হোমে ‘গেরিলা যুদ্ধ’ করবেন হাথুরু

বাংলাদেশে ফেরার ব্যাপারে আপনার পুরো চিন্তা বা প্রক্রিয়া কী ছিল?

হাথুরুসিংহে : আমি চলে গেলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অনুসরণ করেছি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম কোনো না কোনোভাবে। সময়ে সময়ে ক্রিকেটার বা বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হতো। তাই সবসময়ই একটা ইচ্ছা ছিল যে আমি একদিন বাংলাদেশ ক্রিকেটে ফিরব, কিন্তু জানতাম না যে এখনই ফিরব। অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালীন (বিসিবির) প্রেসিডেন্ট ও কিছু কর্তার সঙ্গে কথা বলে মনে হলো সামনে ২০২৩ বিশ্বকাপ আছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ফেরাটা সঠিক সময়। তাই বিগ ব্যাশ শেষ হওয়ার পরপরই আমি এখানে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই।

আগেরবার দায়িত্ব ছাড়ার সময় বিসিবি প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আপনার আর কিছু দেওয়ার নেই বলে চলে যাচ্ছেন। নতুন দায়িত্বে আপনার ভাবনাটা বদলালো কীভাবে?

হাথুরু : আমি আমার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে বলছি, আমি মনে করি পরের তিন-চার বছরে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। অভিজ্ঞরা দারুণ করেছে, ওদের ঘিরে একটা ক্রিকেট জেনারেশন তৈরি হয়েছে। এখন অনেক তরুণ ক্রিকেটারও আছে। ওদের সঙ্গে নতুন করে কাজ করাটা আমাকে নতুনভাবে বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আপনার ওপর বিশ্বকাপে ভালো করার একটা চাপ থাকবে। সেটা কীভাবে দেখছেন?

হাথুরু : কোচরা সবসময়ই চাপে থাকে। দল ভালো করলে কোচরা ভালো, খারাপ করলে কোচকেই প্রশ্ন বেশি করা হয়। এটা স্বাভাবিক। বিশ্বকাপ নিয়ে সবার একটা প্রত্যাশা থাকে, জাতি হিসেবে থাকে, ভারতের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও এমনটাই থাকবে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে কীভাবে নিজেদের সেরা ফিটনেস ধরে পারফরম করে যেতে পারি। এটা যদি ঠিক থাকে তাহলে বিশ্বকাপে আমরা সেরা খেলাটাই দিতে পারব।

ইংল্যান্ড সিরিজের দল কেমন হয়েছে। নতুন যারা আছে, পেসার-স্পিনারদের নিয়ে কী বলবেন?

হাথুরু : এখনো নতুন পেসার বা স্পিনারদের দেখিনি। ইংল্যান্ড সিরিজে দেখব। ব্যাটাররা জানি ভালো করছে অনেকদিন ধরেই। ভারতের সঙ্গে ভালো করেছে। আমরা চাইব একই ফল ইংল্যান্ড সিরিজেও নিয়ে আসতে। এখন আমি দলের অন্য কোচদের ওপর নির্ভর করছি দল সম্পর্কে ধারণা পেতে।

২০১৭-এর চেয়ে এবার আপনার অধীনে বাংলাদেশ ভালো ফল করতে পারবে?

হাথুরু : আমি যেটা মনে করি এখনো আমরা র‌্যাংকিংয়ে সেরা চারে নেই যে বলে  দেব আমরা বিশ্বকাপে ভালো করব। এটা উচিত হবে না। আমাদের কিছু দিকে ভালো করতে হবে, স্কিল ও ফিটনেস এবং পারফরম্যান্সের সমন্বয় ঘটাতে হবে। এরপর দেখব আমরা কতটুকু অর্জন করতে পারি।

অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সামলাতে আপনার চ্যালেঞ্জটা কেমন হবে?

হাথুরু : আমি ইতিমধ্যেই সব অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলেছি। ওদের সবার চিন্তার অংশ জুড়ে আছে দল। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সামলাতে আমার প্রথমবারেও কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল না। আমার মূল চ্যালেঞ্জ হলো সব ক্রিকেটারকে দলনির্ভর করা। তাই সাকিব-তামিম-মুশফিকদের নিয়ে আমার কোনো বাড়তি চ্যালেঞ্জ নেই। ওরা (অভিজ্ঞরা) ১২-১৫ বছর ধরে দলের জন্য যে দায়িত্বটা পালন করে আসছে এখনো তাই করবে। আমার মূল লক্ষ্য হলো দল। এই পুরো সময়টা ওরা নিজের দায়িত্বে সফল হয়েই ক্রিকেটার হিসেবে সফল হয়েছে। তাই যতদিন ওরা জাতীয় দলের জন্য নির্বাচিত হবে ততদিন একই দায়িত্ব থাকবে দলের জন্য পারফরম করা।

দ্বিতীয়বারের দায়িত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

হাথুরু : প্রথমবার জানতাম না আমি কোথায় যাচ্ছি, আমার নিজেকেও অনেকের কাছে প্রমাণ করার ছিল। কিন্তু এবার আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। আমি নিজেও অনেকটা অভিজ্ঞ হয়েছি। বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার আরও একটি কারণ দেখছি বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নের অংশ হতে পারা। আপনারা জানেন ডেভিড মুর আমার আগেই এখানে এসেছে। তাকে নিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের উন্নয়ন করা এবং স্থানীয় কোচদের উন্নতিও আমার লক্ষ্য। আসলে আমি চাই দ্বিতীয়বারের এই অভিযানে শুধু বাংলাদেশের হয়ে ম্যাচ জেতাই আমার মূল লক্ষ্য না, অবশ্যই সেটা আমার এক নম্বর লক্ষ্য থাকবে কিন্তু আমি চাই বাংলাদেশ ক্রিকেটকে কিছু দিতে এবং এই দেশের ক্রিকেটের জন্য কিছু রেখে যেতে।

আপনি গতবার বলেছিলেন দলের প্রতি সাকিবের নিবেদনের অভাব আছে। এখনো কি তাই বলবেন?

হাথুরু : আমার মনে হয় সাকিবের দলের প্রতি নিবেদন কম সে ব্যাপারে প্রশ্ন করেছি কিনা? একদমই না। এটা আমার কাছে একদম নতুন খবর। আমি এমন কিছু কখনই বলেছি বা ভেবেছি বলে মনে হয় না।

আপনি দায়িত্ব ছাড়ার পর বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা খেলার বাইরেও সরব হয়ে উঠেছে। যেমন শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মাঠে বা বাইরে কথার লড়াইয়ে নেমেছিল। ব্যাপারগুলো আপনি কীভাবে দেখেন?

হাথুরু : আমি খুবই উপভোগ করি। প্রথম দায়িত্বকালে আমি ওদের এটাই শিখিয়েছিলাম যে সাহস নিয়ে লড়াই করো। নিদাহাস ট্রফিতে বা এশিয়া কাপে ওরা যেভাবে লড়াই করেছে সেটা আমার ভালো লেগেছে। ভিন্ন ড্রেসিংরুমে বা অন্য কোথাও থাকলেও আমি ওই ঘটনাগুলোতে গর্বিত ছিলাম। তো বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের এই পরিবর্তন আমি উপভোগ করেছি।

আপনার দায়িত্ব ছাড়ার পর আর এখন নতুন করে দায়িত্ব নেওয়ার মাঝের সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটে কি উন্নতি দেখেছেন?

হাথুরু : বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি করেছে। যদিও সেটা লম্বা গ্যাপ দিয়ে, যেমন নিউজিল্যান্ডে মাত্র একটি জয়, পাশাপাশি দেশে কিছু ভালো করেছে। সেদিক থেকে টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে বাংলাদেশের। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আমাদের সম্ভবত নিজেদের সেরাটা খুঁজতে হবে। কারণ আমাদের অন্য দলের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। আমাকে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে যে টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের শক্তিটা জানা। এবার এসে প্রচুর পেসারের কথা শুনছি। আগেরবার শুধু স্পিনারদের কথা শুনেছিলাম। এখন দেখব নতুন পেসারদের ওরা কেমন।

গতবার আপনি তো হোম কন্ডিশন কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা করতেন স্পিন উইকেট করা। তখন বাংলাদেশ বিদেশে কঠিন অবস্থায় পড়ত। এবার আপনার পরিকল্পনা কী থাকবে?

হাথুরু : পৃথিবীর সব দলই হোম অ্যাডভান্টেজ কাজে লাগায়। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কী করে? ভারত এখন কী করছে সবাই দেখছেন। আমরাও হোম অ্যাডভান্টেজ কাজে লাগাব না কেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আপনার যদি মিসাইল না থাকে তাহলে কীভাবে যুদ্ধ করবেন? আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করতে হবে তাই না। ওদের হোমে আসতে দিন এরপর আমরা ছোট বন্দুক নিয়েই লড়াই করব। বিদেশে আমাদের যে ক্রিকেটার আছে তাদের নিয়েই সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হবে। আর বাংলাদেশ বাইরে ভালো করে না কথাটা ঠিক না। নিউজিল্যান্ডে ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো করেছে বাংলাদেশ। আপনাকে ক্রিকেটার তৈরি করতে হবে। এবাদত, শান্ত আমার প্রথম কোচিংয়ের প্রথম নিউজিল্যান্ড সিরিজে ডেভেলপমেন্ট ক্রিকেটার হিসেবে ছিল। এখন সে দলের মূল বোলার। তো ক্রিকেটার তৈরি করতে সময় লাগে। ওদের বিভিন্ন কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতেও সময় লাগে। তো আমি প্রথম প্রশ্নের সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। সব কিছুর জন্যই তো সময় লাগে। দেশে যদি আমরা ভালো না করি তাহলে বিদেশে ভালো কীভাবে করব।