অনেক ত্যাগ আর প্রাণের বিনিময়ে যে বাংলা ভাষা, সেটি সমুন্নত রাখার দৃপ্ত শপথ এসেছে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠে। গতকাল মঙ্গলবার ভাষার দিনে সব পথ মিলে গিয়েছিল শহীদ মিনারে। দিনটি বাঙালির জন্য একই সঙ্গে গর্বের ও শোকের। দেশে ও দেশের বাইরে শোক আর শ্রদ্ধায় অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার এ দিনটিতে স্মরণ করা হয় ভাষার আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া শহীদদের। করোনাভাইরাস মহামারীর পর গত দুই বছর বাঙালির এই গর্বের দিনটি উদযাপিত হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে। এবার পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই ভিন্ন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একুশের প্রথম প্রহর থেকেই ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। প্রভাতফেরিতে আসা নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কণ্ঠে ছিল কালজয়ী সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’। এরপর শ্রদ্ধার ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনারের বেদি।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মত্যাগের এই দিনটিকে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে দেশে ও দেশের বাইরে দিবসটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। গতকাল নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করেছেন দেশবাসী। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরসহ বিদেশে বাংলাদেশের সকল মিশনে এ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর রাষ্ট্রপতি পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান তাকে স্বাগত জানান। প্রথমে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানান। ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এ সময় নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনীতিক, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা দলের পক্ষে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবকের মাধ্যমে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানান।
এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল এম শাহীন ইকবাল, বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির পক্ষে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের পক্ষে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান, র্যাব, বিজিবি, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাসদের নেতারা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সর্বস্তরের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য শহীদ মিনার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় মানুষের ঢল নামে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের সারি দীর্ঘ হতে থাকে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলা ৩৫ কোটি মানুষের মায়ের ভাষা। অথচ এই ভাষা আজ পর্যন্ত জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি পায়নি। আমরা আবারও জাতিসংঘের কাছে দাবি জানাব।’ এ সময় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যারা একুশের চেতনায় বিশ্বাস করে না, তারা একাত্তরের চেতনাকেও বিশ্বাস করে না। একাত্তরের চেতনা আর একুশের চেতনা একই চেতনা। আজকে বিএনপির নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী, অপশক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।’ এ সময় ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনো একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেনি। ৭৫-এ কৃষক, শ্রমিক নিয়ে আওয়ামী লীগ যে দল গঠন করেছিল, সেটা এক দল নয়। সব দলের সমন্বয়ে এটা ছিল জাতীয় দল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জিয়াউর রহমান দরখাস্ত করে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। তাই কাউকে কটাক্ষ করার কোনো অধিকার বিএনপির নেই।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। তবে দুপুরে দলের নেতারা অভিযোগ করেন ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এসে তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষার পর তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। শ্রদ্ধা জানানো শেষে দুপুর ১২টার দিকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজ বপন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক। সেই চেতনা ছিল দেশ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হবে, এ দেশের জনগণ নিজের হাতে ভোট দিয়ে নিজেদের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু বর্তমানে সরকারে যারা আছে তারা এ দেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। আজকে দেশে গণতন্ত্র নাই, মানবাধিকার নাই। চলছে ক্ষমতাসীনদেরে লুটপাট, দুর্নীতি।’ বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মিনারে বিদেশি কূটনীতিকদের শ্রদ্ধা ও বাংলায় স্মরণ : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাদের বাংলা ভাষায় স্মরণ করেছে ঢাকায় অবস্থিত বিশে^র বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, মিশন, হাইকমিশন ও কনস্যুলেট।
শহীদ মিনারে বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদেশি কূটনীতিকরা ডিপ্লোম্যাটিক কোরের ডিনের নেতৃতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এ সময় ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডেলিগেশন প্রধান ও অন্যান্য দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত, মিশনপ্রধান ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
গত সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিটে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর কূটনীতিকরা শ্রদ্ধা জানান।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘দিনটিতে সেই সব সাহসী বাংলাদেশিকে স্মরণ করা হয়, যারা বাংলা ভাষায় পড়া, লেখা ও কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।’
ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন বলেন, ‘চার বছর ধরে এখানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত এবং আমি প্রত্যক্ষ করেছি মাতৃভাষার প্রতি দৃঢ় ভালোবাসা।’
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি বলেন, ‘আমি ডাচ ও ফ্রেঞ্চ জানি। তবে যদি সম্ভব হয়, আমরা সবাই মাতৃভাষায় কথা বলতে পছন্দ করি। আমি বাংলা শিখতে চাই এবং আমি আশা করি সামনের বছর আমি বাংলায় বক্তব্য রাখব।’
ফ্রান্স দূতাবাসের কালচারাল অ্যাটাশে ইয়োহান গিগারেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘আমি বাংলায় গান গাই’ শিরোনামের গানটি পরিবেশন করেন।
ভারতীয় হাইকমিশনের বার্তায় বলা হয়, ‘আসুন, আমরা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দৃঢ় বন্ধন এবং এই দুই দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করি।’ অন্যান্য দূতাবাসের ফেসবুক পেজেও ভাষাশহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা এবং সবাইকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা জানানো হয়।