আজ দেশের ৫টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে গণ-অর্থায়নে নির্মিত খন্দকার সুমন পরিচালিত সিনেমা ‘সাঁতাও’। দেশ-বিদেশে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত ছবিটি নিয়ে কষ্টের সীমা নেই পুরো টিমের। শ্যুটিংয়ের মধ্যেই অর্থ সংকট, তা কয়েক দফায় কাটিয়ে উঠে শ্যুটিং শেষ করা, একটু একটু পোস্ট প্রোডাকশন- এরপর সেন্সরশিপের মহাঝামেলা কাটিয়ে যখন ছবিটি দর্শকের দেখার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত, তখনই হলো সংকট। কোনো হল মালিক ছবিটি দেখাতে রাজি নয়। তাদের ভাষ্য, কৃষকের গল্প কে দেখবে! ছবিটি দেশে মুক্তি না দিতে পেরে পরিচালক খুঁজলেন ভিন্ন পন্থা। প্রথমে ছবিটি যায় ভারতের গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে প্রশংসা কুড়ানোর পর একই দেশের অজন্তা ইলোরাতে প্রদর্শিত হয়। দেশের দর্শক প্রথম সিনেমাটি দেখতে পায় সদ্য শেষ হওয়া ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। যে ছবিতে দর্শক হবে না বলে হল মালিকরা বারবার পরিচালককে ফিরিয়ে দিয়েছে, সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই ছবি দেখতে উৎসবে দর্শকের ঢল নামে। জায়গা স্বল্পতার জন্য অনেক দর্শক ছবিটি না দেখেই বাড়িতে ফেরেন। আর যারা দেখার সুযোগ পান তারা একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপর ছবিটি উৎসবের সেরার পুরস্কার জিতে নেয়। সামনে নেপাল চলচ্চিত্র উৎসবেও যাচ্ছে ছবিটি।
‘সাঁতাও’-এর গল্প যেন প্রতিটি গ্রামের মানুষের অতি চেনা। ছবির চরিত্রগুলোর সংগ্রাম, আবেগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসা যেন প্রতিটি দর্শকেরও। সেই সঙ্গে ছবির আবহ সংগীত, গ্রামের রূপ রং ছবিটিকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। আর যে বিষয়টি মানুষের মনে থেকে যায় তা হলো ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র পুতুলের অভিনয়। সদ্য বিয়ে হওয়া এই গ্রামীণ নারীর জীবনের গল্পকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যায় চলচ্চিত্র ‘সাঁতাও’। পুতুল চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তিনি অভিনেত্রী আইনুন পুতুল। তিনি অনেক জনপ্রিয় কোনো তারকা নন। কিন্তু সুযোগ পেলে তিনিও যে করে দেখাতে পারেন তার প্রমাণ দিতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি ছবিতে। শিশুবেলা থেকে থিয়েটার চর্চার সঙ্গে জড়িত পুতুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় থেকে নাটকের ওপরেই মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এরপর কয়েকজন মিলে নাটকের দল ‘আরশিনগর’ গড়ে তোলেন। ক্যামেরার সামনেও তার অভিনয় শুরু শিশুশিল্পী হিসেবে। এরপর বড় হয়ে ১৪০০ মেয়ের মধ্যে অডিশনে প্রথম হয়ে হুমায়ূন আহমেদের ‘জহির কারিগর’ নাটকের নায়িকা হন। এরপর বেছে বেছে কিছু ভালো কাজ করছেন।
‘সাঁতাও’ মুক্তিতে আবেগে ভাসছেন পুতুল। বললেন, ‘ছবিটি করতে আমরা কী যে পরিশ্রম করেছি তা বলার মতো নয়। প্রতি পদে আমাদের পরিচালক বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। আমরা কোনো টাকা-পয়সা, পরিশ্রমের দিকে না তাকিয়ে সবাই একজোট হয়ে শুধু কাজটাই করেছি। কারণ আমার মনে হয়েছে এমন একটি ছবি জীবনঘনিষ্ঠ বলা খুব জরুরি। পুতুলের মতো শক্তিশালী চরিত্র যে কোনো অভিনেত্রী লুফে নেবেন। সেই একটা লোভ তো ছিলই। কিন্তু ছবিটি কিছুতেই দর্শকদের দেখাতে পারছিলাম না আমরা। অবশেষে আজ ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে। এর চেয়ে আনন্দের অনুভূতি আর হতে পারে না।’ চরিত্রটি এত নিখুঁতভাবে ধারণ করা প্রসঙ্গে পুতুল বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে চরিত্রটির মধ্যে আছি। বলতে পারেন ৫ বছরের পরিশ্রমের ফসল আজ দেখতে পাবেন দর্শক। আমি মফস্বলে বড় হলেও পূর্বপুরুষ গ্রামের কৃষক। এটা নিয়ে আমি গর্বিত। তাই এ ধরনের চরিত্র আমার রক্তেই হয়তো ছিল। এরপর অন্য অঞ্চলের ভাষা শেখা, চরিত্র নিয়ে গবেষণা তো ছিলই। এখনো পরিশ্রম করে যাচ্ছি। প্রমোশন করছি সারা দিন, পোস্টার লাগাচ্ছি নিজ হাতে। কারণ আমাদের কোনো আর্থিক সহায়তা বা লোকবল নেই। হলে গিয়ে দর্শক ছবিটি দেখে প্রশংসা করলেই আমি
তৃপ্ত। এখনই জাতীয় পুরস্কার বা অন্যকিছুর কথা ভাবার অবকাশই পাচ্ছি না।’
‘সাঁতাও’ উত্তরবঙ্গের শব্দ, যার মানে লাগাতার সাত দিন বৃষ্টি। রংপুর অঞ্চলে সাঁতাওয়ের সময়ে কৃষিনির্ভর সমাজে কেমন প্রভাব ফেলে, খন্দকার সুমন তার ছবিতে সেটা দেখিয়েছেন। ছবিতে আইনুন পুতুল ছাড়া আরও অভিনয় করেছেন তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’ ছবির অভিনেতা ফজলুল হক। আজ থেকে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি স্টার সিনেপ্লেক্স, যমুনা ব্লকবাস্টার, চট্টগ্রাম, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জের মোট পাঁচটি সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে ছবিটি।’