শুক্রবার ফজরের নামাজের পর বিশ্ব ইজতেমার মাঠে আম বয়ান করেছেন তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বি মাওলানা জিয়াউল হক। মাঠে উপস্থিত শ্রোতাদের তা বাংলায় অনুবাদ করে শোনানো হয়। সেই বয়ানের চুম্বকাংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন- মুহাম্মদুল্লাহ বিন ওয়াহিদ
আল্লাহতায়ালা নিজের দয়ায় আমাদের মুসলমান বানিয়েছেন। এতে আমাদের কোনো কৃতিত্ব নেই। কিছু লোক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, আমরা মুসলমান হয়েছি। তারা কথাটি এমনভাবে প্রকাশ করল, যেন তারা মুসলমান হয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপরে অনুগ্রহ করেছে। তখন আল্লাহ তায়ালা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আপনি তাদের বলে দিন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করে আমার ওপরে অনুগ্রহ করোনি। বরং তোমাদের মুসলমান হওয়ার তাওফিক দিয়ে আল্লাহতায়ালা তোমাদের ওপরে অনুগ্রহ করেছেন।
আল্লাহতায়ালা আমাদের যে মুসলমান বানিয়েছেন এর কৃতজ্ঞতা হলো ইসলাম অনুযায়ী জীবনযাপন করা। আমি দুনিয়ায় যে কাজই করব তা যেন ইসলামসম্মত হয়। শুধু তাই নয়, মৃত্যু পর্যন্ত আমি কীভাবে জীবনযাপন করব, এটা আমাদের শিখতে হবে এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করতে হবে। তাহলেই আল্লাহর এই অনুগ্রহের শুকরিয়া আদায় হবে।
যারা জীবনের সব ক্ষেত্রে দ্বীন মেনে চলে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য সফলতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যারা পরিপূর্ণ দ্বীন মেনে চলে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতের কোথাও ব্যর্থ হয় না। আগের যুগে কেউ ধনসম্পদের অভাবে বা ক্ষমতার অভাবে ব্যর্থ হয়নি। তারা ব্যর্থ হয়েছে দ্বীন না মানার কারণে। আগের যুগে যত বিপদাপদ ও মুসিবত এসেছে, সেটাও দ্বীন না মানার কারণেই এসেছে। আর যারা সফল হয়েছে তারা দ্বীন মানার কারণেই হয়েছে।
আমার ওপরে কোনো বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশা এলে, আগে নিজের দ্বীন ও ইমানের দিকে দৃষ্টি দেব। নিশ্চয়ই এতে কোনো ত্রুটি রয়েছে। সেই ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে পারলে বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশা অবশ্যই চলে যাবে।
প্রথমে আমাদের দ্বীনকে ভালোভাবে শিখতে হবে। এরপরে এই দ্বীন নিজের জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। আর অন্তরে বিশ্বাস রাখতে হবে, এই দ্বীন মানার কারণে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আমাদের সফলতা দান করবেন। কেউ মুসলমান হতে চাইলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল, এই কথার স্বীকারোক্তি মুখে দিতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এই কথায় বিশ্বাস রাখতে হয় যে, এই কালিমার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা বান্দাকে সফলতা দান করবেন।
সাহাবায়ে কেরাম নিজেরা যেমন পূর্ণভাবে ইসলাম ও দ্বীন মেনেছেন, তেমনি অন্যরাও যেন মানতে পারেন তার জন্য মেহনত করেছেন এবং এই দাওয়াতি কাজ করতে গিয়ে তারা বিপদের সম্মুখীন হলে আল্লাহর সাহায্য চলে এসেছে।
শুধু ইসলামের হুকুম-আহকাম জানলে হবে না। মানতে হবে। মিথ্যা বলা গুনাহ, গিবত করা গুনাহ, খেয়ানত করা গুনাহ, এগুলো আমরা জানি। এই জানার নাম ইলম। শুধু জানা যথেষ্ট নয়। আমাদের মানতে হবে। ইসলামের বুনিয়াদি কথা হলো প্রথমত এই কথার ওপর বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। সব মাখলুক তার মুখাপেক্ষী। আল্লাহ যদি চান, দুনিয়ার বিভিন্ন আসবাব থেকে আমরা উপকৃত হব। কেবল তখনই আমরা উপকৃত হতে পারব। আল্লাহ না চাইলে দুনিয়ার কোনো আসবাব আমাদের বিন্দুমাত্র উপকার করার ক্ষমতা রাখে না।
দ্বিতীয়ত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন, এর মধ্যেই রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা। এই জীবন ব্যবস্থা মানলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। যে মানে তাকে বিপদাপদ ও দুঃখ-দুর্দশা থেকে নিরাপদ রাখেন। তার কাছে কোনো টাকা-পয়সা যদি না থাকে, থাকার জন্য ঘর না থাকে, পরিধান করার জন্য কাপড় না থাকে, তবুও যে দ্বীন ইসলাম মানে তাকে আল্লাহতায়ালা উভয় জগতে সফলতা দান করবেন।
আর কারও কাছে দুনিয়ার অর্থবিত্ত, ক্ষমতা সব আছে, কিন্তু দ্বীন নেই, সে কিছুতেই সফলতা লাভ করতে পারবে না। না দুনিয়ায়, না আখেরাতে। কারণ, মানসম্মান ও সফলতা হলো আল্লাহ তায়ালার দান। এতে মানুষের কোনো হাত নেই।
আল্লাহতায়ালা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন, তোমরা এভাবে চলো, এই কাজ করো, তাহলে সফল হবে। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী চললে বান্দা সফল। অন্যথায় সে অবশ্যই বিফল ও বিপথগামী হবে।
আমরা কোনো আমল করার আগে সেই আমল কীভাবে করতে হয় তা শিখে নেব। আমল করার সময় ওই আমলের জন্য যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা অন্তরে বিদ্যমান রাখব। আর কোনো আমলই দুনিয়ার জন্য করব না। করব একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। সমস্ত আমল করব এখলাসের সঙ্গে। যে আমল আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, কেবল সে আমলই গ্রহণযোগ্য। আর দুনিয়ার জন্য বা কোনো মানুষকে দেখানোর জন্য কোনো আমল করা হলে তা কিছুতেই কবুল হয় না। বরং এর জন্য আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।
আখেরাতের যে সুখ-শান্তি ও নিয়ামত রয়েছে তা চিরস্থায়ী। আর দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। এই জন্য আমার সব আমল যেন আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করে আখেরাতের চিরস্থায়ী নেয়ামত লাভের জন্য হয়। অন্তরে দুনিয়ার কোনো লালসা যেন জায়গা করে না নেয় সেদিকে খুব খেয়াল রাখব। আর আমল করার সময় আমি মনে করব আল্লাহ তায়ালা আমাকে দেখছেন। অন্যমনস্ক হয়ে বা আলস্য নিয়ে কোনো আমল করব না।
আমরা নিজেরা যেমন দ্বীনের ওপরে জীবন যাপনের চেষ্টা করব, তেমনি অন্যরাও যেন দ্বীনের ওপরে চলতে পারে এর জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে এবং দাওয়াত দিতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত পেয়ে নিজেরা যেমন দ্বীনের ওপরে উঠেছেন, তেমনি অন্যদের মাঝে দাওয়াতও দিয়েছেন। এভাবেই ইসলাম সম্প্রসারিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা আমাদের আমল করার তওফিক দিন।