ডলার সংকট, আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারাসহ বিশে^ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আবারও ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধিতে ভর করে নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫১৩ কোটি ডলার। এ নিয়ে টানা তিন মাস দেশের রপ্তানি আয় ৫০০ কোটি ডলার ছাড়াল। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিদেশি মুদ্রা নিয়ে চরম সংকটের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় নিয়ে এমন সুখবর এলো। জানুয়ারিতে প্রবাসী আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে বিদেশি মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই খাতে প্রবৃদ্ধি থাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসছে। এতে করে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপও কমবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ইপিবি জানুয়ারি মাসের রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, গত জানুয়ারি মাসে ৫১৩ কোটি ৬২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ৩ হাজার ২৪৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকার সমান। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তৈরি শোক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, চামড়াবিহীন জুতা, প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। তবে এ সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং হিমায়িত খাদ্যের রপ্তানি কমেছে।
২০২২ সালের বিশে^ করোনার প্রাদুর্ভাব কমে আসতে না আসতেই ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। সব দেশে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ কমতে থাকে। এ সময় বিশে^ জ¦ালানির দাম বাড়তে থাকায় বাংলাদেশেও দফায় দফায় দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সরকারের কৃচ্ছ্র সাধনের কারণে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। লোডশেডিংয়ের কারণে দিনের একটি বড় সময় উৎপাদন ব্যাহত হয়। আর গ্যাসের অভাবে ১২ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ ছিল শিল্পকারখানায়। বিদ্যুতের সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও এখনো দেশজুড়ে গ্যাসের সংকট রয়ে গেছে। এতে করে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হয়, উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এসব সংকটের মধ্যেই রপ্তানি আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে, অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে ৮৫৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশ। যদিও সেপ্টেম্বরে রপ্তানি কমে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। অক্টোবরে রপ্তানি ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে নভেম্বরে আবার ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরে রপ্তানি। ডিসেম্বরে রপ্তানি হয় ৫৩৭ কোটি ডলারের পণ্য। এটিই দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ পণ্য রপ্তানি।
ইপিবির প্রকাশ করা তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ২ হাজার ৭৪১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। আলোচ্য সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানিতে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে নিটওয়্যার পণ্য রপ্তানি ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর ওভেন পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ২৪৫ কোটি ডলার। উভয় ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৭ এবং ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পোশাক পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪২ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।
তৈরি পোশাকের বাইরে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে ৭৩ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৬৯ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। আবার ৫৫ কোটি ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হলেও তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ কম।