আইএমএফ খুলে দিচ্ছে অন্য ঋণের দুয়ারও

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের প্রথম কিস্তি ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে। মোট সাত কিস্তিতে এ ঋণ দেওয়া হবে। প্রথম কিস্তির পরিমাণ হবে ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। বাকি ছয় কিস্তির প্রতিটি সমান ভাগে দেওয়া হবে। শর্তসাপেক্ষে এ ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। শর্ত পালনে ব্যর্থতায় ঋণের কিস্তি আটকে দেবে আইএমএফ।

শর্ত ঠিকভাবে পূরণ করা হলে ঋণের শেষ কিস্তি আসবে ২০২৬ সালে। বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে, ঋণের গড় সুদ হার ২ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ কথা জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আশা করছি প্রথম কিস্তি এ মাসের ১০ তারিখে পাওয়া যাবে। তবে আইএমএফের বোর্ড সভায় অনুমোদনের ব্যাপার রয়েছে, এ কারণে দুয়েক দিন আগাতে-পেছাতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইএমএফের শর্তের মধ্যে আর্থিক খাতের সংস্কার বড় বিষয়। তারা হিসাব করে অর্থ দিয়েছে। শর্ত পূরণ করতে পারলে ঋণ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। সব দাতা সংস্থার শর্ত প্রায় একই রকম। আইএমএফ সন্তুষ্ট হওয়ায় ঋণ ছেড়েছে। ফলে অন্য দুই ঋণদাতা আস্থা পাবে। তাদের অর্থ সহায়তা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ হওয়ার কথা।

সূত্র জানায়, আইএমএফের শর্ত মানতে সরকার রাজি আছে বললেই হয়নি; অনেক শর্ত পূরণও করতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের মতো অন্য দুই ঋণদাতা সংস্থা বিশ^ব্যাংক ও এডিবির কাছ থেকেও ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছিল। এতদিন এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি ছিল না। আইএমএফের শর্ত মানতে সরকার আগ্রহী হওয়ায় তারাও ঋণ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আইএমএফের মতো বিশ^ব্যাংক এবং এডিবিও কিছু শর্ত দিয়েছে। এটাকে আমরা সংস্কার বলছি। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্তে কঠোরতা বেশি। সহায়তার অর্থ কোন খাতে, কতটা, কী কৌশলে ব্যয় করা হবে তা স্পষ্ট করতে হয়। এ বিষয়ে বিশ^ব্যাংকের শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধ্যকতা আছে। শর্তের অনেকগুলো এরই মধ্যে সরকার পূরণ করেছে। অনেকগুলোর পূরণে অনেক দূর এগিয়েছে।

সূত্র জানায়, আইএমএফের শর্তের অধিকাংশই অর্থনৈতিক সংস্কার বিষয়ে। শর্তগুলো হচ্ছে আর্থিক খাতের প্রশাসনিকতার উন্নয়ন, ভর্তুকি কমানো, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি স্থাপন এবং বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। আরও আছে, ব্যাংক খাতে ও রাজস্ব আদায় বাড়াতে ব্যাপক সংস্কার, কর অব্যাহতি কমানো, শুল্ক আইন ও আয়কর আইন চূড়ান্ত করা, অর্থ পাচার রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংহত করা; প্রকল্পের কেনাকাটায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও স্বচ্ছতা আনা; জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিযোজন ব্যবস্থাপনা উন্নত করার কথাও বলা হয়েছে।

আইএমএফের শর্তেই জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। মন্ত্রিসভায় আয়কর আইন অনুমোদন করা হয়েছে। এনবিআর আইন মন্ত্রণালয়ে শুল্ক আইন ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে। ব্যাংক খাতের কী সংস্কার সম্ভব এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন কতটা সংশোধন করা সম্ভব তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কাজ করছে বলে আইএমএফকে নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থ পাচার রোধে ইতিমধ্যে অনেক বন্দরে স্ক্যানার বসানো হয়েছে। অর্থ পাচার রোধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে ঋণদাতা সংস্থাগুলোকে জানানো হয়েছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার বিষয়ে আইএমএফকে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে বড় কর ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণ, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা বন্ধে পদক্ষেপ, শুল্কখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, সম্ভাবনাময় বড় ও মাঝারি করদাতা চিহ্নিত করা, উৎসে করের আওতা বাড়ানো, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার নিরীক্ষণ ও গোয়েন্দা তৎপরতাভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, রাজস্ব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আইএমএফের কাছ থেকে ‘বর্ধিত ঋণ সুবিধা’ (ইসিএফ) ও ‘বর্ধিত তহবিল সুবিধা’ (ইএফএফ)-এর অধীনে এবং নবগঠিত ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি’ (আরএসএফ)-এর অধীনে ঋণ পাবে বাংলাদেশ। এ ফান্ড থেকে এশিয়ার কোনো দেশ এই প্রথম ঋণ পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২০২২ সালের জুুনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইআরডি ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চেয়েছিল। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার তিনবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। প্রত্যেক সফরেই সহায়তা বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি। আইএমএফ তার ঋণ-অনুমতি দেওয়ায় সম্প্রতি সহায়তাবিষয়ক আলোচনাও জোরালো হয়েছে।

গত জানুয়ারির ২১ থেকে ২৩ তারিখ তিন দিন বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অ্যাক্সেল ফন ট্রটসেন বাংলাদেশ সফরে আসেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, ইআরডি-সচিব, বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন তিনি। এসব বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থ খাতের সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এমডি ট্রটসেন গত মাসের সফরে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থ সহায়তা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন। গত সপ্তাহে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ধাপে বিশ্বব্যাংকের গ্রিন, রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুসিভ, ডেভেলপমেন্ট (জিআরআইডি) বা গ্রিড কর্মসূচির আওতায় ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এখন তা বাড়িয়ে ৫০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সহায়তা দেওয়া যায় কি না, এ দিয়ে কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া সম্ভব, সরকার কীভাবে লাভবান হবে, কোন কোন খাতে কী কৌশলে অর্থ ব্যবহৃত হলে অর্থনীতির কোন দিক কতটা গতিশীল হবে তার হিসাব করা হচ্ছে।

এ অর্থপ্রাপ্তিতে রাজনৈতিক লাভ-লোকসানও বিচার করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সব হিসাব চূড়ান্ত করে এ মাসের মধ্যেই প্রতিবেদন আকারে তার কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সব ঠিক থাকলে আগামী মার্চে বিশ্বব্যাংকের বোর্ডসভায় এ ঋণ প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়েও আলোচনা চলছে। সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ঋণ আগামী অর্থবছরের প্রথমভাগে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ ঋণ সহায়তা পেলে সরকারের অনেক অসমাপ্ত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

আরেক ঋণদাতা সংস্থা এডিবির কাছ থেকে গত বছর মে মাসে ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ইআরডি। অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থদানে অসম্মতি জানায় এডিবি। আইএমএফ ঋণের অনুমোদন দেওয়ায় এ বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, আগামী এপ্রিলে এডিবির বোর্ডসভায় এ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী জুনে পুরো অর্থ ছাড় করা হতে পারে। এডিবির সঙ্গে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকাও থাকবে।