বহুল আলোচিত ‘শনিবার বিকেল’ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনে এখন আর কোনো বাধা নেই। গতকাল দুপুরে জানিয়েছেন সাংবাদিক ও আপিল বোর্ডের সদস্য শ্যামল দত্ত। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকা নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ ছবিটি নিয়ে আপিল বোর্ডের শুনানি হয় গতকাল। এদিন সিনেমার নির্মাতা-প্রযোজকের বক্তব্য শোনেন আপিল কমিটির সদস্যরা; তার আলোকে সিনেমাটি নিয়ে মতামত দেন, ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিতে কোনো বাধা নেই। আপিল বোর্ডের রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকা ‘শনিবার বিকেল’ এখন দর্শকরা দেখতে পাবেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সভাপতি ও সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে গঠিত সাত সদস্যের সেন্সর আপিল কমিটিতে সংসদ সদস্য ও অভিনয়শিল্পী সুবর্ণা মুস্তাফা, সাবেক অতিরিক্ত সচিব নূরুল করিম, অভিনেত্রী সুচরিতা ও সাংবাদিক শ্যামল দত্ত সদস্য হিসেবে এবং সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান সদস্যসচিব হিসেবে ছিলেন। গতকাল সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা ছবিটি দেখেন। দেখা শেষে নিজেদের মধ্যে ছবিটির মুক্তি নিয়ে কথা বলেন। এরপর দুপুর আড়াইটায় আপিল বোর্ডের সদস্য শ্যামল দত্তের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ছবিটি আমরা ছেড়ে দিয়েছি। এখন আর ছবিটি প্রদর্শনে কোনো ধরনের বাধা নেই। আমরা সবাই ছবিটি দেখেছি। যেহেতু ‘শনিবার বিকেল’ ছবিটি হলি আর্টিজানের ঘটনার হুবহু রূপায়ণ নয়, তাই এর মুক্তিতে কোনো বাধা নেই। কোনো দৃশ্য সংযোজন বা পরিমার্জন করারও প্রয়োজন নেই। এ ছবির ঘটনার সঙ্গে হলি আর্টিজানে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এটি হলি আর্টিজানের ঘটনার সরাসরি চিত্রায়ণ না, আমরা এ রকম একটা ঘোষণা পরিচালককে দিতে বলেছি। আমরা বলেছি, এরপর আপনি ছবিটি মুক্তি দিয়ে দিন।’
১৮ জানুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে আপিল বোর্ড সদস্যদের উদ্দেশে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, ‘কমিটির সদস্যদের মধ্যে অনেক খ্যাতিমান মানুষ আছেন। আমরা তাদের বিচক্ষণতা দেখার অপেক্ষায় আছি। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষার দায়িত্ব এখন আপিল কমিটির কাঁধে এসে পড়েছে। আমরা কি বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে এমন দেশ হিসেবে পরিচিত করতে চাই, যেখানে শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে? এ ছাড়া বলতে চাই, আমার দেশের একটা ঘটনার ছায়া অবলম্বনে আমি ছবি বানিয়েছি। বিদেশি একজন চলচ্চিত্রকার তো সে ঘটনারই চিত্রায়ণ করেছেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখে সেটা বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে। এটা শুধু আমাদের দেশের চলচ্চিত্রকারদের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন নয়, বাংলাদেশেরই আত্মমর্যাদার ভার। আপিল কমিটি নিশ্চয়ই ব্যাপারটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।’ মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সেই আশার প্রতিফলন ঘটেছে। আপিল বোর্ডের সদস্যরা ছবিটির প্রদর্শনে নিজেদের মতামত দিয়েছেন।
শিগগিরই ছবিটি মুক্তির ব্যবস্থা করবেন বলে জানালেন ফারুকীও। ফারুকী তার ফেইসবুকে লেখেন, ‘কেমন অনুভূতি হয় যখন আপনি দেখেন সারা দুনিয়া ছুটে চলেছে আর আপনি একাই থেমে? ভীষণ অপ্রয়োজনীয় লাগে নিজেকে! এই কয় বছর তাই লাগছিল! বাইরে থেকে কী মনে হয় জানি না, ভেতরে ভেতরে শিল্পীদের মতো একাকী মানুষ আর কেউ নেই! গত চার বছর ধরে ‘শনিবার বিকেল’ নিয়ে যখন স্ট্রাগল করছিলাম, তখন নিজেকে অদরকারি ভাবার সঙ্গে যে অনুভূতিটা আমাকে গ্রাস করত সেটা হলো একাকিত্ব। কিন্তু এই কয় মাস শনিবার বিকেল’র মুক্তির দাবিতে ফিল্ম অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের কলিগ, আমাদের দর্শক ভাই-বোন, এবং সমাজের সব স্তরের মানুষ যেভাবে কণ্ঠ উঁচু করেছেন, তাতে আমি আর একা বোধ করিনি। মনে হয়েছে আমি অনেকের সঙ্গে আছি, মাঝে আছি। আপনাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনাদের মতো আমিও পত্রিকা মারফত জেনেছি, আপিল বোর্ড শনিবার বিকেল ছবিটা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উনারা হয়তো উনাদের ছোট কিছু অবজারভেশন জানাবেন যেটা ডিটেইল এখানে আলোচনা করতে চাচ্ছি না। আমরা আশা করি উনারা দ্রুতই আমাদের এই বিষয়ে চিঠি দেবেন যাতে আগামী শুক্রবার বা তার পরের শুক্রবার ছবিটা মুক্তি পায়। মোট কথা ফারাজের সঙ্গে বা আগেই ছবিটা মুক্তির ব্যবস্থা করব ইনশাল্লাহ। এই সুযোগে আমি আপিল বিভাগের বিজ্ঞ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। শেষে একটা কথা বলতে চাই, আমার মতো এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেন কোনো ফিল্মমেকার না যায়। আমরা বাঁচি আর কয় দিন। কাজের সময় খুব কম। এইভাবে তা অপচয়ের কোনো মানে নেই। সবাই ভালো থাকবেন। আমি এখন একটু ঘুমাব!’
আপিল বোর্ডের সদস্যরা ‘শনিবার বিকেল’ ছবিটি দেখার আগে ১৫ সদস্যের সেন্সর বোর্ড ২০১৯ সালে সর্বসম্মতিক্রমে সিনেমাটি প্রদর্শনের উপযোগী নয় বলে মত দিয়েছিল।