ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে আদালতের স্ব-প্রণোদিত আদেশ

মেহেরপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম আদালতের বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহ গত ৭ জানুয়ারি জেলার ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে স্ব-প্রণোদিত আদেশ জারি করেছেন। আদেশে অবৈধ ভাটাগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে আগামী ২৩ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিশেষ পুলিশ সুপার, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুষ্টিয়া এবং উপপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, কুষ্টিয়াকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মেহেরপুরে ইটভাটার জন্য বহন করা মাটি পড়ে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলার বিভিন্ন সড়ক, যা সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওই মাটি সরকারি নতুন রাস্তাগুলোকে খুব দ্রুত চলাচলের অনুপযুক্ত করে দিচ্ছে। এছাড়া, অবৈধ ইটভাটার অস্তিত্ব পরিবেশকে হুমকিতে ফেলছে বলে এগুলো বন্ধে বিচারক এ আদেশ জারি করেছেন।

এছাড়া, ইটভাটার মাটি পড়ায় সড়কে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি ও চলাচলকারীদের জন্য জীবনের হুমকি বিবেচনা করে বিষয়টিকে দ-বিধির ২৯০ ও ৪৩১ ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে আদালত। সেই সঙ্গে জেলায় ১০৩টি ইটভাটার মধ্যে অধিকাংশ লাইসেন্সবিহীন, অবৈধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা সংলগ্ন হওয়ার বিষয়টি ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এর ধারা ৪ ও ৮ এর লঙ্ঘন এবং উক্ত আইনের ধারা ১৪ ও ১৮ অনুযায়ী অর্থদ- ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এ আদেশ দিয়েছে আদালত।

আদেশে পিবিআইকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নয় এমন কর্মকর্তা দ্বারা সুষ্ঠু তদন্ত ও অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, পরিবেশ অধিপ্তরের নিয়মের তোয়াক্কা না করে মেহেরপুরে যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপন এবং ইটভাটার মাটিতে সড়ককে পিচ্ছিল করে ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংবাদপত্রে এবং টেলিভিশনে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কিছুতেই থামছে না ইটভাটা স্থাপনের নামে এই দুর্বৃত্তায়ন। ফলে, প্রতি বছর সামান্য কুয়াশা কিংবা বৃষ্টিতে ইটভাটার মাটি পড়ে রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। বেড়ে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। আবার সড়কের পাশে এবং শহরের মধ্যে ইটভাটা করে যেমন পরিবেশ দূষণ করছে, তেমনি আবাদি জমির মধ্যে ভাটা করে আশপাশের ফসলি জমির ফসলহানিসহ বিস্তীর্ণ আবাদি জমির ক্ষতি করছে। সেই সঙ্গে ইটভাটায় প্রতিদিন দেদার শত শত টন কাঠ পুড়িয়ে বৃক্ষ সম্পদকে উজাড় করা হচ্ছে। ফিক্টস ভাটা বন্ধ এবং অবৈধ ইটভাটা স্থাপনে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরও মেহেরপুরে ৯৯ ভাগ ইটভাটা এখনো চলছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, প্রতিবারের মতো এবারও শুরু হয়েছে ইটভাটার কার্যক্রম। ফলে, বিস্তীর্ণ জমি ধ্বংস করে প্রধান উপকরণ মাটি কেনাবেচা এখন তুঙ্গে। ভাটা মালিকরা জমির উপরিঅংশ (কৃষিজমির টপ সয়েল) কিনে নিয়ে জমির উর্বরাশক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কেউবা সরকারি পুকুর কিংবা মৎস্য বিলের মাটি পাচার করে সেই মাটি ইটভাটায় বিক্রি করে জলাশয় ধ্বংস করছে।

ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুজ্জামান আতু ইটভাটার মাটিতে রাস্তার ক্ষতি প্রসঙ্গ স্বীকার করে বলেন, আমরা বিষয়টি দেখেছি। প্রতিটি ভাটা মালিককে স্ব-এলাকা পরিষ্কার করতে বলেছি।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড. মনসুর আলম খান বলেন, এই ধরনের খবর পেলেই ঘটনাস্থলে মোবাইল কোর্ট পাঠানো হচ্ছে। ভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, মেহেরপুরে একটি ইটভাটা ছাড়া সবই অবৈধ। কোনো ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই।