তুরস্কের শিক্ষা কাজে লাগবে দেশে

তুরস্কে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া উদ্ধারকারীদের প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এরপরও তারা সফলভাবে উদ্ধারকাজ সমাপ্ত করায় তুরস্ক সরকার ও সেখানকার মানুষ বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। উদ্ধার অভিযান শেষে দেশে ফিরে এসব কথা জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাজী আলাউদ্দীন রোডে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, তুরস্কে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজ পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি পেয়েছে। উদ্ধারকারী দল পাঠানো ছাড়াও আমরা তুরস্কের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য উষ্ণ বস্ত্র পাঠিয়েছি।

সংবাদ সম্মেলনে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পাঁচ সদস্যের উদ্ধারকারী একটি দলের দলনেতা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দিনমনি শর্মা বলেন, ‘একটি ছয়তলা ভবন ভেঙে একতলা হয়ে গিয়েছে। সেখান ভেতর থেকে একজন ভুক্তভোগী বের করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। বড় একেকটি ভবন বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, সেখানে আমরা যখন প্রবেশ করি আমাদের জীবনের ঝুঁকি ছিল। সেটি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। আর সেখানে বারবার আফটার শক হচ্ছিল। প্রতিনিয়ত আমাদের কষ্ট করে থাকতে হয়েছে। আমরা দুই থেকে তিন কিলোমিটার হেঁটে গেছি, আমাদের যন্ত্রপাতিগুলো কাঁধে করে নিয়ে গেছি। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু সেখানকার মানুষ আমাদের বলেছে, আমরা বন্ধু না, আমরা ভাই। আমরা সেখানে কাজ করে ভুক্তভোগী উদ্ধার করেছি, আমাদের মিশন সফল হয়েছে। সেখানকার মানুষ আমাদের কাজ দেখে এত অভিভূত হয়েছিল যে বুকে জড়িয়ে ধরেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন আদিয়ামানে গেলাম তখন দেখলাম পুরো শহর বিধ্বস্ত জনমানবশূন্য, কিন্তু শহরটি ছিল পুরো পরিকল্পিত। বড় বড় রাস্তাঘাট সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দুই-একটি বাড়ি দাঁড়ানো ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল ফাটল ধরা, বসবাসের অনুপযোগী। কোনো মানুষ নেই, কিছু পালিত পশুপাখি বিড়াল, কুকুর হাঁটাহাঁটি করছে। যেসব ভবনে ভুক্তভোগীর উপস্থিতি ছিল সেগুলোতে আমরা কাজ করেছি।’

উদ্ধার অভিযানে থাকা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, উদ্ধার অভিযানে সেখানকার শীত আমাদের কষ্টের কারণ ছিল। তবুও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য। আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা পরে বাংলাদেশে এমন দুর্যোগ এলে কাজে লাগাতে পারব।

বাংলাদেশে এমন ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস কতটা সক্ষমÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক মাইন উদ্দিন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের বর্তমানে ১৪ হাজার কর্মী সবাই প্রশিক্ষিত। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা দেশি-বিদেশি উন্নত যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করছি। এ প্রস্তুতি আমাদের জন্য অবশ্যই পর্যাপ্ত নয়। আমরা ড্রি (ডিজাস্টার রেসপন্স এক্সারসাইজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ) নামের একটি এক্সারসাইজ করছি।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন আছে, ৬২ হাজার ভলান্টিয়ার (স্বেচ্ছাসেবক) তৈরি করার জন্য। আমরা ৫০ হাজার ইতিমধ্যে তৈরি করেছি। ২০২২ সালে ১ লাখ ৩৩ হাজারের ওপর শুধু গার্মেন্টস কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমরা বলব আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিএমডিসি কোড মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে।’

গত ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ৯ ফেব্রুয়ারি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজে অংশ নিতে ৪৬ সদস্যের উদ্ধারকারী দল ঢাকা ত্যাগ করে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৪ জন, সেনাবাহিনী মেডিকেল টিমের ১০ ও ফায়ার সার্ভিসের ১২ জন। তারা দুটি প্রদেশের ১১টি ভবনে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে তারা একজন তরুণীকে জীবিত এবং ২৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।