চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সে যোগ দিতে খানিকটা দেরিই হয়ে যায় কার্টিস ক্যাম্ফারের। ততদিনে প্লে-অফের সমীকরণ থেকে ছিটকে গেছে তার দল। তবে আইরিশ এই অলরাউন্ডার যতটা পারছেন কাজে লাগিয়েছেন বাংলাদেশে থাকা এই সময়টা। কারণ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ শেষের মাসখানেকের ভেতরই পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসবে আয়ারল্যান্ড। টি-টোয়েন্টিতে ডাবল-হ্যাটট্রিক করা ক্যাম্ফার অভিবাসন, বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতিসহ অনেক বিষয়েই আলাপ করেছেন দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমানের সঙ্গে।
আপনার জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়, খেলেছেন প্রোটিয়াদের অনূর্ধ-১৯ দলেও। কীভাবে আইরিশ পাসপোর্ট পেয়েছেন?
কার্টিস ক্যাম্ফার: আমি আইরিশ পাসপোর্ট পেয়েছি আমার দাদির সূত্রে। আমি আয়ারল্যান্ড দলের প্রধান কোচ ও কয়েকজন ক্লাব কোচের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম, একটা প্রস্তুতি ম্যাচে আইরিশদের বিপক্ষে খেলি এবং ভালোও করি। তখন তারাই আমাকে প্রস্তাব দেন আয়ারল্যান্ডে এসে ক্লাব ক্রিকেট খেলার। এরপর একসময় আমি জাতীয় দলে ডাক পাই।
আয়ারল্যান্ড দল থেকেই অনেকে পরে ইংল্যান্ড দলের হয়ে খেলেছেন, যেমন এউইন মরগান। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে আয়ারল্যান্ডে কেন?
ক্যাম্ফার: আয়ারল্যান্ড উঠতি একটা দল। আমারও বেশ কম বয়সে সুযোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার আর আমি সেই সুযোগটাই নিয়েছি। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডের জীবনযাত্রাও অনেক ভালো, এই দেশটাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে আর ইউরোপে থিতু হওয়াটাও একটা বড় কারণ। এখানকার জীবনযাপনের ধরন...আর ডাবলিন অসাধারণ একটা শহর। এখানকার ক্রিকেট সংস্কৃতি আর আইরিশ ক্রিকেট যেসব প্রকল্প হাতে নিচ্ছে...সবকিছুই খুবই আকর্ষণীয়। দলটাও তৈরি, অনেক খেলোয়াড় উঠে আসছে...জশ লিটল পিএসএলে খেলেছে, অনেকেই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলেছে...আমাদের অধিনায়ক অ্যান্ডি বালবার্নি তো বিপিএলেই এসেছে। সবকিছু মিলিয়েই মনে হয়েছে অল্প বয়সে অনেকগুলো সুযোগ আমার সামনে এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ক্রিকেটারদের দেশান্তরের উদাহরণ কম নেই। কেভিন পিটারসেন, জেসন রয়, ডেভন কনওয়ে, মার্নাস লাবুশেন...অনেকেই প্রোটিয়া জার্সি গায়ে না তুলে বেছে নিয়েছেন অন্য রং। তাই বলে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডের বদলে, আয়ারল্যান্ডের মতো দলে কেন?
কার্টিস ক্যাম্ফার: আমার স্বপ্ন ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা আর আমি আয়ারল্যান্ডের হয়ে সেটা করছি, এতটুকুতেই আমি খুশি। আমার আসলে অন্য কোনো কিছু নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। আমি আইরিশ ক্রিকেটের জন্য কতটা ভালো করতে পারি সেটাই ভাবছি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করলে অন্য অনেক জায়গায় খেলার সুযোগ তৈরি হবে, এই যেমন এবারের বিপিএলে ডাক পেলাম। এখন অনেক টুর্নামেন্ট হচ্ছে, আমি যদি আমার কাজটা ভালোভাবে করতে পারি, তাহলে আমি কোথা থেকে এসেছি সেই প্রশ্ন উঠবে না।
বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড সিরিজের খেলাগুলো যে ভেন্যুতে হবে, তার সবকটিতেই আপনার খেলা হয়েছে। এর আগে আয়ারল্যান্ড উলভসের হয়ে খেলতে এসে খেলেছিলেন চট্টগ্রামে, এবার সিলেট ভেন্যুও দেখলেন, মিরপুরে তো খেলছেনই। কী মনে হয়, ভেন্যুগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে একটা বাড়তি সুবিধা পাবেন?
ক্যাম্ফার: ১০০ ভাগ। এই ভেন্যুগুলোতে খেলার অভিজ্ঞতা হওয়াতে আমি বাড়তি একটা সুবিধা পাব। আগেভাগে এসে, কন্ডিশন আর খেলোয়াড়দের দেখে নেওয়া গেল। আমি সত্যিই খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি আয়ারল্যান্ডের হয়ে প্রথম টেস্টটা খেলার জন্য। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টির জন্য বাংলাদেশ খুব শক্ত প্রতিপক্ষ। আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি বিপিএলে বাংলাদেশে এসে। যেমনটা বলছিলেন চট্টগ্রামে খেলা, সেখানের উইকেট নিয়ে ধারনা আছে। সিলেটে খেলা, সেখানের উইকেটটাও জানলাম। আর মিরপুরে খেলে এটাও জানা হলো। আমি বাংলাদেশ সফরের তিন ফরম্যাটের দলেই আছি। আশা করছি টেস্ট একাদশে খেলতে পারব। তখন মিরপুরের উইকেটের অভিজ্ঞতা আমার খুব কাজে দিবে। আমি তো এখানে বোলিং করলাম, আবার ব্যাটিংও করেছি। টেস্টে অবশ্যই টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে থেকে আলাদা পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু কাজ তো একই থাকবে। যেমন আন্তর্জজাতিক ক্রিকেটে আপনি বোলার বা ব্যাটার যাই হোন না কেন, নির্দিষ্ট কিছু কাজ তো থাকেই। আশা করছি বিপিএলে সেসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ সিরিজে কাজে লাগবে। আয়ারল্যান্ডের হয়ে বাংলাদেশ সফরে আসার সুযোগের দিকে তাকিয়েই মাত্র মাসখানেক আগে বাংলাদেশে খেলার সুযোগটা না বলার কোনো কারণ ছিল না। এখানে আসা, অভিজ্ঞতাটা নেওয়া, বিশ্বের সেরা অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলা। এখান থেকে যা পাচ্ছি সবই কাজে লাগবে।
আইরিশ জাতীয় দলের কোচ, আপনার সতীর্থ খেলোয়াড় এবং যারা দলের কৌশল নির্ধারণ করেন তারা নিশ্চয়ই আপনার কাছ থেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন এখানকার কন্ডিশন সম্পর্কে। বিশেষ করে সিলেট, যেখানে আগে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। সেখানকার উইকেট কন্ডিশন কেমন এসব নিয়ে কথা কি হয়?
ক্যাম্ফার: আমাদের প্রধান কোচের সঙ্গে এর মধ্যেই কথা হয়েছে, আমাদের অধিনায়ক অ্যান্ড্রু বালবার্নি সেও কথা বলেছে। আমাকে বলেছে যত পারি আমি যেন নোট নিই, গুরুতপূর্ণ তথ্যগুলো লিখে রাখি আর বিপিএল খেলে দেশে ফেরার পর যেন সবার সঙ্গে তথ্যগুলো ভাগাভাগি করি, কারণ আমাদের হাতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ থাকবে বাংলাদেশে আসার আগে। উইকেট খুব ভালো, তবে শিশির একটা বড় ভূমিকা পালন করবে। এখনো জানি না ম্যাচগুলো ডে-নাইট হবে নাকি সব দিনের আলোয় হবে, তবে রাতের বেলায় উইকেট একটু ভেজা ভেজা থাকে। অবশ্যই এই ছোট ছোট তথ্যগুলো কাজে দেবে যখন আয়ারল্যান্ডের হয়ে যখন খেলতে আসব। আর এই চিন্তাটা শুধু আমি না, বালবার্নিও করছে। আপনারা জানেন বালবার্নিও এই বিপিএলে খেলছে। আসলে এসব তো ক্রিকেটার বা ক্রিকেট দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে কোন দলের কোন দেশ সফরে ওই দেশে খেলা কোন ক্রিকেটারের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নেয়া হয়।
ইংল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ডে সাধারণত বল সুইং করে বেশি, উপমহাদেশের উইকেটে তেমনটা হয় না। এখানে এসে খেলে কী বুঝলেন, আপনার বোলিংয়ে কোন বিষয়গুলো বদল করতে হবে এখানকার উইকেটে সফল হতে গেলে?
ক্যাম্ফার: ইংল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ডে বোলিংটা অনেকটাই সিম পজিশনের ওপর নির্ভর করে, সুইং করে বল ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা থাকে। এখানে অনেক বেশি কাটার আর ক্রস সিম ডেলিভারি করতে হয়। বল একটু থেমে থেমে যায়, উইকেটে একটু আঁকড়ে থাকে বল। তাই নিজের বোলিংয়ে একটু বদল আনতে হয়, এটা ক্রিকেটারের জীবনেরই অংশ। এখানে উইকেট অনেক বেশি ফ্ল্যাট, তাই স্টাম্পের যত কাছে বল করা যায় ততই ভালো। রান করতে যেন কষ্ট হয়ে ব্যাটসম্যানের। এসব তো করতেই হয়, কারণ সব ম্যাচ তো আর এক জায়গায় খেলা যায় না।
দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের নিজস্ব টি-টোয়েন্টি লিগ চালু করেছে, জাতীয়তা বদল না করলে ওখানেও খেলতে পারতেন বিপিএলের জায়গায়। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে না খেলায় কোনো আক্ষেপ আছে?
ক্যাম্ফার: একদমই না। এখন আয়ারল্যান্ডই আমার ঘরবাড়ি। আমি আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলাটাই উপভোগ করছি। আমার পরিবার এখনো দক্ষিণ আফ্রিকাতেই আছে। আশা করছি একদিন আয়ারল্যান্ডের হয়ে ওখানে খেলতে যাব আর আমার পরিবারের লোকজন মাঠে এসে আমার খেলা দেখবে।