বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন সুফলে সংশয়

আগামী ১ মার্চ থেকে সরকারি হাসপাতালে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে পারবেন সরকারি চিকিৎসকরা। অফিস সময়ের বাইরে কর্মস্থলে বসেই যাতে চিকিৎসকরা রোগী দেখতে পারেন সে জন্য সরকার এই ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের’ উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য হাসপাতালে আলাদা চেম্বার করে দেবে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। গত সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সরকারের এই উদ্যোগের কথা জানান।

সরকারের এই ঘোষণার পরপরই ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের’ যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে রাষ্ট্র, রোগী, চিকিৎসক সবপক্ষই লাভবান হবে। কিন্তু সে মত মানতে নারাজ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এতে দরিদ্র রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ব্যবস্থার সুফল নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, এ ধরনের চেম্বারে সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বসানো খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। তা ছাড়া রোগী দেখার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের আগের মতোই বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে হবে। এমনকি সরকার প্রস্তাবিত ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস’কে বর্তমান সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন বলেও মনে করছেন তারা। তারা এই উদ্যোগকে সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে বেসরকারি রোগী ধরার একটি প্রক্রিয়া বলেও মনে করছেন। ১ মার্চ থেকে শুরু করতে চায় সরকার : গত সোমবার চিকিৎসকদের নানা সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সরকারি চিকিৎসকদের ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের’ ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি জানান, এ বছরের ১ মার্চ থেকে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট অফিস সময়ের পর সরকারি হাসপাতালেই চেম্বার করে ব্যক্তিগত রোগী দেখতে পারবেন। এ বিষয়ে চিকিৎসক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের মতামত নিয়েছে সরকার। এই কাজটি শুরু করতে দ্রুতই একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে। এই কাজটি শুরু হলে দেশের লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন ক্লিনিক, ফার্মেসিতে ডাক্তার দেখানোর ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবেন। প্রাথমিকভাবে দেশের ৫০টি উপজেলা, ২০টি জেলা এবং পাঁচটি মেডিকেল কলেজে এই সেবা শুরু হবে।

অনেক কিছুই অস্পষ্ট: স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের নানা সংগঠনের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠকের কথা বললেও এসব সংগঠনের কর্মকর্তারা কেউই এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেননি। কোন ধরনের চিকিৎসকরা এসব ব্যক্তিগত চেম্বারে বসবেন, সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বসবেন কি না, চেম্বারে বসার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আছে কি না, ফি কত হবে, চেম্বারে দেখা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা সার্জারির প্রয়োজন হলে সেটা কোথায় করবেন রোগীরাÑ এসব বিষয়ে একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার এটা বাধ্যতামূলক করছে না। যে কেউ ইচ্ছে হলে চেম্বারে বসতে পারেন, নাও বসতে পারেন। অনেক সিনিয়র ডাক্তার তারা কিন্তু এই ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস করবেন না, জুনিয়র ডাক্তাররাই করবেন।’

এ ব্যাপারে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. জামালউদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা বৈকালিক সেবা দেওয়ার একটা উদ্যোগ। এটা হলে হাসপাতালের রোগীরাও চিকিৎসকদের সেবা পাবে। এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ব্যবস্থা আছে, সে মডেল অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালেও এই ব্যবস্থাটা চালু করা হচ্ছে। শুধু মডেলটায় কিছু পরিবর্তন আনা হবে। কারণ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল তার নিজস্ব আইনে চলে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছু নিয়মকানুন আছে। এখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। এখানে ফি নেওয়া হবে, সেটা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। ব্যক্তিগত চেম্বারে অনেক বেশি টাকা ফি নেওয়া হয়, হাসপাতালে সেটা কম নেওয়া হবে। সব ডাক্তারকে মাসে সব দিন রোগী দেখতে হবে না। সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে রোগী দেখতে হবে। বাইরেও তিনি তার চেম্বারে প্র্যাকটিস করতে পারবেন।’

দরিদ্র রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে : সরকারি চিকিৎসকদের এই ধরনের প্র্যাকটিস নিয়ে তুমুল সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব। তিনি এর আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিশেষজ্ঞ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার সরকারি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার হাসপাতালে আনছে। পয়সা দিয়ে রোগীকে তাদের চেম্বারে দেখবেন। অথচ টাকা দিয়ে সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখা অবৈধ। কারণ সরকারি হাসপাতালে যে কোনো ডাক্তার প্র্যাকটিস করেন সরকারি স্থাপনায়। তিনি কিছুতেই সেখানে ব্যক্তিগত রোগী দেখতে পারেন না। সরকার বাধ্য করছে চেম্বার করতে, ডাক্তারদের সুযোগ দিচ্ছে টাকার বিনিময়ে রোগী দেখতে।

তিনি প্রশ্ন করেন, এসব চেম্বার থেকে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সার্জারি কোথায় হবে? তা হলে কি সরকারি হাসপাতাল প্রাইভেট রোগী ধরার সেন্টার বানাচ্ছে? সরকার চিকিৎসা দিতে পারছে না বলে? অথচ সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা কোনো ক্যাশ ট্রানজিকশন করলে, সেটি দুর্নীতিতে পড়ে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব চেম্বারে সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বসবেন না। বসবেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। তারমানে একজন রোগী তার পছন্দমতো ডাক্তারকে দেখাতে পারলেন না। অথচ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের ব্যবস্থা আছে। সেখানে রোগী যায়, রোগীরা ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখানে সব ডায়াগনস্টিক আছে। সবকিছুই একজন রোগী সেখানে পায়। এ ছাড়া তাদের একটা উইং আছে, যেখানে তারা কনসালটেশন করেন, রোগী ধরেন, চিকিৎসা করেন।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বেÑ জানিয়ে ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, সরকারি হাসপাতালে কি সিট খালি থাকে? তা হলে সেখানে ডাক্তারদের দেখানোর পর রোগীরা কোথায় যাবে? সেই বেসরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের চেম্বারে ডাক্তার দেখাবে, আবার বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে সার্জারি করবে। তারমানে গরিব মানুষরা আরও ভোগান্তিতে পড়বে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বসে বেসরকারি রোগী ধরার একটা প্রক্রিয়া।

রূপরেখা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তারা: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যাপারে সরকারের রূপরেখা দেখে নিজেদের প্রস্তাব জানাতে চান সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তারা। এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার কেবল বলল চালু হবে। এটার জন্য একটা কমিটি করবে। কমিটি কী বলতে চাইছে শুনি, তারপর দেখা যাবে। তখন বোঝা যাবে আমাদের সঙ্গে কতটা টেকসই করে। এটার চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি যদি এটা সফল করতে পারি তা হলে ভালো দিকও আছে। কেমন প্রস্তাব আসে, সেটা দেখি, তারপর ভাবা যাবে।’

লাভ দেখছে সরকারপক্ষ : সরকারি চিকিৎসকদের ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে রোগী ও চিকিৎসক উভয় পক্ষের লাভ দেখছেন সরকার সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠনের নেতারা। এ ব্যাপারে বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চিকিৎসকের সংখ্যা জনসংখ্যা অনুপাতে অনেক কম। আবার কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন, তারা বাইরে চেম্বার করলে রোগী হয় না। এতে চিকিৎসকের বৈষয়িক ক্ষতি হলো তিনি রোগী পেলেন না, আর রোগীর ক্ষতি হলো তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে পারলেন না। এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানা জায়গায় বসেন। ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস শুরু হলে তারা তাদের নির্দিষ্ট হাসপাতালে বসবেন এবং রোগীরা একসঙ্গে অনেক বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাবেন।

এই চিকিৎসক নেতা আরও বলেন, রোগীদের আরেকটা লাভ হলো, বাইরে যে ফি দেবে, সেটা এখানে কম দেবে। ডায়াগনস্টিক ফি’ও কম হবে। সরকারের লাভ হলো রোগী যে ফি দেবে, সেখান থেকে একটা অংশ সরকার পাবে। রোগীর থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সরকার নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে পারবে, বা পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত করতে পারবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার হবে।

চেম্বার না, দরকার সরকারি ব্যবস্থাপনার সংস্কার : ডা. রশীদ-ই-মাহবুব সরকারের উদ্দেশে বলেন, এসব (ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস) না করে চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। সেই জায়গায় কেউ যাচ্ছে না। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় পয়সা দেবেন না, অব্যবস্থাপনা দূর করবেন না, আরও অব্যবস্থাপনা চাপানোর ব্যবস্থা করবেন। সরকার একটা কিছু করতে চাইছে। ভালো কিছু করুক। কী করলে ভালো হবে, সেটা ভাবুক। ডাক্তারদের সরকারি হাসপাতালে চেম্বার করে সেটা ভালো হবে না।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এই উদ্যোগ চালু করতে হলে আইনের পরিবর্তন করতে হবে। ডাক্তারদের সার্ভিস রুলের পরিবর্তন করতে হবে। সরকার যদি মনে করে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ডাক্তারদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না, সেটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে, কত টাকা লাগবে, অবকাঠামোগত কী পরিবর্তন লাগবে, সেটার সংস্কার করতে হবে।

গণবিরোধী আখ্যা জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের : সরকারের এই উদ্যোগকে গণবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে সংগঠনটি। গত সোমবার সংগঠনের আহ্বায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রওশন আরা, জনস্বাস্থ্য সংগঠক অনুপ কুন্ডু ও সামিউল আলম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত জনগণের ট্যাক্সের অর্থে প্রতিষ্ঠিত সরকারি হাসপাতালগুলোকে ক্রমান্বয়ে বেসরকারিকরণের এক চক্রান্ত। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন ও স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের খেদমতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে জনগণকে চিকিৎসা প্রদানের সেবাব্যবস্থাকে খর্ব করে বর্তমান সরকার ইউজার ফি চালু করেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ফি দিয়ে বৈকালিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করতে দিয়েছে। এখন সমগ্র রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবা খাতকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দিতে চলেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্তের মানুষের দুর্দশা বৃদ্ধি করবে।’