ফর্মুলা চলচ্চিত্রের ব্যবসায়ী, কলাকুশলীদের ‘চলচ্চিত্র আন্দোলন’ আমরা মাত্র একবারই দেখেছি। আর সে ‘আন্দোলন’ ভারতীয় চলচ্চিত্র বাংলাদেশে প্রদর্শন বন্ধের দাবিতে। এ কারণে তারা সম্মিলিতভাবে কাফনের কাপড় পরে নগরীর পথে মিছিল করেছেন। কিন্তু কথা হলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একচেটিয়া বাজারের সুবিধা দিয়ে রাখা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্র বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় না। তাতে গত ৫১ বছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কতটুকু বিকশিত হয়েছে?
আমরা দেখেছিবাংলাদেশের চলচ্চিত্রের যারা ব্যবসায়ী, যারা প্রধানত চলচ্চিত্র পেশাজীবীতারা কখনো চলচ্চিত্র আন্দোলনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেননি। চলচ্চিত্র আন্দোলন এ দেশে তারাই করেন বা করেছেন বা করে চলেছেন, যারা চলচ্চিত্রে শিল্প ও জীবনবিদ্যার সম্মিলন দেখতে পান, তারাই দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে ‘ঘরের খেয়ে সমাজ নামের বনের মোষ তাড়ান’।
এ কথা সবাই জানেন যে, বাংলাদেশে চলচ্চিত্রচর্চা, চলচ্চিত্র চিন্তাচর্চার প্রধান তৎপরতা দেশের ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’ বা ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট। দেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর। এই ষাট বছরে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন বাংলাদেশের কয়েকটি প্রজন্মকে বিশ্ব চলচ্চিত্র দেখার চোখ ফুটিয়েছে বা চলচ্চিত্র ‘দেখতে’ ও ‘পড়তে’ শিখিয়েছে। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দেশে ভিন্নধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলন দানা বাঁধে, যা পরে ‘বিকল্পধারার’ চলচ্চিত্র আন্দোলন নামে পরিচিত হয়। এই ‘বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন’ই বাংলাদেশে চিন্তাশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলনের প্রথম ঘোষিত আন্দোলন।
আজও বাংলাদেশে চলচ্চিত্র চিন্তার যেকোনো আন্দোলনের আঁতুড়ঘর দেশের চলচ্চিত্র সংসদমূহ। এই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে বন্দি করা ও এর গতিশীলতা রুদ্ধ করতে ১৯৮০ সালে ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধন আইন ১৯৮০’ প্রণয়ন করে সরকার। প্রায় ত্রিশ বছর এই আইনের বিরুদ্ধে এবং এই ‘কালাকানুন’ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করার পরে ২০১১ সালে দেশের সরকার এই আইনটিকে ‘শিথিল’ করে নবরূপে ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিবন্ধন আইন ২০১১’ জারি করে।
আজ বাংলাদেশে চলচ্চিত্র আইনত বন্দি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যে আইনত বন্দি এ কথাটি এ দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা বা চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের আগে কখনো মনে হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’ এবং ‘শনিবারের বিকেল’-কে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট অনেকে একত্রে সরব হয়েছেন, নিজেদের বন্দিত্ব নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, দেশের চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সব আইনকানুন সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা দরকার। যে আইনগুলো আছে তার সবগুলোই দমনমূলক আইন।
মানবীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন জীবনমুখী, রুচিশীল ও শিল্পমানসমৃদ্ধ’ চলচ্চিত্রের ‘সরকারি’ কোটার ছক কাটা আছে। সেই ছকে বসেই যত যা কিছু করার ‘প্রয়াস’ চালিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির ভাতঘুম এসে যায়। এভাবেই চলছে আমাদের চলচ্চিত্রের নিত্যদিনের আহার-নিদ্রা।
এর বাইরে হঠাৎ কোথা থেকে হুট করে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ নিয়ে হাজির হয় আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, এরও আগে এ রকমই আচমকা আগমন ঘটেছিল জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ অথবা ‘জীবন থেকে নেয়া’ নিয়ে, আলমগীর কবিরের ‘রূপালি সৈকতে’, শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকেরের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর ‘ঘুড্ডি’, শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’, মোরশেদুল ইসলামের ‘চাকা’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পারে’, ইয়াসমিন কবিরের ‘স্বাধীনতা’ বা ‘পরবাসী মন আমার’, তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’, ‘মাটির ময়না’ অথবা তারেক মাসুদের আশ্চর্য ‘আদম সুরত’।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলন প্রধানত চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকর্মীদের আন্দোলন ছিল। আমাদের দেশের শিক্ষিত মানুষেরা চলচ্চিত্রের শিক্ষা প্রসঙ্গে অজ্ঞান ছিলেন, চলচ্চিত্র শিক্ষার বিস্তারে এই আন্দোলন করেছে দেশের চলচ্চিত্র সংসদসমূহ। দেশের চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের বর্তমানের অন্যতম প্রধান দাবি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হোক। এই প্রতিষ্ঠান তৈরি ছাড়া দেশে চলচ্চিত্রচর্চার জাতীয় কাঠামো গড়ে উঠবে না।
বাংলাদেশে এখন চলচ্চিত্র আন্দোলনের যে জোরালো বাতাস বইছে তা চলচ্চিত্রের স্বাধীনতার আন্দোলন। চলচ্চিত্রের স্বাধীনতার আন্দোলনকারীরা কিছু ‘কমন’ ইস্যু, যা রাষ্ট্রের আইন-নীতিমালা তথা সেন্সরবিষয়ক জটিলতা, যা এসব পক্ষকেই মোকাবিলা করতে হয়, তার মীমাংসায় একজোট হতে পারে কি নাতার ওপর নির্ভর করছে সব। ফলে চলচ্চিত্রের ‘স্বাধীনতা’র প্রশ্নে যে জোরালো হাওয়া বইছে তা দেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির জন্য অতি উত্তম। কিন্তু ‘এ হাওয়া আমায় নেবে কতদূরে’?