ঢাকার মাঠের দল কী হবে সেটা ঠিক হবে আরব আমিরাতে! এবারের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে চলছে এই অবস্থাই। বিদেশি খেলোয়াড়দের আসা-না আসা নির্ভর করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলমান ইন্টারন্যাশনাল লিগ টি-টোয়েন্টির ওপর। ওদিকে আমিরাতে যে দল বাদ পড়ছে, এদিকে ঢাকায় সেই দলের বিদেশি খেলোয়াড়দের চাহিদা বাড়ছে। এই আসা যাওয়ার মিছিলে দুরবস্থা কোচদের। নিজের দলের একাদশ, কৌশল ও পরিকল্পনা, প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ কোনো কিছুরই থাকছে না ঠিকঠিকানা।
বিশ্বের নানা প্রান্তে একই সঙ্গে একাধিক লিগ চলছে বলে এবারের বিপিএলে বিদেশি খেলোয়াড় নিবন্ধন উন্মুক্ত রেখেছিল বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। সেই সুযোগে একেকটা দল যেন হয়ে উঠেছে ‘লোকাল বাস’। কোন বিদেশি কখন আসছেন, কখন যাচ্ছেন কোনো কিছুই ঠিক নেই। পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের পাকিস্তান সুপার লিগ খেলতে ৮ ফেব্রুয়ারির আগেই দেশে ফেরার কথা থাকলেও কেউ কেউ দেশে ফিরে আবার এক ম্যাচের জন্য খেলতে চলে এসেছেন। মোহাম্মদ আমির, ইমাদ ওয়াসিম, ইফতিখার আহমেদরা দল ছেড়ে দেশে গিয়ে পৌঁছানোর আগেই তাদের ফিরে আসার খবর চাউর হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
প্লে-অফে ওঠা চার দলের বিদেশি খেলোয়াড় তালিকাতেও আমূল পরিবর্তন, একেবারে খোলনলচে পালটে যাওয়ার দশা। ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে শুরু হচ্ছে পাকিস্তান সুপার লিগ আর ঠিক তার আগের দিন দুবাইতে ফাইনাল হবে আইএল টি-২০-এর। তাই পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের জায়গায় আসছেন আইএল টি-২০ এর ফাইনালে উঠতে না পারা দলের খেলোয়াড়রা।
রংপুর রাইডার্সের কোচ সোহেল ইসলাম সেটাই বললেন ম্যাচ শেষে, ‘প্রথম থেকে যেটা আলোচনা হচ্ছে, কে আসবে আর কে আসতে পারবে না, সেটা আইএলটি-২০ এর ওপর নির্ভর করছে। আসলে এটা নির্ভর করবে আজকের ম্যাচে কে জিতবে সেটার ওপর। সেখানে যারা এভেইলেবল হবে, তাদেরই আমরা নিয়ে আসার চেষ্টা করব।’
রংপুরের মোহাম্মদ নাওয়াজ, শোয়েব মালিক, হারিস রউফরা ফিরে গেছেন পাকিস্তানে। আইএল টি-২০ খেলে আসা ইংলিশ ক্রিকেটার টম কোহলার-ক্যাডমোরও চলে যাবেন পিএসএল খেলতে।
ক্রিকেটারদের এই আসা যাওয়ার মিছিল কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন কোচদের জন্য বলে মনে করেন সোহেল, ‘আমার কাছে মনে হয় এটাই বিপিএলের কোচদের জন্য সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এত বেশি অদলবদল হওয়ার কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদেশি নেই। যে জায়গার প্লেয়ারকে চাচ্ছি তাকে পাচ্ছি না। যে জায়গাগুলো আমাদের ফিলাপ করা প্রয়োজন, সেখানে আমরা ওভারসিজ প্লেয়ার নেওয়ার চেষ্টা করি। এটা খুবই ডিফিকাল্ট হয়ে যায়, দেখা যায় দুটো বিদেশি প্লেয়ার চেইঞ্জ হলে গোটা টিমের কম্বিনেশনটাই বদলে যাচ্ছে, এটা অনেকটাই চ্যালেঞ্জ।’
খেলোয়াড়ের অদলবদলে নিজেদের দল সাজানোটা যেমন হয়ে উঠেছে কঠিন, তেমনি প্রতিপক্ষকে নিয়ে বিশ্লেষণ করাটাও হয়ে উঠেছে কঠিন; কারণ কে কখন যে খেলতে আসছে সেটা কেউই যে জানে না! শুক্রবার ম্যাচশেষে জানিয়েছেন রংপুরের কোচ সোহেলই বললেন, ‘এটা আসলেই খুব ডিফিকাল্ট। আমরা ভিডিও অ্যানালিস্ট রাখি, আমরা সেগুলো দেখি এবং তা দেখেই আমরা গেমপ্লেন সাজাই। তো এটা আসলেই কঠিন হয়ে যায়। চ্যালেঞ্জিং হয়, আমরা একটা বিদেশিকে মাথায় রেখে প্ল্যান সাজাই কিন্তু মাঠে এসে দেখি একাদশে সে নেই। মাঠে আসার আগে পাওয়ার প্লেতে একভাবে খেলব বলে পরিকল্পনা সাজাই, কিন্তু মাঠে এসে সেটা বদলে ফেলতে হচ্ছে। তবে এটা নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সব দলেই এই চ্যালেঞ্জ থাকছে।’
এতে করে যে কোচদের শুধু নয়, সমস্যা হচ্ছে খেলোয়াড়দেরও। টম কোহলার-ক্যাডমোর দুবাইতে সপ্তাহ তিনেক কাটানোর পর বাংলাদেশে এসে দুটো ম্যাচ খেলেছেন, তাতে করেছেন ২০ এবং ১ রান। এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর রংপুর দলও তাকে ছেঁটে ফেলতে পারলেই বাঁচে! কারণ আরও অনেকেই যে আসার অপেক্ষায়। সোহেল অবশ্য ক্রিকেটারের খুব একটা দোষ দেখছেন না, ‘(আগের রাতে এসে পরের দিন খেলতে নামা) অবশ্যই কঠিন। কারণ আমাদের গুরবাজ আগের রাতে এসেই পরের দিন খেলতে নেমেছে। আসলেই তাদের জন্য কষ্টসাধ্য, কারণ ভেতরের যে প্রস্তুতি সেটা তারা করে ওঠার আগেই নেমে যেতে হচ্ছে মাঠে। তাই তাদের জন্য সেরাটা ডেলিভার করা কঠিন হয়ে ওঠে।
আজ দক্ষিণ আফ্রিকার টি-২০ লিগের ফাইনাল। ওই লিগে খেলা ডোয়াইন প্রিটোরিয়াসের দল হয়েছে পঞ্চম, তাই আগেভাগেই ছুটি পাওয়াতে বাংলাদেশে চলে এসেছেন এই প্রোটিয়া অলরাউন্ডার, খেলছেন ফরচুন বরিশালের হয়ে। ইংলিশ পেসার রিস টপলিরও খেলার কথা বরিশালের হয়ে। এসএ ২০ খেলে শারজায় দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে একটা ম্যাচ খেলেছেন টপলি। সেই ম্যাচে এমআই এমিরেটসের কাছে হার তার দলকে ছিটকে দিয়েছে আসর থেকে, তাই টপলিও চলে আসতে পারছেন বাংলাদেশে। ইংল্যান্ড দলের আসন্ন বাংলাদেশ সফরের আগে বিপিএলে খেলার অভিজ্ঞতাটা নিশ্চয়ই সাহায্য করবে তাকে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলা মোহাম্মদ রিজওয়ানও বলে গেলেন, ‘আমার জায়গায় কে আসবে আমি জানি না। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, কোনো বড় নাম খুঁজতে না যাওয়া। যে জায়গাটাতে যে পারবে তাকেই দলে নেওয়া।’
যে দল নিয়ে আসর শুরু করেছিল প্লে-অফের চার ফ্র্যাঞ্চাইজি, এখন সেই দলের চেহারায় অনেক বদল। নতুন সব বিদেশি মুখ চার দলেই। সবই সরাসরি সই করানো, তাই কত টাকায় এই খেলোয়াড়দের সই করানো হয়েছে সেসব জানারও সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে বদলে গেছে দলগুলোর শক্তিমত্তার সমীকরণও, ১২টা করে লিগ ম্যাচ খেলার পর তাই দল সাজাতে হচ্ছে প্রায় নতুন করেই। যেটা ঠিক হচ্ছে আরব আমিরাতের লিগের খেলার ফলের ওপর।