মিরপুরের একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকার সঙ্গে রাজশাহীর এক ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে বিয়ে হয় ২০১১ সালে। তাদের এক কন্যাসন্তান। টানাপড়েনের জেরে ২০১৮ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের অধিকার পেতে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন শিশুর মা।
মামলার সময় শিশুর বয়স ছিল পাঁচ বছর। একই দাবিতে শিশুর বাবা ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী পারিবারিক আদালতে পাল্টা মামলা করেন। বাবা-মায়ের মামলার জেরে বিপাকে পড়ে ওই শিশু। আদালত সন্তানকে বাবার হেফাজতে দিলেও মায়ের সান্নিধ্য পাওয়ার এবং সন্তানকে দেখভাল করার আদেশও ছিল। সন্তানকে একান্তে পাওয়ার জন্য ২০২১ সালের মার্চে হাইকোর্টে রিট করেন মা। হাইকোর্ট ঢাকার মামলাটি অবিলম্বে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে বাবার পক্ষের আইনজীবীরা ঢাকার মামলা রাজশাহীতে বদলি চেয়ে রিট করলে গত বছর মার্চে ওই মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে বদলি প্রশ্নে রুল দেয় হাইকোর্ট। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, রুলটি এখনো বিচারাধীন। এর মধ্যে শিশুটির বয়স হয়েছে আট বছর।
সন্তানের অভিভাবকত্ব কিংবা হেফাজত পাওয়ার এমন অনেক মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৭৬ হাজার ৪৮৮।
বেসরকারি সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ফ্লাড) হিসাবে প্রতি কর্মদিবসে ঢাকার তিনটি পারিবারিক আদালতের একটিতে ৯০ থেকে ৯৮টি, একটিতে ১০০ থেকে ১১২টি এবং একটিতে ৮০ থেকে ৮৫টি মামলার শুনানি হয়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলার শুনানি হয় সন্তান নিয়ে।
ভূমিবিরোধবিষয়ক মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরা প্রায়ই বলেন, দেওয়ানি মামলার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। পারিবারিক আদালতের মামলা নিয়েও আইনজীবীদের মুখে এমন হতাশার কথা শোনা যায়। অধস্তন পারিবারিক আদালত থেকে হাইকোর্ট, হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগ; এরপর আদালতের আদেশ পালনে অনীহা প্রভৃতির আরজি নিয়ে আবারও অধস্তন আদালত থেকে উচ্চ আদালত এভাবে মামলা চলতেই থাকে। সন্তান বড় হতে থাকে, কিন্তু বাবা-মায়ের মামলা শেষ হয় না।
অনেক ক্ষেত্রে আদালত কিংবা আইনজীবীদের আপস-মীমাংসার পরামর্শ থাকলেও আবেগের কাছে তা ঠুনকো হয়ে যায়। কোনো কোনো বাবা-মায়ের ইগো বা অহং অর্থাৎ ছাড় না দেওয়ার মানসিকতার কাছে পরাস্ত হয় সব যুক্তি বা আইন। ফলে ব্যাঘাত ঘটে শিশুর মানসিক ও অন্যান্য বিকাশে। হাইকোর্ট প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিক আদালতে সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে করা মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলেও তার প্রায় কিছুই প্রতিপালিত হয়নি।
প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলায় শিশুর বাবাকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মামলাজটের কারণে পারিবারিক আদালতের মামলা এখন অনেক জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আদালত আদেশ দিলেও কিছুদিনের মধ্যেই কোনো কোনো অভিযোগে আবারও আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এসব মামলার সমাধান পাওয়াই যায় না। সন্তানসম্পর্কিত আবেগের বিষয়ে আদালতও কঠোর হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। এখনই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এসব ব্যাপারে মামলা করার আগে উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির বিধান বাধ্যতামূলক করতে পারলে এবং সংশ্লিষ্ট আইনে কিছু সংশোধন আনতে পারলে সমাধান আসতে পারে।’
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে একজন আইনজীবীর চেম্বারে কথা হয় মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী এক নারীর সঙ্গে। দুই ছেলেকে কাছে পেতে ২০২১ সালের মার্চে রিট করেছেন তিনি। বড় ছেলেটির বয়স এখন ১২ আর ছোট ছেলেটির ৯ বছর। ওই বছরের ১৫ মার্চ হাইকোর্ট রুল দিয়ে দুই শিশুকে হাজির করার নির্দেশ দেয়। ৩১ মার্চ হাইকোর্ট শিশুদের সঙ্গে একান্তে কথা বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, বাস্তবতা বিবেচনায় শিশু দুটি থাকবে বাবার কাছে। তবে মা যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তানদের সান্নিধ্য পাবেন।
ওই নারীর অভিযোগ, হাইকোর্টের কোনো নির্দেশনাই মানছে না শিশু দুটির বাবা। ফলে আবারও তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছেলেদের পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে। মায়ের সান্নিধ্যও পাচ্ছে না। বাবার পরিবার প্রভাবশালী। আমাকে ছেলেদের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয় না। ছেলেদের আমি কাছে পেতে চাই।’
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টানাপড়েন এখন বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ও পুরুষের মধ্যে। এখন যৌথ পরিবার কমে যাচ্ছে। ফলে সন্তানের দেখাশোনার বিষয়টি এখন কঠিন। ফলে মামলা বাড়ছে। মামলার নিষ্পত্তি হতে সাত বছরও লেগে যায়। আমার মনে হয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে উভয়পক্ষকে ছাড় দিতে হবে। সমঝোতার বিকল্প নেই।’
সুপ্রিম কোর্টে এ ধরনের মামলায় প্রায়ই বাবা অথবা মাকে আইনি সহায়তা দেন এমন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সাত বছরে অন্তত ৬৫টি অভিভাবকত্ব কিংবা জিম্মার মামলা পরিচালনা করেছি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সন্তানের ভবিষ্যতের চাইতে বাবা-মার জেদ অর্থাৎ হার না মানার মানসিকতা বেশি কাজ করে। তারা মনে করে, কোনোভাবে মামলা পক্ষে এলেই অন্যপক্ষ হেরে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি মামলার বাদী কিংবা বিবাদীদের আস্থায় আনা যায়; কিন্তু বাবা-মায়ের মামলায় সমঝোতার চেষ্টায় আদালত এবং আমাদের ব্যর্থ হতে হয়। ফলে মামলার নিষ্পত্তিও জটিলতায় পড়ে।’
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, ‘দুপক্ষের আপস-মীমাংসার উদ্যোগের ব্যাপারেই এখন গুরুত্ব দিতে হবে। বিচারক ও আইনজীবীদের উপলব্ধি করতে হবে যে, এখানে শিশুর সুস্থ বিকাশের মতো স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে। তারা দুপক্ষকে আস্থায় নিয়ে সমাধান দিতে পারেন। এ উপলব্ধি না এলে পরিস্থিতি সুখকর হবে না।’
আপত্তি আদালতের পরিবেশ নিয়েও : ঢাকার জেলা আদালতের নিচতলায় দুটি পারিবারিক আদালত ঘুরে দেখেছেন দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক। ঢাকা জেলা জজ আদালতের নিচে ছোট দুটি কক্ষে কোনোরকমে বসানো হয়েছে আদালত। এজলাসের সামনে কয়েকটি পুরনো কাঠের বেঞ্চ। বসতে হয় গাদাগাদি করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আদালতের বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে আসা শিশুদেরও এ যন্ত্রণাময় পরিবেশে থাকতে হয়। আশপাশে কোনো বিশ্রামকক্ষ বা শৌচাগার নেই।
একাধিক আইনজীবী বলেছেন, আদালতের এমন পরিবেশে অনেক শিশু ভড়কে যায়। কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে। গরমের সময়ে পরিস্থিতি হয় খুব নাজুক। ঢাকা বারের সদস্য, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিয়েশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট নাসিমা আখতার লাভলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলোকে কোনোভাবেই পারিবারিক আদালত বলার সুযোগ নেই। এজলাস আরও বড় হওয়া দরকার। নারী ও শিশুরা যাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে না পড়ে তার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।’
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ ও গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০-এ নাবালক শিশু সন্তানের অভিভাবকত্ব, তত্ত্বাবধান বা ভরণপোষণের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, নাবালকের স্বাভাবিক ও আইনগত অভিভাবক বাবা হলেও বাবার অনুপস্থিতি কিংবা অযোগ্যতায় মা অভিভাবক হতে পারেন। আর নাবালক শিশুর সার্বিক কল্যাণ ও তত্ত্বাবধানে মায়ের অগ্রাধিকার রয়েছে। ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সাত বছর ও কন্যার ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের জিম্মায় থাকার কথা বলা আছে।