শিশুকালে কোরআন শিক্ষা

প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ, ইহ-পরকালীন কল্যাণের বিষয়াদি সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা অর্জন শিশুর একটি মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রদানে, এ বিষয়ে শিশুর যথাযথ পরিচর্যায় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্থাপন করেছেন সর্বোচ্চ আদর্শ। আমাদের পূর্ববর্তী আলেমরাও এ ক্ষেত্রে রেখেছেন উজ্জ্বল উদাহরণ। নবী করিম (সা.) ‘জ্ঞান অন্বেষণ প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ’ বলে ঘোষণা করেছেন। ইবনে মাজাহ : ২২৪

তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন।’ সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৪১

অন্য হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে এবং সে অনুযায়ী আমল করে তার বাবা-মাকে কেয়ামতের দিন এমন ঝলমলে মুকুট পরানো হবে, যার আলো সূর্যের আলোর চেয়ে ত্যাজোদীপ্ত হবে। খোদ আমলকারীর মর্যাদা তাহলে কী হবে তা অনুমান করে দেখো।’ মুসতাদরেকে হাকেম : ২০৮৫

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুকালে কোরআন শিখল, কোরআন তার রক্ত-গোশতের সঙ্গে মিশে গেল, আর যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে কোরআন শিখল, আর কোরআন তার কাছ থেকে ছুটে যাওয়া সত্ত্বেও সে লেগে রইল, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।’ দায়লামি, হাকেম

এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসা, আহলে বাইতের ভালোবাসা এবং কোরআন তেলাওয়াত। কোরআনের ধারকরা যেদিন কোনো ছায়া থাকবে না সেদিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় নবী এবং অলিদের সঙ্গে থাকবে।’ জামে সগির : ৩১০

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই কোরআন শিখল, তাকে প্রজ্ঞা দিয়ে ভূষিত করা হলো।’ কাজেই ইলমচর্চার জীবনব্যাপী চলমান প্রক্রিয়া শিশুকাল থেকেই শুরু হওয়া আবশ্যক। কেননা শিশুকালে লব্ধজ্ঞান পাথরে খচিত রেখার মতোই, যা কখনো মুছে যাওয়ার নয়। খতিব আল বাগদাদি ইলম শেখানোর ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের উদ্যোগ-আগ্রহের একটি দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। যার কিছু অংশ এমন

হজরত হাসান বলেছেন, আমাদের হাতে আপনাদের শিশুদের তুলে দিন, কেননা তারা হলোশূন্য হৃদয়, তারা যা শোনে তা সংরক্ষণ করে রাখতে অধিক সক্ষম। সাঈদ ইবনে রাহমা আল আসবাহি বলেন, আমি রাতে আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারকের মজলিসে সবার আগে যেতাম, আমার সঙ্গী-সাথী ছিল যারা কখনো আমার আগে যেতে পারত না। আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারক বৃদ্ধদের সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করতেন। তারা একবার আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারককে বললেন, এসব বাচ্চা আমাদের পরাহত করে দিয়েছে। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, আপনাদের তুলনায় এরাই আমার অধিক আশার পাত্র। আপনারা আর কদিন বাঁচবেন, আর ওদের ব্যাপারে আশা করা যায় যে আল্লাহ তাদের দীর্ঘ জীবন দেবেন। সাঈদ বলেন, তাদের মধ্যে আমাকে ছাড়া আর কেউই আজ বেঁচে নেই।

হাসান ইবনে আলী (রা.) তার ও তার বোনের ছেলেদের বলতেন, ইলম শেখো, কেননা কওমের মধ্যে তোমরা এখন ছোট, আর আগামীকাল তোমরাই হবে বড়। তাই তোমাদের মধ্যে যে মুখস্থ না করে সে যেন লিখে সংরক্ষণ করে। খতিব আল বগদাদি, আল কিফায়া ফি ইলমির রেওয়ায়া

লোকমান হাকিম একদা তার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার প্রজ্ঞা অর্জন কতদূর হলো? উত্তরে তিনি বললেন, আমার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তাতে মাথা ঘামাই না। লোকমান হাকিম বললেন, হে আমার ছেলে! আরেকটি বিষয় বাকি রয়ে গেছে, তা হলোতুমি আলেমদের সঙ্গে বসবে, ভিড় ঠেলে হলেও তাদের কাছে যাবে। কেননা আল্লাহতায়ালা হেকমত দ্বারা মৃত হৃদয়গুলোকে জীবিত করেন, যেমন জীবিত করেন বৃষ্টি বর্ষিয়ে মৃত জমিন। মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক : ২/১৬১

তিনি আরও বলেন, হে আমার সন্তান! তুমি তিনটি উদ্দেশ্যে ইলম শেখো না। আর তিন কারণে ইলম শেখা বন্ধ করো না। ১. অযাচিত ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়ার জন্য ইলম শেখো না, ২. গর্ব করার উদ্দেশ্যে ইলম শেখো না ও ৩. মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে ইলম শেখো না।

১. ইলম শেখার অনীহার কারণে ইলম শেখা ছেড়ো না, ২. লোকলজ্জায় তুমি ইলম শেখা ছেড়ো না ও ৩. অজ্ঞ থাকার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তুমি ইলম শেখা ছেড়ো না।

উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলো থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়, আমাদের পূর্ববর্তীরা শিশুসন্তানদের ইলম শেখাতে কত গুরুত্ব দিতেন, আগ্রহ-উৎসাহ বহন করতেন। একজন মুসলমান মনে করে, ইহজীবন হলোশাশ্বত পরকালীন জীবনের পথে একটি মনজিল। তাই তাকে এই ইহকালীন জীবনের চেয়ে অনন্ত পরকালীন জীবনের সফলতার বিষয়ে অধিক সতর্ক থাকতে হবে। এজন্য বাবা-মাকে সন্তান-সন্ততির ইহকালীন জীবনের সফলতার পাশাপাশি তাদের পরকালীন জীবনের সফলতার প্রতিও মনোযোগী হতে হবে। তাদের উচিত সন্তান-সন্ততিকে সর্বোত্তম শিক্ষার পাশাপাশি ভালো আচার-আচরণ শেখানো এবং তাদের পরকালীন জীবনের শাশ্বত সফলতাকে নিশ্চিত করা।