বড়কাটারা মাদ্রাসার সাবেক সিনিয়র উস্তাদ, লালবাগ বড়ভাট মসজিদের ৫৪ বছরের খতিব, শিলালিপি গবেষক এবং ভাষাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ নুরুদ্দিন ফতেহপুরী ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গত ১৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় গাজীপুরের কালীগঞ্জে নিজ গ্রামে (পোটান, ফতেহপুর) ইন্তেকাল করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছিলেন। ইন্তেকালের সময় তিনি স্ত্রী, ২ ছেলে, ২ মেয়ে, নাতি-নাতনি, আত্মীয়স্বজন, অসংখ্য ছাত্র ও ভক্ত রেখে গেছেন।
মাওলানা ফতেহপুরী ছিলেন শিলালিপি গবেষক, আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষার পণ্ডিত এবং ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ গ্রণয়ন কমিটির অন্যতম সম্পাদক। মাওলানা নুরুদ্দিন ফতেহপুরী গত শতকের আশির দশকে বিভিন্ন স্থানের অপ্রকাশিত শিলালিপির পাঠ উদ্ধার করতে আরম্ভ করেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির শিলালিপিবিষয়ক প্রকাশিতব্য গ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন।
তিনি ১৯৪৮ সালে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মুক্তারপুর ইউনিয়নের পোটন (ফতেহপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বড় কাটরা মাদ্রাসা, করাচির জামেয়া ইসলামিয়া এবং লাহোরের জামেয়া আশরাফিয়ায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। তার পরিকল্পনা ছিল ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে তা হয়নি। পরে ১৯৬৬ সালে তিনি করাচির জামেয়া ইসলামিয়ায় হাদিস বিষয়ে এবং ১৯৬৭ সালে লাহোরের জামেয়া আশরাফিয়ায় হাদিস বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
কর্মজীবনে তিনি ১৯৬০-এর দশকে বড়কাটারা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯০ দশকের প্রথম ভাগে বড়কাটারা ছেড়ে খাজে দেওয়ান লেন মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি লালবাগের অন্যতম মুঘল স্থাপত্য বড়ভাট মসজিদের খতিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন ১৯৬০-এর দশক থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত।
মাওলানা ফতেহপুরী বিভিন্ন ভাষায় একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘বিন্দুবিহীন বর্ণে মহানবী (সা.)’ ‘বিন্দুবিহীন বর্ণে বাংলাদেশ’, ‘কুন্তু লা আদরি’ (উর্দু ভাষায় লেখা গল্পগ্রন্থ), শেখ সাদির কাব্য ‘কারিমা’ (অনুবাদ), সুফি কবিতার সংকলন ‘জজবায়ে মারেফত’ (অনুবাদ) ইত্যাদি অন্যতম।
সরেজমিনে প্রাচীন শিলালিপির পাঠ সংগ্রহের ব্রত তাকে অনন্য করে তুলেছে। ১৯৮০-এর দশকে সুলতানি, মুঘল, নবাবি ও কোম্পানি আমলের বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাজার, কাটরা, ইমামবাড়া ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের আরবি, ফারসি ও উর্দুতে লেখা শিলালিপির পাঠ সংগ্রহ করতে শুরু করেন তিনি। শুধু ঢাকা শহর নয়, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেছেন বেশকিছু প্রাচীন শিলালিপির পাঠ। আরবি-ফারসি ভাষায় তার দখল প্রশংসনীয়।
মাওলানা ফতেহপুরীকে ইসলামি জ্ঞানের জীবন্ত বিশ্বকোষ বলা হতো। ইসলামি উত্তরাধিকার আইন, আরবি সংখ্যার মানসহ ইসলামি জ্ঞানের নানা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে ছিল তার অগাধ পাণ্ডিত্য। সহজ-সরল ও আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি মাওলানা ফতেহপুরী ছিলেন চরিত্রগত দিক থেকে অনুসরণীয়, পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল। নিরহংকার এই ব্যক্তি সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন খুব সহজে। মাওলানা ফতেহপুরী আলেম সমাজের গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব।