আল্লাহভীতি সৃষ্টির উপায় ও উপকারিতা

মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তার আয়াতসমূহ তাদের কাছে পাঠ করা হলে তা তাদের ইমান বাড়ে। আর তারা তাদের রবের ওপরই নির্ভর করে।’ -সুরা আল আনফাল : ০২

অন্তরসমূহের উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ বিশেষণ, যাকে কোরআন মাজিদ ‘কম্পিত অন্তর’ নামে আখ্যায়িত ও চিহ্নিত করেছে। ইমান যার গভীর পর্যন্ত পূর্ণ করে দিয়েছে এবং তার অঙ্গগুলো রবের কাছে বিনয়াবনত হয়েছে। ফলে তার মর্যাদা সুউচ্চ হয়েছে ও তার সুনাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মহান রবের প্রশংসাপ্রাপ্ত হয়েছে। মুমিন বান্দা ভীতিকর অবস্থা থেকে মুক্ত নয়, যা সে অনুভব করে ওয়াজ-নসিহত ও কোরআন মাজিদের আয়াতসমূহ শোনার পর। যা শ্রবণে তার অন্তর আলোকিত হয়, শরীর শিহরিত হয় ও তার রুহ ঊর্ধ্ব জগতে বিচরণ করে। এই কম্পিত অন্তরগুলোই ইমানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করে, আনুগত্যের মধ্যে তৃপ্তি পায়, যাবতীয় ফেতনা ও সংশয়ের পথ বন্ধ করে দেয় এবং অন্তরের রোগ থেকে নিরাপদ থাকে। অন্তরে কম্পন সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম হলো আল্লাহর জিকিরে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখা। জিকিরের মাধ্যমে অন্তর পবিত্র হয়, দেহ ও আত্মা পরিশুদ্ধ হয় এবং মোনাজাতে তৃপ্তি পাওয়া যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এবং সুসংবাদ দিন বিনীতদের। যাদের কাছে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে।’ -সুরা আল হজ : ৩৪-৩৫

অন্তর কেঁপে ওঠে কারণ, তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে তারা স্মরণ করে, উপদেশ দিলে উপদেশ গ্রহণ করে এবং ভীতি প্রদর্শন করা হলে ভীত হয়। সবচেয়ে বড় জিকির হলো কোরআন তেলাওয়াত করা ও তার আয়াতসমূহ মধুর সুরে পাঠ করা। সুতরাং যে ব্যক্তি কোরআনের দিকে ধাবিত হবে ও হৃদয়কে কোরআনের জন্য প্রশস্ত করবে এবং তার ছায়াতলে জীবন ধারণ করবে; তার অন্তর হবে নরম, হৃদয় হবে কম্পিত, তার মধ্যে আল্লাহর ব্যাপারে ভয় ও লজ্জার সৃষ্টি হবে এবং তার ইমান বৃদ্ধি পাবে। আমরা কীভাবে অন্তরের প্রাঞ্জলতা, শিহরণ ও ভয়ের আশা করব যদি আমরা অন্তরকে পরিপূর্ণ করে রাখি এমন বিষয় দ্বারা, যা রবের উপদেশ গ্রহণে প্রতিবন্ধক।

আপনি যদি আপনার অন্তরকে কোরআনের কাছে না পান, তাহলে কোথায় পাবেন? আপনি যদি অন্তরে উপদেশ ও কোরআনের প্রভাব অনুভব না করেন, তাহলে তার কারণ অনুসন্ধান করুন এবং এই রোগের চিকিৎসা করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য পেশ করি, আর জ্ঞানী লোকেরা ছাড়া কেউ তা বুঝে না।’ -সুরা আল আনকাবুত : ৪৩

অন্তরে কম্পন সৃষ্টির আরেকটি মাধ্যম হলো আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করা। আর এগুলোকে সম্মান করা আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামান্তর। সুতরাং আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) যেগুলোকে সম্মানিত করেছেন তা-ই সম্মানিত। আর এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অন্তরের বিশুদ্ধতার পরিচায়ক। অন্তরে কম্পন সৃষ্টির আরেকটি মাধ্যম হলো, এটাকে জ্ঞানের পাত্রে পরিণত করা যা আল্লাহর কাছে পৌঁছায় এবং তার সুন্দর নাম ও উন্নত গুণাবলির মাধ্যমে আল্লাহকে জানার দাবি রাখে।

অন্তরে কম্পন সৃষ্টির আরেকটি মাধ্যম হলো তওবা, বারবার ইস্তিগফার করা ও দ্রুত পাপ থেকে তওবা করতে গাফিলতি না করা। যেহেতু অন্তরকে পরিশুদ্ধকারী এসব বিষয় ছাড়া অন্তরের কম্পন অর্জিত হয় না। সুতরাং রুগ্ণ অন্তর কীভাবেই বা কম্পিত হবে? উদাসীন হৃদয় কীভাবে ভীত হবে? মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করো (তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর), কারণ তোমাদের উভয়ের অন্তর তো বাঁকা হয়ে পড়েছে।’ -সুরা আত তাহরিম : ০৪

সৎকাজ সম্পাদন করা, দানে অভ্যস্ত হওয়া এবং নানাবিধ সৎকর্ম পালন করায় হৃদয়ে কোমলতা, ভয়, কম্পন ও নম্রতা তৈরি হয়। সেই সঙ্গে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ, মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকা পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়াবিমুখ করে এবং ব্যর্থতা ও উদাসীনতা থেকে হৃদয়কে উজ্জীবিত ও জাগ্রত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার আছে অন্তঃকরণ অথবা যে শ্রবণ করে মনোযোগের সঙ্গে।’ -সুরা কাফ : ৩৭

কাজেই যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের পরিচর্যা করে ও আল্লাহর সঙ্গে সততা বজায় রাখে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের পথ দেখাবেন ও সরল পথের ওপর অবিচল রাখবেন। বিজ্ঞ লোকেরা তাদের অন্তরের পরিচর্যা করে। আর অন্তর আল্লাহর দুই আঙুলের মধ্যে অবস্থিত, তিনি যেভাবে চান তা পরিবর্তন করেন। আল্লাহ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত নবী করিম (সা.)-ও অন্তর পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কা পোষণ করতেন। তাই অন্তরের অবিচলতার জন্য তার নিয়মিত দোয়া ছিল ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিক। অর্থ : হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।’ তাহলে অন্যদের অবস্থা কী রকম?

যখন আল্লাহ বান্দাকে তাকওয়া ও অন্তরের ভয় অর্জনের যোগ্য হওয়ার তওফিক দেবেন, তখন সে অচিরেই এর সুফল লাভ করবে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা উপভোগ করবে। অন্তরে আল্লাহভীতির অন্যতম ফল হলো উভয় জগতের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন লাভ। কেননা তারাই কেয়ামতের দিন বলবে, ‘নিশ্চয় আগে আমরা পরিবার-পরিজনের মধ্যে শঙ্কিত অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন।’ -সুরা আত তুর : ২৬-২৭

আল্লাহর সঙ্গে নিভৃতে মোনাজাত ও তার বন্ধুত্বের স্বাদ ছাড়া যদি হৃদয়ের ভীতির কোনো ফলাফল না থাকত, তবুও সেটিই হতো শ্রেষ্ঠ অর্জন ও আনন্দের উপলক্ষ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখেরাতকে ভয় করে এবং তার রবের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, (সে কি তার সমান, যে তা করে না?) বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? বোধশক্তি সম্পন্ন লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।’ -সুরা যুমার : ০৯

হৃদয়ের মধ্যে আল্লাহর ভীতির অন্যতম ফলাফল হলো এটি ব্যক্তিকে সৎকাজে প্রতিযোগিতা করতে অনুপ্রাণিত করে এবং তার দোয়া কবুল হয়। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো ব্যক্তির হৃদয়ে ভয়ভীতি এবং শঙ্কার পরিমাণ অনুপাতে সে ফেতনা ও কুপ্রবৃত্তি থেকে নিরাপদে থাকবে এবং আল্লাহ তার কাছে ইমানকে প্রিয় করে দেবেন ও সেটাকে তার হৃদয়গ্রাহী করবেন। অনুরূপভাবে সে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য নয় যে, সে ফাসাদপ্রিয়দের পথে চলবে; বরং সে নিজে তা থেকে মুক্ত এবং সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। কেননা প্রকৃত মুসলিম তো সেই ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অপর মুসলিমরা নিরাপদ।

হৃদয়ের কম্পন সৃষ্টজীবের প্রতি দয়া, পারস্পরিক আচরণে নম্রতা এবং অন্যদের রূঢ় আচরণের বিপরীতে সদয় আচরণের ফল দেয়। ভীত হৃদয়ের ব্যক্তি আল্লাহর রহমত লাভ করে। যে ব্যক্তি হৃদয়ের ভীতি, শঙ্কা এবং অন্তরের ব্যাধি থেকে হৃদয়ের নিষ্কলুষতার মতো অন্তরের গুণাবলির মধ্য থেকে এই মহান গুণটি অর্জনের ইচ্ছা করবে; তার কর্তব্য হলো আল্লাহর ভালোবাসা বাস্তবায়িত করা, আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা প্রাপ্তির প্রত্যাশা করা এবং তার আমল হয়তো তিনি কবুল করবেন না এই ভয়ে থাকা।

৩ ফেব্রুয়ারি মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান