সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে গতকাল বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ ১০টি সাংগঠনিক বিভাগে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। এই কর্মসূচি থেকে আগামী ১৬ জানুয়ারি সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সারা দেশে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করা হলেও ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। এ ছাড়া ফরিদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির গণঅবস্থানে হামলা এবং এতে অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন দলটির নেতারা।
রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি পুরনো রাজনৈতিক দল। কিন্তু তারা আজকে সম্পূর্ণভাবে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সেজন্য এখন তাদের পুলিশ ও আমলাদের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতাকে জোর করে দখল করে রাখতে হচ্ছে। তবে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীল সমাজ, সাধারণ জনগণ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হচ্ছে।’
নয়াপল্টনে গণঅবস্থান কর্মসূচি সফল করতে সকাল ১০টার দিকে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলা থেকে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা খ- খ- মিছিল নিয়ে কার্যালয়ের সামনে সমবেত হতে থাকেন। সড়কের একপাশে পলিথিন ও মাদুর বিছিয়ে নেতাকর্মীরা সেখানে অবস্থান নেন। কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসা নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে বিএনপি কার্যালয় থেকে পূর্ব দিকে ফকিরাপুল ও পশ্চিম দিকে নাইটিংগেল মোড় ছাড়িয়ে যায়। তাদের হাতে ছিল কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি চেয়ে ব্যানার, ফেস্টুন, জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা। কর্মসূচির শুরুতেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) উদ্যোগে দলীয় সংগীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গান পরিবেশন করা হয়। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় গণ-অবস্থান ও সমাবেশের কারণে বিএনপি মহাসচিব তার বক্তব্যে বলেন, ‘গণ-অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন শুরু হয়েছে। আজকে নয়, এই আন্দোলন শুরু হয়েছে যখন এ সরকার বেআইনিভাবে দুই-দুইবার ভোটব্যবস্থাকে ধ্বংস করে জোর করে ক্ষমতায় বসে আছে।’
তিনি দাবি করে বলেন, ‘সরকার জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ একটা দেউলিয়া রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। আর এই সরকার সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিপরায়ণ, জনবিচ্ছিন্ন ও নির্যাতনকারী সরকার হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতাকে দখল করে রেখেছে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সাধারণ মানুষ আজ বলছে, তারা আর পারে না। চাল কিনতে পারে না। খাদ্য কিনতে পারে না। ওয়াসার এমডি আমেরিকায় ১৪টি বাড়ি কিনেছেন। তিনি কত হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। আজকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তারা সব ব্যাংক লুটে ফোকলা করে দিয়েছে। সরকার লুটের রাজ্য গড়ে তুলেছে।’
চলমান এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন নিহত হয়েছে জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ফরিদপুরে যে গণ-অবস্থান কর্মসূচি চলছিল, সেখানে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা হামলা করে সেই মিটিং প- করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। পুলিশ গুলি চালিয়েছে, অনেক লোক আহত হয়েছে। আর ময়মনসিংহে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা করেছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘জেলখানায় জায়গা নেই। আজ সারা দেশ জেলখানায় পরিণত হয়েছে। আমরা কাউকে ধাক্কা কিংবা টোকা দিয়ে ফেলব না। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো হবে। আমরা সাংঘর্ষিক কর্মকা-ে বিশ্বাস করি না। জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অবস্থান কর্মসূচি পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক ও রফিকুল আলম মজনু। আরও বক্তব্য দেন ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, ডা. জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমান উল্লাহ আমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ প্রমুখ।
এ ছাড়া আরামবাগে ইডেন কমপ্লেক্সে গণফোরাম, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গণতন্ত্র মঞ্চ এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের পূর্বপ্রান্তে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, বিলুপ্ত ২০-দলীয় জোটের শরিকদের নিয়ে গঠিত ১২ দলীয় জোট বিজয় নগরে পানির ট্যাংকের কাছে, সমমনা জাতীয়তাবাদী জোট পুরানা পল্টনে এবং এলডিপি কাওরান বাজারে এই কর্মসূচি পালন করেছে।
সরকারের পদত্যাগ, একাদশ সংসদ বিলুপ্ত, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ ১০ দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে যে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে, এটি ছিল তার দ্বিতীয় কর্মসূচি।