কম্পন-তরঙ্গ থেকে যে শক্তির সৃষ্টি হয়, তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই তরঙ্গ ভূগর্ভের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপন্ন হয় এবং উৎসস্থল থেকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে, অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে। বেশিরভাগ ভূমিকম্পের কারণ হচ্ছে, ভূগর্ভে ফাটল ও স্তরচ্যুতি হওয়া। ভূমিকম্পে রেলপথ, সড়কপথ, পাইপলাইন প্রভৃতি ভেঙে যায় এবং যাতায়াত ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। প্রকৃতিসৃষ্ট এই ধ্বংসলীলা মোকাবিলায়, পৃথিবীর বহু দেশ বিভিন্নভাবে জনগণকে সচেতন করে যাচ্ছে। একইসঙ্গে, সরকারের পক্ষে মানুষকে বাঁচাতে গ্রহণ করছে নানামুখী পদক্ষেপ। সেখানে বাংলাদেশের বাস্তবতা কী? প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করে, আধুনিকতার সঙ্গে মিল রেখে, জনগণকে সচেতন করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে?
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বাংলাদেশে ৮টি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা বা ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ভূমিকম্পে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি। ঘনবসতি, অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে ঢাকাসহ দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহরগুলো রয়েছে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে। এর বড় কারণ হচ্ছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ।
গতকাল দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘বিপদ অপরিকল্পিত পাইলিংয়ে’ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের প্রধান শহরগুলোতে জলাশয় ও নিচু ভূমি ভরাট করে গড়ে উঠছে সুউচ্চ সব ভবন। তবে নিচু ভূমির মাটির নিচে কাদামাটির পরিমাণ বেশি। কিন্তু ভবন মালিক বা ডেভেলপাররা মাটির নিচে ভবনের ভিত মজবুত করতে, প্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করে থাকনে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়েছে ভূতত্ত্ববিদ, ভূগোলবিদ ও প্রকৌশলী সবারই অভিমত দেশে অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করা হয় না। এসব ভবনেই ঝুঁকি বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঢাকার আশপাশের পুরো এলাকা জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠেছে। এসব ভবন কি নির্মাণবিধি মেনে নির্মিত হয়েছে?
প্রকাশিত সংবাদে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হচ্ছে না। আর এতেই চিন্তার কারণ বাড়ছে। ভূমিকম্প হলে, শক্তিগুলো বের হয়ে যেত। কিন্তু ভূমিকম্প না হওয়ায়, শক্তিগুলো জমা হয়ে বড় ভূমিকম্প হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এর মানে, একটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ! প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি অপেক্ষায় থাকব একটি মহাবিপর্যয়ের, নাকি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করব?
প্রত্যেক সচেতন মানুষের মনে রাখা দরকার, সব কিছুর একটা সহ্যসীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে, পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। বিজ্ঞানী নিউটনের সেই তৃতীয় সূত্র ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে’। ভুলে গেলে চলবে না, আঘাত করলে, সমপরিমাণ পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই যে মাটির ওপর, অবৈজ্ঞানিকভাবে ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে তার রেশ টেনে ধরা দরকার। ভুলে গেলে চলবে না, এই বসুন্ধরারও একটা সহ্যসীমা আছে।
নগরায়ণ এবং আধুনিকতাকে সঙ্গী করে, বৈজ্ঞানিকভাবেই আমাদের অগ্রসর হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য, দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। নির্মাণের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষ, নির্মাণ আইন মেনে একের পর এক ভবন নির্মাণ করছেন, নাকি অতি লোভে যেনতেনভাবে ভবন নির্মাণ করে, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছেন!
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অপমৃত্যু কেউ চায় না। ভয়ংকর প্রলয়ের জন্য, বোকার মতো অপেক্ষা না করে জীবনকে ভালোবেসে, মানুষকে ভালোবেসে সতর্ক হওয়া জরুরি।