খোলা আকাশের নিচে শূন্যরেখার রোহিঙ্গারা

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রুর শূন্যরেখায় আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গা। গেল ৫ বছর তারা সেখানে বসবাস করলেও দুই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দলের বন্দুকযুদ্ধের কবলে পড়ে সেই আশ্রয় ছেড়েও তাদের পালাতে হয়েছে। আগুন সন্ত্রাসে পুড়ে হারিয়েছে ৫ বছর আগে গড়া আবাসস্থল। ফের পলিথিনের তাঁবুতে এদের কেউ আশ্রয় নিয়েছে তমব্রু স্কুলের পাশর্^বর্তী মাঠে আর কিছু লোক অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমারের কিছুটা ভেতরে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অভাবে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।

তমব্রু সীমান্ত ঘুরে দেখা যায়, কোনারপাড়ার শূন্যরেখার আশ্রয় শিবিরের অধিকাংশ ঘরই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এদের মধ্যে ২৫০-এর মতো পরিবার সীমান্ত কাঁটাতার ঘেঁষে মিয়ানমার অভ্যন্তরে নতুন করে পলিথিনের তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে। আর প্রায় ৪ শতাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তমব্রু স্কুলের পাশের মাঠে। তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া বসর আলী বলেন, ৫ বছর আগে নিজের দেশের সেনাবাহিনীর হাতে অত্যাচারিত হয়ে শূন্যরেখায় পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেই শূন্যরেখায় তিলে তিলে ঘর সাজিয়েছিলাম। কিন্তু এবার নিজ গোত্রের সন্ত্রাসী আক্রমণে আবার আশ্রয় হারালাম। ফের পলিথিনের তাঁবুতেই ঠাঁই হলো। রোহিঙ্গা নারী তানজিনা বলেন, ‘জানি না, আমাদের ভাগ্যে কী আছে। এখানে পানি নেই, টয়লেট নেই, খাবার নেই। জীবনের নিরাপত্তা নেই।

এদিকে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘গত বুধ ও শুক্রবার যেসব রোহিঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিদ্যালয় মাঠ ও আশপাশের পতিত জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল তারা এখনো সেখানেই অবস্থান করছে। তারা আগুনে পুড়ে যাওয়া শূন্যরেখার ক্যাম্পে যেতে চাচ্ছে না। তারা মানবেতর দিনযাপন করছে।’

ইউপি সদস্যের ধারণা, তমব্রুতে এখন দুই সহস্রাধিক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। শনিবার কয়েকটি এনজিও কিছু পলিথিন ও ত্রিপল দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে তাঁবু তৈরি করে তারা সেখানে অবস্থান করছে। তাদের অবস্থানস্থলের আশপাশে স্থানীয়দের চলাচলও সীমিত করা হয়েছে।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘শূন্যরেখার ক্যাম্পের কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ভূখন্ডের তমব্রুতে চলে এসেছে। তারা সেখানে চার দিন ধরে অবস্থান করছে। বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।’ তবে এখনো প্রশাসনের কোনো নির্দেশ পাননি জানিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত দেবে ইউনিয়ন পরিষদ সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।’

তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে আশ্রয় নেওয়া নুরুল আলম (৫০) নামে এক রোহিঙ্গা জানান, ‘বুধবার ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর তারা প্রথমে কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে মিয়ানমার ভূখন্ডে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে একদিন অবস্থানের পর শুক্রবার মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি জোর করে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।’

এসব রোহিঙ্গার ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শূন্যরেখার ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক রেডক্রস- রেডক্রিসেন্ট কমিটির (আইসিআরসি) মাধ্যমে শনিবার থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে কত সংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।’ তাদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।