শতবর্ষে ‘ইউলিসিস’ ফিরে দেখা জয়েস

আজ ১৩ জানুয়ারি জেমস জয়েসের প্রয়াণ দিবস, তিনি জন্মেছিলেন ২ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮২ সালে। তার মৃত্যুর বছর ১৯৪১, যে হিসাবে তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র ৫৯ বছর। এই নাতিদীর্ঘ জীবনে তিনি লিখেছিলেন কম, কিন্তু ১৯০৪ সালে প্রথম লেখা গল্প সংকলন ‘ডাব্লিনার্স’ লিখেই তিনি সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং চরিত্র বিশ্লেষণের জন্য। তার পরবর্তী উপন্যাস, ‘এ পোর্ট্রটে অব দি আর্টিস্ট এস এ ইয়াং ম্যান’ (১৯১৬) ছিল আত্মজৈবনিক, যা কথাশিল্পী হিসেবে তার খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯১৫ থেকে শুরু করে (এর বীজ রোপিত হয় ১৯০৫ সালে) ১৯২২ সালে শেষ করা ‘ইউলিসিস’ উপন্যাস শুধু বিশাল কলেবরের ছিল না, হয়েছিল বিতর্কিত, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে নিষিদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্ব সাহিত্যে কালজয়ী। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর গত বছর, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ইউলিসিস’ উপন্যাস প্রকাশনার একশ বছর পূর্তি হয়েছে। এ উপলক্ষে পৃথিবীর প্রায় সব দেশে সাহিত্যের পাঠক, শিক্ষক, ছাত্র এবং সমালোচকরা আলোচনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বইটির প্রতি তাদের নিরবচ্ছিন্ন আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। এর একটাই কারণ : ‘ইউলিসিস’ বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস যা কথাসাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে এবং ন্যারেটিভকে মডার্নিজমের উৎকর্ষে পৌঁছে দিয়ে পোস্ট-মডার্নিজমে উত্তরণের পথ প্রশস্ত করেছে।

ভাষা এবং আঙ্গিকের জটিলতার জন্য বইটি সহজপাঠ্য নয়, যদি না ব্যাখ্যামূলক বইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়। তারপরও জনপ্রিয় বলতে যা বোঝায়, সেই শ্রেণির বইয়ের মধ্যে পরিগণিত হবে না এই বই। সাধারণত বটেই, পরিশ্রমী এবং মনোযোগী পাঠকের জন্যও বইটি চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে, যেমন হয়ে এসেছে এতকাল। যেহেতু ইউলিসিস পাঠ একটা চ্যালেঞ্জ, সে জন্য, অনেকে না হলেও, সম্মানজনক সংখ্যার পাঠক এই বই পড়বে, যতদিন কথাসাহিত্যের দিন শেষ না হয়। আর এটা তো আপ্তবাক্য হয়ে গিয়েছে যে, The death of novel has been exaggerated. ইউলিসিস বই আকারে বের হওয়ার আগে, ১৯১৯ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দি ইগোইস্ট’ পত্রিকায় কয়েক কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। এর সম্পাদিকা ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক হ্যারিয়েট উইভার, যিনি জয়েসের লেখার ভক্ত হিসেবে তাকে মাঝেমধ্যেই সাহায্য করে অর্থ সংকট থেকে রক্ষা করেছেন। তার পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর ছাপাখানার মালিক এবং পত্রিকার বেশ কিছু পাঠক প্রতিবাদ জানায়। এর ফলে হ্যারিয়েট উইভারকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রায় একই সময়ে, ১৯১৮ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত, ‘ইউলিসিস’ ধারাবাহিকভাবে নিউইয়র্ক থেকে ‘দ্য লিটল রিভিউ’ পত্রিকায় বের হচ্ছিল। চার কিস্তি বের হওয়ার পর অশ্লীলতার অভিযোগে কোর্টের আদেশে পত্রিকার সব কপি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং সম্পাদকদ্বয় ফৌজদারি মামলার আসামি হোন। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে বইটির আর কোনো অংশ ছাপা যাবে না মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। দায়ের করা মামলার রায় বের হয় ১৯৩৩ সালে, ১৩ বছর পর। নিউইয়র্কের ফেডারেল কোর্টের বিচারক, জন উলসে তার রায়ে ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলেন, বইটি An amazing tour de force, which, on account of its style and and literary ambition could not be considered obscene. তিনি আরও যোগ করেন, Ulysses is a sincere and serious attempt to devise a new literary method for the observation and description of mankind. উপসংহারে তিনি বলেন, While the effect of of Ulysses is in places somewhat emetic, nowhere does it tend to be an aphrodisiac. তার এ রায় আপিল বিভাগের দুজন বিচারক সমর্থন করেন। বিচারক লার্নেড হ্যান্ড তার রায়ে বলেনthe offending passages are clearly necessary to the epic of the soul as Joyce conceived it নিউইয়র্ক আদালতে মামলা শুরু হওয়ার পর প্রথম সারির আমেরিকান ঔপন্যাসিক, জন ডস প্যাসজ এবং এফ স্কট ফিটজেরাল্ড উপন্যাসটির পক্ষে মত দিয়ে বলেন, it is a modern classic in every sense of the word নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৯৩৪ সাল থেকে আমেরিকায় ‘ইউলিসিস’ বৈধভাবে বইয়ের আকারে ছাপা হয়ে বের হয়। ইংল্যান্ডে বইটির ছাপা শুরু হয় এর দুই বছর পর, ১৯৩৬ সালে। কিন্তু জয়েসের নিজ দেশ, আয়ারল্যান্ডে বইটি নিষিদ্ধ না হলেও ছাপা হয়ে বের হতে সময় নেয় আরও এক যুগ। এর পেছনে ছিল ক্যাথলিক চার্চের নীরব নেতিবাচক ভূমিকা।

আমরা সময়ের দিক থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছি। এখন ফেরা যাক ১৯২০ সালে প্যারিস শহরে, যেখানে এজরা পাউন্ডের পরামর্শে জয়েস সপরিবারে বাস করছিলেন। ‘ইগোইস্ট’ এবং ‘দি লিটল রিভিউ’ পত্রিকায় বইটি ছাপা বন্ধ এবং অশ্লীলতার জন্য মামলা শুরু হওয়ার পর কোনো প্রকাশক ছাপানোর সাহস দেখায়নি। তখন প্যারিসের লেফট ব্যানকে অবস্থিত ‘শেকসপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি’র প্রতিষ্ঠাতা-মালিক, মার্কিন নারী সিলভিয়া বিচ এগিয়ে আসেন প্রকাশক হিসেবে, যদিও এর আগে দোকানে বই বিক্রি ছাড়া প্রকাশনায় হাত দেননি তিনি। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৯২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি (জয়েসের জন্মদিন) ইউলিসিস বইয়ের আকারে দিনের আলো দেখতে পায়। কিন্তু বইটি বিতর্কিত হওয়ার জন্য ‘জনপ্রিয়’ হলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় বিক্রি করার উপায় ছিল না। চোরাই পথে (শেকসপিয়ারের নাটকের প্রচ্ছদ ব্যবহার করে) পাঠাবার চেষ্টা করা হলেও তা ধরা পড়ে যায়। বন্দরেই ব্রিটিশ শুল্ক বিভাগ এবং আমেরিকার পোস্ট অফিস কর্তৃপক্ষ সব কপি বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে ফেলে। জয়েসের চরম আর্থিক সংকটের সময় তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন হ্যারিয়েট উইভার।

‘ইউলিসিস’ উপন্যাস বইয়ের আকারে বের হওয়ার আগেই জয়েস অকুণ্ঠ প্রশংসা এবং প্রবল সমর্থন পেয়েছিলেন আধুনিকতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত এজরা পাউন্ডের কাছ থেকে, যার স্লোগান ছিল make it new আধুনিকতার আরেক পথিকৃত টিএস এলিয়ট ইউলিসিস বের হওয়ার পর লিখলেন,  instead of the narrative method we may now use the mythical method. তিনি এও বললেন যে, ‘ইউলিসিস’ বের হওয়ার পর গতানুতিক উপন্যাস লেখা বন্ধ হয়ে যাবে।

ডাব্লিউবি ইয়েটস প্রথমে বইটির সমালোচনা করলেও পরে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন তিনি বইটির গভীরতা (capacity) বুঝতে পারেননি। তিনি উপন্যাসে যে ‘heroic quality’ বিধৃত, তার প্রশংসা করেন।

ইংল্যান্ডে বা আমেরিকায় ‘ইউলিসিস’ নিষিদ্ধ হলেও সিলভিয়া বিচের দোকান থেকে কিনে যারা পড়েছে এবং সামান্য বুঝতে পেরেছে, তাদের উৎসাহে ১৯২৪ সাল থেকে প্রতি বছর ১৬ জুন তারিখে ব্লুমস ডে উদযাপিত হতে থাকে। এ বিষয়টি জয়েস এক চিঠিতে লিখে তার শুভার্থী কহ্যারিয়েট উইভারকে জানান। প্রথম দিকে এদিনটি পালনের উদ্দেশ্য ছিল ‘ইউলিসিস’ পাঠের জন্য উৎসাহী গোষ্ঠী গড়ে তোলা। ক্রমে এই দিনের উদযাপনে ভৌগোলিক পরিধি এবং কর্মসূচির বিস্তার লাভ ঘটে। ১৯৫৪ সালে, জয়েসের মৃত্যুর এক যুগ পর, ব্লুমস ডের ৫০তম বার্ষিকীতে ডাবলিন শহরে সারা দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যার মধ্যে ছিল সেসব রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং পানশালায় গিয়ে পান করা যেখানে ইউলিসিসের চরিত্ররা ১৯০৪ সালের ১৬ জুন হেঁটেছিল এবং পান করেছিল। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহরে প্রতি বছর ১৬ জুন যেভাবে ব্লুমস ডে উদযাপিত হয় তার মধ্যে রয়েছে ইউলিসিস উপন্যাস থেকে পাঠ এবং বিভিন্ন দৃশ্যের অভিনয়। এ দিনের উদযাপনে রাস্তায় যারা হাঁটে তারা উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের উপযুক্ত পোশাক পরিহিত হয়ে তাদের ভূমিকা পালন করে। ২০২২ সালের ১৬ জুন ডাবলিনে ব্লুমস ডে ছিল রাস্তাঘাটে লোকে লোকারণ্য আর পুরো শহর ছিল উৎসবমূখর। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয় শতবর্ষের ব্লুমস ডে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে ইউলিসিস ভক্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, কেননা তখন সেই বই প্রায় সব দোকানেই পাওয়া যায়। বইটির দুর্বোধ্যতা ভেদ করার জন্য ব্যাখ্যা দিয়ে কেউ কেউ বই লেখেন। ক্রমেই ইউলিসিস নিয়ে লেখা ব্যাপক হতে থাকে এবং একপর্যায়ে এসে এটি ‘ইন্ডাস্ট্রিতে’ পরিণত হয়। ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিভাগের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে ‘ইউলিসিস’ নিয়ে লেখালেখি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এখন এমন অনেক অধ্যাপক আছেন যারা শুধু ইউলিসিস পড়ান এবং সেই জন্য ‘জয়েস স্কলার’ হিসেবে পরিচিত। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং আমেরিকার প্রায় প্রতিটি বড় বইয়ের দোকানে শুধু ইউলিসিস উপন্যাস নয়, তার ওপর লেখা টীকাভাষ্য, ব্যাখ্যামূলক লেখা ইত্যাদি পাঠক সহায়ক সব ধরনের বই পাওয়া যায়। এসব বইয়ের সাহায্য নিয়ে পড়লে ইউলিসিস পাঠ অনেকটাই সহজ মনে হয়। আর কোনো উপন্যাসের ওপর এমন বিপুলসংখ্যক বইপত্র বের হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত নেই। আমাজনের মতো ঘরে বই পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান বাজারে আসায় ইউলিসিসসংক্রান্ত বই কিনতে বইয়ের দোকানে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে খ্যাতিমান জয়েস স্কলারদের কথা শোনার জন্য ইউটিউবে বা গুগল সার্চ করলেই যখন খুশি তাদের কথা শোনা যায়। ইউলিসিসের শতবার্ষিকী উপলক্ষে অনলাইনে এ বইয়ের অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা শোনার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে।

২০০৪ সালে ব্লুমস ডের শতবার্ষিকী উপলক্ষে ডাবলিন শহরে পাঁচ মাসব্যাপী এক উৎসবের আয়োজন করা হয়। প্রতিদিন ভোরে অংশগ্রহণকারীদের বিনামূল্যে আইরিশ প্রাতরাশ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

জয়েস কেন উপন্যাসটি ১৯০৪ সালের ১৬ তারিখে শুরু এবং শেষ করেন? এর কারণ শুনলে তিনি যে খুবই সেন্টিমেন্টাল এবং রোমান্টিক প্রবণতার মানুষ ছিলেন তা বোঝা যাবে। এদিনটিতেই তিনি প্রথমবার তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গিনী নোরা বারনাকলের সঙ্গে ডেটিং করেন এবং একত্রে সময় কাটান। ১৯০৫ সালে তারা দুজন ডাবলিন ছেড়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ইউরোপে চলে যান। ২৭ বছর একসঙ্গে থাকা এবং পুত্র-কন্যার জন্মের পর তাদের বিয়ে হয়, তাও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নয়, আদালতে সিভিল ম্যারেজ।

১৯৩৪ সালের ২৯ জানুয়ারি সংখ্যায় তাদের প্রচ্ছদ কাহিনীতে আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল Trusting readers who plunge in hopefully to a smooth beginning soon find themselves floundering lin troubled waters. Arrogant author Joyce gives them no help, lets them swim or sink. But thanks to exploratory works of critics, and notably such an exegetical commentaty as Stuart Gilbert’s James Joyce’s Ulysses (Time Janury 5,1931 উল্লিখিত),the plain reader can now literally found out what Ulysses is all about..আমেরিকায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ইউলিসিস বৈধভাবে এসে পৌঁছায়। টাইম ম্যাগাজিন ওপরের একই সংখ্যায় (২৯ জানুয়ারি, ১৯৩৪) সেই উপলক্ষে লেখে Strictly speaking, Ulysses did not so much disembark as come out of hiding, garbed in new and respectable garments. Ever since 1922, when the first edition of Ulysses was published in Parisp, hundreds of Americans have smuggled copies through the custom or bought from bookleggers. But this week, on the strength of Federal Judge John Munro Woolsey’s decision that Ulysses is not obscene (Time December 18, 1934), Random House was able to publish the first edition of the book ever legally printed in any Englishspeaking country ‘ইউলিসিস’ উপন্যাস নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে, এখনো হচ্ছে, যে নিরবচ্ছিন্ন সৃষ্টির কারণে ঠাট্টা করে এ বিপুল প্রকাশনাকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’র সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। গুরুত্বের দিক দিয়ে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় ইংরেজ চিত্রশিল্পী ফ্রানক বাজেনের লেখা ঔধসবং James Joyce and the Making of Ulysses (1934 (১৯৩৪) যার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে বেশ কয়েকবার। জয়েস যখন যুদ্ধ এড়াবার জন্য ত্রিয়েসত থেকে জুরিখে তার আস্তানা গেড়েছেন এবং আবার ‘ইউলিসিস’ লেখা শুরু করেন, একই সময়ে তার প্রতিবেশী ছিলেন ইংরেজ এ চিত্রশিল্পী। তিনি বাজেনের সঙ্গে বইটি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতেন এবং তার মতামত জানতে চাইতেন। বাজেন তার বইতে বইটি কীভাবে ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে, সে কথা লিখেছেন।

গত একশ বছরে ইউলিসিস নিয়ে যে বিষয় গবেষক-স্কলারদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে তা হলো বইটির কোন এডিশন মৌলিক? ১৯২২ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকাশক বইটির যে এডিশন বের করেছে তার কোনোটাই ত্রুটিহীন নয়, এমনকি সিলভিয়া বিচ প্রথম যে সংস্করণ বের করেন, সেটিও নয়। আশির দশকে এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির অবসানের জন্য মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যান্স ওয়াল্টার গেবলার এবং তার গবেষক দল অনেক অনুসন্ধানের পর যে এডিশনকে প্রামান্য বলে স্থির করেন তাও সমালোচনার মুখে টেকেনি। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এই এডিশন পদ্ধতিগত এবং টেক্সটের ভুলের জন্য সর্ববাদীসম্মত হতে পারল না। তা সত্ত্বেও অনেকের মতে গেবলারের এ এডিশনই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম ভুল রয়েছে। প্রামাণ্য বলা না গেলেও এ এডিশন সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য।

কোনটি প্রামাণ্য এডিশন তা নির্ধারণ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে এ কারণে যে, জয়েস বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকাশককে যে কপি দিয়েছিলেন সে সব হুবহু এক ছিল না। প্রতিটিতে তিনি ভিন্ন সংশোধন করেছেন। আবার একই খসড়ার কপি প্রেস থেকে প্রুফ দেখার জন্য পাঠানো হলে তিনি নতুন করে সংযোজন-বিয়োজন করেছেন। এভাবে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে মূল পান্ডুলিপিতে সংশোধন করে যাওয়ার ফলে কোন এডিশনে যে চূড়ান্ত সংশোধন করেছেন তিনি, তা বোঝা বেশ কঠিন।

জয়েসের জীবদ্দশায় না হলেও ইউলিসিস যে কালজয়ী উপন্যাস বা ‘ক্লাসিক’, এই ঐকমত্যে আসতে খুব সময় নেয়নি। ক্লাসিকের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, কালনিরপেক্ষতা, তার উল্লেখে কেউ কেউ বলেছেন যে ইউলিসিস ঐতিহাসিক উপন্যাস, কালনিরপেক্ষ নয়। এর সপক্ষে বইটিতে আয়ারল্যান্ডের বিশেষ সময়ের (ব্রিটিশ উপনিবেশ) ঘটনার এবং চরিত্রের উল্লেখের কথা বলা হয়েছে। এমার নোলান-এর বই James Joyce and Nationalism (1995) এই বিষয়টির ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায় ‘ইউলিসিস’ যদি পোস্ট-কলোনিয়াল ধারার বই হয়ে থাকে তাহলেও তার ক্লাসিক চরিত্র ক্ষুন্ন হয় না।

আগেই বলা হয়েছে, গত একশ বছরে বিভিন্ন সহায়ক বইপত্র বের হওয়ার ফলে ইউলিসিস পাঠের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এ বৃদ্ধি জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়। জয়েস জনপ্রিয় লেখক হতে চানওনি। তিনি বিশ্বাস করেছেন উপন্যাস কেবল সৃজনশীলতার প্রকাশ নয়, মননশীলতার চারণভূমিও বটে। তিনি আশা করেছেন ইউলিসিস তারা পড়বে যাদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা আছে, যারা ধৈর্যশীল, নতুন কিছু দেখে কৌতূহলী এবং মানসিক পরিশ্রম করে পড়তে যাদের অনীহা নেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন পাঠকের সংখ্যা সর্বকালেই সীমিত।

হাসনাত আবদুল হাই; বরেণ্য কথাসাহিত্যিক