সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার বিচার সম্ভব নয় জানিয়ে রুনির ভাই নওশের রোমান বলেছেন, ‘তদন্তে বিন্দুমাত্র অগ্রগতি নেই। ১১ বছরেও যেহেতু বিচার পাইনি, তাই আমরা বিচার চাইতেও এখন লজ্জা পাই। বিচার চাইব কার কাছে।’
সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের ১১ বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল শনিবার। তাদের খুনের বিচার দাবিতে আয়োজিত দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীর অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন রুনির ভাই রোমান।
হত্যাকা-ের বিচার ও দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য অভিনবভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছে তাদের পরিবার। ‘সাগর-রুনি ক্রাইম সিন ডু নট ক্রস’ শিরোনামে গতকাল বেলা ১১টা থেকে দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে। চলে রাত ৮টা পর্যন্ত।
রুনির ভাই নওশের আলম রোমানদের বাড়িতেই (ফ্ল্যাট বি ২-১, কালিন্দী, ৩৬ ইন্দিরা রোড, ঢাকা) ১০ জন শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্ম ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে সাগর-রুনির ব্যবহার করা জিনিসপত্র, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও তাদের ছবি নিয়ে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। যে তিনটি কক্ষে প্রদর্শনী চলছে, তার একটিতে দম্পতি খুন হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া খবর। সেই সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ প্রধানের বক্তব্য টিভি স্ক্রিনে প্রচার করা হয়। সেদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন (প্রয়াত) বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে। খুনের দুদিন পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহামুদ খন্দকারও বলেছিলেন, তদন্তের ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। কক্ষটির এক কোণে রাখা পারিবারিক অনেক ছবি। আরও রয়েছে সাগরের লেখা কয়েকটি বই। সেখানে একটি ফ্রেমে বাঁধাই করা মাকে নিয়ে মাহিরের আঁকা একটি ছবি। সেখানে মাহির লিখেছে, ‘আই লাভ ইউ মা’।
এই সময় মাহির সরওয়ার মেঘ বলেন, ‘সব সময় বাবা-মাকে মনে পড়ে। সপ্তাহে একবার তাদের কবরের পাশে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমি বাবা-মা হত্যার বিচার চাই।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে নিজ বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি। তাদের হত্যাকারী এখনো শনাক্ত হয়নি। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার কথা বলা হলেও এর কোনো কূলকিনারা নেই। রোমান বলেন, ঘণ্টা, মাস, বছর পেরিয়ে কত কী যে হলো, শুধু প্রাপ্তির খাতায় নিদারুণ শূন্যতা। আদালতের ধুলোপড়া বারান্দায় পড়ে রইল তদন্তের ব্যর্থতা।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত জমা না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। তারা বলেছেন, সাগর-রুনির হত্যার পর থেকে সাংবাদিক সমাজ দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে। এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত ডিআরইউ ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচার ডিআরইউ চত্বরে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ১১তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। ডিআরইউ আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মুরসালিন নোমানী। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। ডিআরইউ সভাপতি বলেন, সাগর-রুনি হত্যার পর ডিআরইউ সব সাংবাদিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং এই হত্যার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধভাবে সব কর্মসূচি পালন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কিন্তু এই হত্যার বিচার এখনো হয়নি। এই হত্যার তদন্ত করছে র্যাব। র্যাব আদালতের কাছে ৯৫ বার সময় চেয়েছে। আদালত তাদের সময় দিয়েছে। কিন্তু র্যাব যদি না পারে তাহলে উনারা আদালতকে বলুক যে তারা পারছে না।
সাংবাদিক হত্যার বিচার হচ্ছে না উল্লেখ করে নোমানী বলেন, সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ক্ষেত্রে যারাই যখন ক্ষমতায় থাকুক না কেন সবার আচরণ অভিন্ন। অন্য সব হত্যার বিচার হলেও সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না।
প্রতিবাদ সমাবেশে র্যাবকে উদ্দেশ্য করে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী বলেন, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে তদন্ত প্রতিবেদন যদি দাখিল করেন তাহলে র্যাবের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করব। নিজেদের এলিট ফোর্স বলেন। আর সাগর-রুনির হত্যার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৯৫ বার সময় নেন! আর এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় যে, সাগর-রুনির হত্যার প্রতিবেদন দাখিলে র্যাবের সদিচ্ছার অভাব আছে। আমি প্রত্যাশা করি, র্যাবের বোধোদয় হবে এবং তারা স্বচ্ছ প্রতিবেদন দাখিল করবে।
ডিআরইউর সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ বলেন, সাগর-রুনি হত্যার বিচার না হওয়ার কারণে আরও ৫৪ জন সাংবাদিক হত্যা হয়েছে। সুতরাং যদি সাগর-রুনির হত্যার বিচার হতো তাহলে এসব সাংবাদিক হত্যা হতো না।
আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, সাগর-রুনিসহ সব সাংবাদিক হত্যার বিচারের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাংবাদিক ইউনিয়ন এই কর্মসূচি পালন করে।