অমর একুশে বইমেলা মানেই পাঠক-লেখকদের এক মিলনমেলা। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে মেলায় আসেন প্রিয় লেখকের নতুন বই সংগ্রহ করতে। লেখকরাও অধীর আগ্রহ নিয়ে পাঠকের অপেক্ষায় থাকেন। পাঠকরা বলছেন, মেলা মানেই নতুন বইয়ের উৎসব। পছন্দের লেখকের বই সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতা।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টায় বইমেলার দুয়ার খুলতেই দেখা যায় নানা বয়সী পাঠকের ভিড়। পাঠকরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন নিজের প্রিয় লেখকদেরসহ মেলায় আসা নতুন বইগুলো। স্টলে স্টলে ঘুরে বই দেখছেন। অনেকে আবার পছন্দমতো বই কিনছেনও।
মেলায় আসা জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জয়নাল একরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বইমেলা আমার কাছে আলাদা অনুভূতি। প্রতি বছর শুধু প্রহর গুনি কখন মেলা শুরু হবে আর কখন নতুন বই কিনে বাসায় ফিরব। তা ছাড়া মেলা যে শুধু বই কেনা হয়, তা নয়। মেলায় এলে লেখকদের সঙ্গে আমাদের মনের ভাববিনিময় ঘটে।’
তাম্রলিপি প্রকাশের বিক্রয়কর্মী তামান্না হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বইমেলায় সব ধরনের পাঠকই আসেন। এর মধ্যে একটি বৃহৎ অংশ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে তরুণ পাঠকের সংখ্যাই বেশি। এরা বিভিন্ন প্যাভিলিয়নে গিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বই কেনে।’
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পাঠক সুমনা আক্তার বলেন, ‘আমার উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে। হুয়ামূন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা খুব পছন্দ। তবে নতুন লেখকদের লেখা কয়েকটি বইও এবার কিনেছি, লেখক হিসেবে প্রাধান্য দেওয়ার আগে তাদের লেখা পড়তে চাই।’
জিনিয়াস পাবলিকেশন স্টলের পাশে খোশগল্পে আড্ডা দিতে দেখা যায় লেখক ফেরদৌস হাসানকে। পাঠকের আগ্রহ নিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বইমেলায় তরুণদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরও প্রচুর বই কিনছে, বই পড়ছে।’
নতুন বই : অমর একুশে বইমেলার সপ্তম দিন। মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায়, চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। গতকাল নতুন বই এসেছে ১০৪টি।
বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : মাহবুব তালুকদার’ শীর্ষক প্রবন্ধ। উপস্থাপন করেন গাজী রহমান। ‘স্মরণ : আলী ইমাম’ শীর্ষক আহমাদ মাযহার লিখিত প্রবন্ধ। তার অনুপস্থিতিতে পাঠ করেন মোকারম হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন ড. নিমাই ম-ল, আমীরুল ইসলাম এবং ওমর কায়সার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদুর রেজা সাগর।
প্রাবন্ধিকদ্বয় বলেন, জীবনের বিচিত্র বিকাশে এবং ব্যক্তিত্বের বহুতর প্রকাশে মাহবুব তালুকদারের অবস্থান তার অবিচল দৃঢ়তা এবং আত্মবোধের প্রতি পূর্ণ আস্থাই প্রমাণ করে। তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার ও ছোটগল্পের পারঙ্গম লেখক।
অপরদিকে পাঠ্যপুস্তকের নানা অনুশাসনের বাইরে শিশু-কিশোরদের অনাবিল আনন্দদান ও তাদের জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছেন আলী ইমাম। তার শিশুসাহিত্যপ্রীতি কেবল লেখালেখিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বিস্তৃত ছিল বেতার-টিভির ছোটদের অনুষ্ঠান পরিচালনা ও উপস্থাপনা থেকে শুরু করে শিশুসংগঠনের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ পর্যন্ত।
আলোচকরা বলেন, গভীর অনুভূতিসম্পন্ন সাহিত্যিক মাহবুব তালুকদারের লেখায় মানুষের জীবন, অন্তর জগতের কথা উঠে এসেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তিনি যেমন সমাজসচেতন ছড়া লিখেছেন, তেমনি আবার গভীর ভালোবাসার কবিতাও লিখেছেন। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও বাংলা সাহিত্যে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। বিরল সাহিত্যব্যক্তিত্ব আলী ইমাম ছিলেন বহুমাত্রিক চঞ্চল ও প্রাণবন্ত একজন মানুষ। বিজ্ঞানের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তার আগ্রহ নিবিষ্ট হয়নি। বাংলা শিশুসাহিত্যের অনন্য প্রাণবান লেখক আলী ইমাম যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তা শিশুদের বিশ্বনাগরিক হয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে।
সভাপতির বক্তব্যে ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, ‘আলী ইমাম ও মাহবুব তালুকদার বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল দুটি নাম। তারা তাদের চিন্তা, চেতনা ও সাহিত্যকর্ম দিয়ে আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।’
গতকাল ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন আবুল কাসেম, সাকিরা পারভীন, জালাল ফিরোজ ও পলাশ মাহবুব।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি জাহিদুল হক, গোলাম কিবরিয়া পিনু ও ইউসুফ রেজা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী কাজী মাহতাব সুমন, নায়লা তারান্নুম চৌধুরী ও সংগীতা চৌধুরী। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী তপন মজুমদার, মনোতোষ চক্রবর্তী, শামসেল হক চিশতি, এ এইচ এম সালাউদ্দিন, অণিমা মুক্তি গোমেজ, মো. মোখলেসুর রহমান ও মো. মুরাদ হোসেন। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন দীপক কুমার দাস (তবলা), রবিনস্ চৌধুরী (কিবোর্ড), রতন কুমার রায় (দোতারা), মো. হাসান আলী (বাঁশি) ও বিশ^জিৎ সেন (মন্দিরা)।
আজকের সময়সূচি : আজ ৮ ফেব্রুয়ারি। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
আলোচনা অনুষ্ঠান : বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি ওস্তাদ আলী আকবর খান’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সাইম রানা। আলোচনায় অংশ নেবেন কমল খালিদ ও আলী এফ এম রেজওয়ান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন শেখ সাদী খান।