর্ঘটনা রোধে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়ানোসহ ১০টি সুপারিশও তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে। অন্যগুলো হচ্ছে :
চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা; বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি; পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা (সার্ভিস লেন) তৈরি, পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌপথ সংস্কার করে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন এবং ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান সিদ্দিকী, অধ্যাপক হাসিনা বেগমসহ অন্যরা।